20/08/2024
রাষ্ট্র বিনির্মাণ ও কিছু প্রশ্নঃ
(এক)
রাষ্ট্র ও শাসক থাকার বিষয়টিকে ইসলাম অনেক গুরুত্ব দিয়েছে। তাই মদীনা একটি রাষ্ট্র ছিল। তার শাসক ছিলেন প্রথমে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার খলীফাগণ।
কিন্তু রাষ্ট্র ও শাসক হওয়ার জন্য যে কোনো পদ্ধতি কি বৈধ?
প্রথমতঃ কিছু বিষয়ে মতভেদ করার সুযোগ নেই,
১- গণতন্ত্র কুফরি মতবাদ।
২- সেক্যুলারিজম কুফরি মতবাদ।
৩- এ রকম সব ধরণের ইজম প্রতিষ্ঠা হারাম।
৩- গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করা হারাম।
৪- গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পদ্ধতি কোনো কোনো সরকার বৈধতা দিলেও ইসলাম বৈধতা প্রদান করে না।
সুতরাং এগুলো কোনোভাবেই জায়েয হবে না, জায়েয বলার সুযোগ নেই।
তাই কোনো আন্দোলন যদি এগুলো প্রতিষ্ঠা করার জন্য বের হয় তবে তাদের এ নীতি সমর্থন করার কোনো বৈধতা নেই। সমর্থন করে তাদের সাথে বের হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।
(দুই)
দ্বিতীয়তঃ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা চালানোঃ
অবশ্যই বিষয়টি প্রশংসিত কাজ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সেটা কীভাবে করবেন?
১- কেউ কেউ চিন্তা করছেন গণতন্ত্রের কাঁধে সওয়ার হয়ে ক্ষমতায় দিয়ে তা প্রতিষ্ঠা করবেন।
এ পদ্ধতিটি ইসলাম সমর্থিত বলা যায় না। কারণ
- ইসলাম -‘আলগায়াতু তুবাররিরুল ওয়াসীলা’ (লক্ষ্য উদ্দেশ্য ভালো হলে মাধ্যম যাই হোক তা গ্রহণযোগ্য) এ নীতি মানে না।
- এ পদ্ধতিতে যাঁরাই চেষ্টা করেছে তারা সফলতার মুখ দেখেনি। আর দেখার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। গত ১০০ বছরে কোথাও এ মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা যায়নি।
- আরো বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে যারা এ পদ্ধতিতে কিছু পেয়েছে তারা অনেক শির্ক, কুফর ও হারামকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।
২- কেউ কেউ মনে করছেন বিগত যুগের কিছু মানুষের মত ভীতি প্রদর্শন করে কিংবা অস্ত্রের ঝনঝনানীর মাধ্যমে ক্ষমতায় যাবেন। এ পদ্ধতিকেও ইসলামিক পদ্ধতি বলা চলে না।
৩- গণদাবির মাধ্যমে ক্ষমতায় আরোহন করা। এটিই ইসলামের দৃষ্টিতে বিশুদ্ধ পদ্ধতি বলে বিবেচিত। এ গণদাবির বাস্তবায়ন সম্ভব হবে দাওয়াতের মাধ্যমে, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজগুলো ইসলামী করার মাধ্যমে।
(তিন)
ইসলামী রাষ্ট্রের শাসক পরিবর্তন নীতিঃ
শাসক মুসলিম প্রকাশ্য ন্যায়পরায়ন হলে
১- তাকে পরিবর্তন করা জায়েয নেই। যতদিন তিনি যোগ্য বিবেচিত হবেন ততদিন তিনি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন।
২- তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ জায়েয নেই।
এদুটি স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম।
কিন্তু শাসক যুলুম করলে তখন শাসিতরা কী করবে? তারা দুটি কাজ করবে,
১- সবর করবে।
২- যতটুকু সম্ভব হাত, মুখ বা অন্তর এ তিন পদ্ধতির একটি দিয়ে অন্যায় ও যুলুমের প্রতিবাদ করবে।
এ প্রতিবাদ গোপনে ও একান্তে করতে পারার বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই।
কিন্তু প্রকাশ্যে করতে পারবে কী না?
এ ব্যাপারে দুটি মত রয়েছে,
১- অন্যায়ের প্রকাশ্য প্রতিবাদ করতে পারবে না। এ মতটি ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ ও একদল সালাফ এর।
২- অন্যায় ও যুলুম এর প্রকাশ্য প্রতিবাদ করতে পারবে তবে শর্ত সাপেক্ষে। এ মতটি ইমাম আবু হানিফাহ ও সালাফগণের এক গোষ্ঠীর।
শর্তগুলো হচ্ছে,
ক) শাসককে একান্তে বলার সুযোগ না থাকা।
খ) শাসকের অন্যায় ও যুলুমকে (নিজেদের ক্ষতি কম হওয়া সাপেক্ষে) কমিয়ে আনা বা নির্মূল করা সম্ভব হওয়া।
গ) শাসকের ব্যক্তিসত্তাকে আক্রমন বা চরিত্র বিকৃত না করা।
(দেখুন শাইখ ফারকূস এর বক্তব্য
https://ferkous.com/home/?q=fatwa-1260)
আর যদি শাসকের কুফরি স্পষ্ট হয়ে যায়, তাহলে শর্ত পূর্ণ হলে তাকে পরিবর্তন করতে হবে। শর্তগুলো হচ্ছে,
১- তাকে পরিবর্তন করা সম্ভব হতে হবে।
২- তাকে পরিবর্তন করার মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলিমদের বড় ধরণের ক্ষতি হবে না, এমন প্রবল ধারণা থাকবে।
৩- তাকে সংশোধন করার দৃশ্যমান আর কোনো উপায় অবশিষ্ট না থাকে।
(চার)
প্রশ্ন হচ্ছে, এ হিসাবে শেখ হাসিনা ও তার সরকার কোনটির অন্তর্ভুক্ত?
এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষনীয়,
১- শেখ হাসিনা বা তার মতো কোনো নারী শাসক বৈধ শাসক কী না?
এর উত্তরে আমরা বলবো, অবশ্যই তা হারাম। ইসলাম কোনো নারীকে বৈধ শাসক বলে না।
২- শেখ হাসিনার শাসন নীতি বা প্রণীত সংবিধান বৈধ কী না?
এর উত্তর হচ্ছে, বর্তমান সংবিধানে অবস্থিত অনেকগুলো কারণে শাইখ হাসিনা ও তার সরকারের শপথ নেয়া সংবিধান কুফরী ও তাগুতী সংবিধান। তাতে “কুফরুন বাওয়াহ” বা স্পষ্ট কুফর ও শির্ক রয়েছে।
৩- শেখ হাসিনা ও তার কর্মকাণ্ড কতটুকু ইসলাম বান্ধব ছিল?
এর উত্তর হচ্ছে, শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বহু কুফরি কথা ও কাজ রয়েছে। তার সরকারের লোকদের বেশিরভাগই যিন্দীক ছিল। ইসলামের বিরোধিতা তারা প্রকাশ্যে করত। আল্লাহর দেয়া বিধানকে তারা প্রকাশ্যে কচুকাটা করত, বাদ দিত, কুফর প্রতিস্থাপন করত।
৪- শেখ হাসিনা ও তার সরকারকে সমর্থন করার বৈধতা কতটুকু ছিল?
এর উত্তর হচ্ছে, যদি কেউ মন থেকে এগুলো মেনে নেয় কিংবা প্রশংসা করে তবে সে কাফির হয়ে যাবে। যদি নিজের জীবন বা পরিবারের জীবন বাঁচাতে মেনে নেয় তবে অবশ্যই ঈমানী দুর্বলতাসহ মুসলিম থাকবে। আর যদি বাধ্য হয়ে মেনে নেয়, তবে তাকে অপারগ বলতে হবে।
৫- শেখ হাসিনা সরকারের উপরোক্ত অবস্থার প্রেক্ষিতে তাকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করার বিধান কী?
এর উত্তর হচ্ছে,
এক. তাকে সরিয়ে দেয়ার জন্য কাফির শাসক সরিয়ে দেয়া ও যালিম শাসক সরিয়ে দেয়ার শর্ত পূর্ণ করা লাগবে। (যা উপরে বর্ণিত হয়েছে) প্রাথমিক পর্যায়ে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের সময় তা পূর্ণ ছিল না, তাই তখন সেটি অবৈধ নীতির ওপরেই ছিল।
দুই. পরবর্তীতে সে অবস্থার পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল, তখন সেটি গণদাবির রূপ পরিগ্রহ করে, এমতাবস্থায় তাতে ইজতিহাদ করার সুযোগ তৈরী হয়েছিল, কারণ তখন,
১- ছাত্র-জনতা এত বেশি অগ্রসর হয়েছিল যে তাদের হাতে হাসিনার পতন অনিবার্য ছিল।
এ সময় তাদের সমর্থন করার বিষয়টি তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য জানার সাথে সম্পৃক্ত ছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে সে সময়ে ছাত্র-জনতার উদ্দেশ্যে হযবরল অবস্থা বিরাজ করছিল। তাদের প্রতিবাদ পদ্ধতি অনেকটাই বিতর্কিত বা শরীয়া নীতির বিরোধী ছিল। তাদের মধ্যে নারী-পুরুষের সংমিশ্রতা ছিল, গানবাদ্যের সমাহার ছিল। আর তাদের উদ্দেশ্যও এক রকম ছিল না। কেউ ইসলামের কথা প্রকাশ্যে বলছিল, কেউ বাক-স্বাধীনতা চাচ্ছিল, আবার কেউ যুলুমের অবসান চাচ্ছিল। এমতাবস্থায় তাদেরকে সব বিষয়ে পূর্ণ সমর্থন করার বিষয়টি মোটেই গ্রহণযোগ্য নীতি ছিল না।
কিন্তু যে বিষয়ে তাদের সমর্থন করা জরুরী মনে হয়েছে তা হচ্ছে শেখ হাসিনা সরকারের যুলুম। এ যুলুম শুধু রাস্তায় জমায়েত লোকদের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না। হাজার হাজার মিথ্যা মামলা, ঘর থেকে নিরপরাধ লোকদের ধরে নিয়ে যাওয়া, অন্যায়ভাবে উপর থেকে হেলিকপ্টারে গুলি করে নিরপরাধ পুরুষ নারী শিশুদের হত্যা করার মাধ্যমে পৈশাচিকতা চরিতার্থ করার মত মারাত্মক যুলুম, যা সকল সভ্য নীতির বাইরে ছিল, এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া ফরয ছিল। ঈমানদার কাফির, ফাসিক, ফাজির, যার উপরেই হোক, তার নিরসনে কাজ করা প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব হয়ে যায়। তাই সে সময়ের খোতবায় মাযলুমের পক্ষে থাকার ঘোষনা আমি ও আমাদের সালাফী বন্ধুগণ প্রদান করেছিলেন।
২- হাসিনা এমন হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছিল যার প্রতিবাদ করা জরুরী ছিল।
এমতাবস্থায় হাসিনার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার বিষয়টি অন্যায় কাজ রুখে দেয়ার অংশ মনে করা যায়। এটি ইজতিহাদী জায়গা। অন্যের ভিন্নমত থাকাও সম্ভব। তবে প্রতিবাদের মত বেশি প্রাধান্য পাবে বলেই আমার ও আমাদের অনেক সালাফী ভাইদের কাছে মনে হয়েছে। এ ইজতিহাদে সাওয়াব থাকবে ইনশাআল্লাহ।
আর আলেমদের একজনের ইজতিহাদ অপরজনের ইজতিহাদকে বাতিল করে না যা আমরা জানি। সুতরাং কারো ইজতিহাদের ওপর কেউ আক্রমণ না করি। আপনার যদি পছন্দ না হয় তো আপনার মত নিয়ে থাকুন, কারো উপর আক্রমন করবেন না।
(পাঁচ)
আর সবশেষে ছাত্র-জনতার প্রচেষ্টার মাধ্যমে গঠিত সরকারের বিষয়ে আমাদের করণীয়।
১- প্রতিষ্ঠিত সরকারকে মেনে চলাই হচ্ছে ইসলামের একমাত্র নীতি।
২- সৎকাজে তাদের আনুগত্য করা।
৩- তাদের সহযোগিতা করে ইসলামাইজেশনের চেষ্টা করা।
৪- তাদের মধ্যে যতটুকু সম্ভব দাওয়াতের কাজ করা।
(ছয়)
প্রশ্ন হতে পারে, যেটার প্রাথমিক কাজে বৈধতা ছিল না তার শেষ কীভাবে বৈধ হবে?
উত্তরঃ
১- ইসলামের নীতি হচ্ছে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আসা রাষ্ট্র ও সরকারকে মেনে নেয়া।
২- ইসলাম ইজতিহাদী বিষয়ে কোনো কিছু সংঘটিত হওয়ার আগে এবং পরের অবস্থা বিবেচনা করে থাকে। যাতে আগের বিধান ও পরের বিধান ভিন্ন হয়ে থাকে।
৩- ইসলাম পিছনের ইজতিহাদী বিষয় নিয়ে কাদা ছোঁড়াছুড়ির বিষয়টিকে গর্হিত কাজ মনে করে। (যেমন ৭১ সালের স্বাধীনতার সময়ের বিষয়টি নিয়ে আলেমগণের মতের ভিন্নতা ছিল) সরাসরি অপরাধে জড়িত হওয়া প্রমাণিত না হলে শুধু ভিন্ন মতে থাকার কারণে কাউকে তিরস্কার কিংবা পুরস্কার কোনোটিই করা যাবে না।
এ হচ্ছে আমার নীতি ও অবস্থান। যা আমি শরীয়াতের দলীল ও উদ্দেশ্যের আলোকে বুঝেছি। আমি কাউকে আমার নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য করছি না। আমাকেও আপনার কোনো নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য করবেন না।
(আল্লাহ বেশি জানেন)
প্রফেসর ড. আবু বকর মুহাম্মাদ জাকারিয়া
আল-ফিকহ অ্যান্ড লিগ্যাল স্টাডিজ বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।