19/09/2025
#ফিরে_এসেছি_তোর_টানে
লেখিকা: মাহযুবা মালিহা
#পর্ব_২৯_১ম_অংশ
সূর্য উঠেছে, শহরের ইট-কাঠের দালান গুলো ধীরে ধীরে সোনালী আলোয় রাঙা হতে শুরু করেছে । উঁচু উঁচু ভবনের কাঁচের জানালায় সূর্যের প্রতিফলন যেন আলোকরশ্মির এক নিরব নৃত্য শুরু করেছে। রাস্তায় তখনো ভিড় জমেনি , কিন্তু অল্প অল্প করে জীবনের গতি শুরু হয়েছে।চা-ওয়ালার হাক শোনা যাচ্ছে , ফুটপাতের পাশে এক ঘুম ভাঙা দোকানে কেতলি থেকে ধোঁয়া উড়ছে। একপাশে অফিসমুখী মানুষের তাড়াহুড়ো শুরু হয়েছে —কেউ হাত ঘড়ি দেখছে, কেউ বাসের জন্য অপেক্ষা করছে
হাসপাতালের করিডোরের জানালা দিয়ে আদ্রি বাহিরের দৃশ্য দেখছে। সবাই ব্যস্ত কারো হাতে সময় নেই,কারো জন্য ভাবার। এই শহরের জীবনে কি আদেও কোনো ভালোবাসার রং আছে নাকি সবই যান্ত্রিক হয়ে গেছে । আদ্রি এক মনে দাঁড়িয়ে থেকে ভাবছে এসব। ইদানিং কেন জানি নিজেকে খুব অচেনা লাগে।কেন জানি নিজের মধ্যে আগের সেই আদ্রিকে আর খুঁজে পায় না, যে আদ্রি শুধু নিজের মর্জিতে চলতো, কেউ অন্যায় করলে মুখের উপর জবাব দিত হাজারো কাছের কেউ হলেও,এতটা দুর্বল ছিল না। ইদানিং কেন জানি নিজের প্রতি আর আত্মবিশ্বাস কাজ করে না , কেন জানি খুব ভয় লাগে। নিজেকে যে একটা খোলসের মধ্যে বন্ধি করে নিয়েছে, শুধু সবার মন রাখতে চায়, সবার খুশির জন্য নিজেকে একটু বেশি স্বস্তা করে ফেলেছে কি?
-আদ্রি
আদ্রি তার ভাবনার জগৎ থেকে বের হয়ে আসলো।রাস্তা থেকে চোখ সরিয়ে পাশে থাকা ব্যক্তির দিকে চাইলো। আহান দাঁড়িয়ে আছে তার কোলে ঘুমন্ত আদ্রিত।আহান কিছু ক্ষণ আগে এসেছে আর তখন থেকেই আদ্রিত আহানের কোলে। তবে আদ্রি জানে তার ছেলে আর কিছু ক্ষণ পরই ঘুম থেকে উঠে পরবে। আদ্রি বেশ অবাক হয় ,আদ্রিতের অভ্যাসগুলো দেখে। সকাল সাতটার আগেই ঘুম থেকে ওঠে,নিজে নিজে ফ্রেশ হয়ে বই নিয়ে বসে যায় তাকে কিছুই বলতে হয় না। আদ্রি খেয়াল করেছে আদ্রিতের স্বভাব অনেকটাই আহানের মতো, ডিসিপ্লিনের মধ্যে থাকতে পছন্দ করে।
আদ্রি মুচকি হেসে বলে উঠলো
-দিন আমাকে ওকে দিন,আপনি রেস্ট নিন
-লাগবে না সারা রাত তো তোমার কোলেই ছিল এখন আমার কাছে থাক।আর বাসায় যাবা না?
-যাব বড়ো মামি ঘুম থেকে উঠুক তারপর দেখা করে না হয় যাব
আহান আর কিছু বললো না চুপচাপ আদ্রির পাশে দাঁড়িয়ে থাকলো।আহানের মাথায় শুধু এখন কয়েকটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কে এই ছেলে? আর নকল অর্ণব কোথায়? আর আদ্রি সুস্থ হওয়ার পরেও তিন মাস ওর সাথে কি করেছে ? আহান যে আদ্রির মধ্যকার পরিবর্তন লক্ষ্য করেনি তা নয়। সে লক্ষ্য করেছে খুব ভালো মতো লক্ষ করেছে। আজ থেকে প্রায় ১ বছর আগে যে আদ্রিকে আহান দেখেছিল আর আজকে আদ্রির আচরণে বেশ তফাত। যে আদ্রি নিজের আপন জনকে সামান্য কটু কথা বললে সহ্য করে না সেই আদ্রি কি না, ওকে বড়ো করে তোলা দাদা দাদিকে যারা অপমান করেছে তাদের সাথে এত ভালো ব্যবহার করেছে। না আহান মিলাতে পারে না হিসাব।
- কি আপনারা মারিয়া সিকদারের বাড়ির লোক?
-জি
-ওনার জ্ঞান ফিরেছে চাইলে দেখা করতে পারেন
-আচ্ছা আপনি যান, আমরা আসছি
নাস চলে গেলেন।আহান আদ্রির দিকে তাকালো।আদ্রি মাথা নাড়ল যাওয়ার জন্য। আদ্রিতের ঘুম ভেঙ্গে গেছে নার্সের কথায়। আদ্রিত আহানের কাঁধ থেকে মাথা তুলে তার মা বাবার দিকে তাকালো।আদ্রিত উঠেছে দেখে আদ্রি মুচকি হেসে আদ্রিতকে কোলে নিল। আহান বলে উঠলো
-তুমি ওকে ফ্রেশ করিয়ে কেবিনে এসো আমি আসছি
আদ্রি মাথা নাড়ল।আহান তার মায়ের কেবিনের দিকে গেল। আহান গলা পরিষ্কার করে আলতো হাতে দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো।
মারিয়া সিকদার আধশোয়া হয়ে জানালার দিকে মুখ করে আছিলেন।দরজা খোলার শব্দে আহানের দিকে তাকালেন। তিনি নার্সের কাছ থেকে শুনেছেন তার ছেলে আর ছেলের বউ এখানেই আছে।আর তা শুনেই যেনো তার সকল অসুস্থতা দূর হয়ে গেলো। ছেলে তার মানে তার আহান এসেছে। মারিয়া সিকদার এক মনে তার ছেলেকে দেখছেন। তাকে ছেড়ে বিট্রিশদের দেখে চলে যাওয়া আহান আর আজকের আহানের মধ্যে কতটা পার্থক্য। খুশিতে চোখে নোনা জল জমা হলো।
আহান ধীর পায়ে তার মায়ের কাছে গিয়ে গভীর কন্ঠে বলে উঠলো
-এখন কেমন আছো?
এবার মারিয়া সিকদারের চোখ দিয়ে নোনা জল বেয়ে পরলো। তিনি বলে উঠলেন
-এত দিনে তোর আসার সময় হলো,এত দিনে অভিমান ভাঙ্গল যদি মরে যেতাম তাহলে
-চুপ করবে তুমি এসব ফালতু কথা বাদ দাও
-কেন বাদ দিব সেই গেলি আর আসলি না দেখতে দেখতে ১৫ বছর কেটে গেছে । জানিস প্রতিদিন ভেবেছি আজ হয়তো তুই ফোন করবি, ফিরে আসবি। কিন্তু তুই তো তোর জেদ নিয়েই থাকলি ভাবলি না তুই ছাড়া তোর মায়ের কেউ নেই, তোর মা কীভাবে থাকবে এই স্বার্থপরদের মাঝে।
-তুমি যদি আমার প্রিয় জিনিসটাকে না দূরে সরিয়ে দিতে তাহলে কিছুই হতো না।
-আমি কি সাধে আ..
মারিয়া সিকদারের কথা শেষ হওয়ার আগেই আদ্রি দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো। আদ্রিত পাশে দাঁড়িয়ে আছে মায়ের হাত ধরে। ওনারা ওদের দিকে তাকালেন। আহান বলে উঠলো
-ভেতরে আসো
আদ্রি ধীর পায়ে এসে আহানের পাশে দাড়ায়। মারিয়া সিকদার ওদের দিকে তাকালেন। তিনি এক দৃষ্টে আদ্রিতের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আদ্রিত মারিয়া সিকদারকে এভাবে তাকাতে দেখে বলে উঠলো
-এই তুমি দিকে এভাবে তাকিয়ে আছ কেন? আগে বেবি দেখোনি
আদ্রিতের কথায় মারিয়া সিকদার হাসলেন। আদ্রি বলে উঠলো
-এভাবে বলতে হয় না আব্বু, তোমার দিদুন হয়।
-ওহ, বড়ো দাদুর বউ, হ্যালো বড়ো দাদুর বউ
আদ্রি আদ্রিতের কথা শুনে আহানের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালো। সব দোষ এই লোকের বাচ্চাটা এর কাছ থেকেই এসব শিখেছে।আহান আদ্রির এভাবে তাকানোর মানে বুঝলো না।আদ্রি বলে উঠলো
-আদ্রিত এভাবে বলতে হয় না,দিদুন হয় তো
-আরে বউমা ওকে বোকা দিও না, তুমি ওকে নিয়ে আমার কাছে এসো বসো তো
আদ্রি আদ্রিতকে কোলে নিয়ে মারিয়া সিকদারের কাছে গেলো। মারিয়া সিকদার আদ্রিকে পাশে বসিয়ে বলে উঠলেন
-আমার দাদুটার নাম বুঝি আদ্রিত,বীমা তোমার ন..
-আদ্রিয়ানা সিনহা
সিকদার বাড়ির সবাই মতোই তিনিও চমকে গেলেন।বলে উঠলেন
-তুই আদ্রি
-জি
-কত বড় হয়ে গেছিস
এভাবেই মারিয়া সিকদার কিছু ক্ষণ আদ্রির সাথে কথা বললেন।তখন আদ্রিত কারো attention না পেয়ে গাল ফুলিয়ে বলে উঠলো
-বাবাই আমি বাহিরে যাব এখানে আমার সাথে কেউ কথা বলে না
মারিয়া সিকদারের চোখের ইশারায় আদ্রিকে আদ্রিতকে তার কোলে দিতে বললেন।আদ্রি খুব সাবধানে আদ্রিতকে দিল। মারিয়া সিকদার বলে উঠলেন
-কেন দাদু এই বুড়ি দিদুন ভালো না
-এই আমি তোমার দাদু না তো
-তাহলে কি?
-আমি তো তোমার বয়ফ্রেন্ড, তোমাকে আমার ভালো লেগেছে তুমি আম্মুর মতো সুন্দর দেখতে আমি তোমাকে বউ বানাবো
মারিয়া সিকদার ছোট নাতির কথায় হেসে উঠলেন।আর আদ্রির তো মাথায় হাত ছেলের পাকামো দেখে।এসব ওকে কে শিখালো
আহানের ফোনে হঠাৎ দুটা মেসেজ আসলো।আহান ওদের থেকে একটু দূরে গিয়ে মেসেজ ওপেন করলো। কোনো আননোন নাম্বার থেকে এসেছে।আহান ক্রিনে তাকালো
"গোল গোল গোলক ধাঁধা , কোথায় যাবে হেতা সেথা
ফাসবে সেই ধাঁধায়"
"অঙ্কক কসই যত হবে শুধু শূন্য,পাবে না তাকে খুঁজে যদি না দেয় সে ধরা"
চলবে