17/03/2020
করোনাভাইরাস:
সচেতন হোক মানুষ, সাবধান হোক ভুল তথ্য থেকে।
চমক হাসান
নভেল করোনাভাইরাস এবং এই ভাইরাসের কারণে হওয়া রোগ COVID -19 (COrona VIrus Disease - 2019) নিয়ে উৎকণ্ঠিত সারা পৃথিবীর মানুষ। ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটাকে বিশ্বব্যাপি মহামারী বা Pandemic ঘোষণা করেছে। আমার অফিস থেকে জানিয়ে দিয়েছে খুব জরুরি প্রয়োজন না হলে অফিসের সীমানাতে এসো না, ঘরে বসে কাজ করো। সেটাই করছি। আমি থাকি আমেরিকার লস এঞ্জেলস এর কাছে সান্টা ক্লারিটা শহরে, এখানে সব স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে। একসাথে কোথাও ৫০ জনের বেশি একত্রিত হওয়া নিষেধ। বিয়ে বা জন্মদিনের দাওয়াত, কনসার্ট, রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় সমাবেশ (গির্জার সম্মিলন, মসজিদের জামাত) সবকিছু বন্ধ।
দুয়েকজন সহকর্মী শুরুতে একটু আধটু গাইগুঁই করছিলেন- একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে নাকি। এখন আমরা সবাই জানি, এটা মোটেই বাড়াবাড়ি নয়, বরং খুবই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং খুবই খুবই জরুরি।
গণিতের ভাষায় বললে এই ভাইরাস ছড়ায় ‘সূচকীয়’ হারে। এর গ্রাফটা খুব ইন্টারেস্টিং। যখন মান কম, বৃদ্ধির হারও কম। শুরুতে খুব ধীরে বাড়ে, তারপর যখন মান বেড়ে যায় বৃদ্ধির হারও বেড়ে যায়। ইতালিতে ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখে আক্রান্ত ছিল ২০ জন, এরপর একমাসও যায়নি- আজ পাই দিবসে (১৪ মার্চ) সংখ্যাটা ২১ হাজার ১৫৭ (উৎস)। শুরুর সময় দেখে মানুষ বিভ্রান্ত হয়, একটা দুইটা কেস দেখে কেউ বোঝে না যে কী আসতে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে যত আগে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা শুরু করা যায় তত ভালো।
ভয় হয় বাংলাদেশ নিয়ে। সাধারণ মানুষ এবং সরকার দুইপক্ষকেই সচেতন হওয়া খুব জরুরি। তার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু উদ্ভট তথ্য আর লেখা দেখে বিরক্ত লাগে। এগুলো মানুষকে আরও বিভ্রান্ত করবে। আমি চেষ্টা করছি যেসব তথ্য এখানে দেবো সবকিছুর নির্ভরযোগ্য সূত্র লিখে দিতে যেন মানুষ যাচাই করে নিতে পারে। কোনো কথাই তথ্য-প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাস করার দরকার নাই, আমার এই লেখাও না।
ছড়িয়ে পড়া কিছু ভুল তথ্য- ভুল ভাবনা
দুর্যোগ পরিস্থিতিতে ভুলভাল তথ্যগুলো মানুষকে বিভ্রান্ত করে, আরও বিপদে ঠেলে দেয়। এখানে আমার চোখে পড়া কিছু ভুল তথ্য/চিন্তা খণ্ডন করছি।
১) ইউনিসেফ নাকি বলেছে ভাইরাসটা বড়, মাটিতে পড়ে যায়... - উঁহু, বলে নাই
ইউনিসেফের বরাত দিয়ে খুবই অদ্ভুত কিছু কথা বেশ কিছুদিন ফেসবুকে ঘুরেছে যার অধিকাংশই ভুল। সেগুলোর ভেতরে আছে এমন কিছু কথা- ভাইরাসটা আকারে বড়- মাটিতে পড়ে যায়, আইসক্রিম না খেয়ে গরম পানি খেলে ভাইরাস পেটে চলে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রথম কথা হচ্ছে ইউনিসেফ কোথাও এই জাতীয় কথা বলেনি। এমন কিছু দেখলেই সতর্ক হোন। আপনার কোনো বন্ধু শেয়ার করলে তাকে জানিয়ে দিন ওটা ভুল, তাকে স্পষ্টভাবে মানা করুন- এটা যেন আর না ছড়ায়। এরকম ভুলভাল কথা যে ইউনিসেফের নাম দিয়ে ছড়ানো হচ্ছে এই খবর তাদের কাছেও পৌঁছে গেছে, সেই ব্যাপারে তাদের বক্তব্য পাবেন এখানে । ইউনিসেফ কাজ করে সারা পৃথিবীর শিশুদের নিয়ে। করোনাভাইরাস নিয়ে অবশ্যই তারাও সতর্ক এবং তাদের মূল বক্তব্য পাওয়া যাবে এখানে।
২) গরমের দেশে নাকি ছড়ায় না... -ভুল, সব জায়গায় ছড়াতে পারে
ফেসবুকে একটা পোস্ট চোখে পড়েছে যেখানে তাপমাত্রা বিশ্লেষণ করে কেউ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে গরমের দেশে এই ভাইরাস বেশি ছড়ায় না- এটা খুবই বিপজ্জনক ভুল তথ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটা ওয়েবপাতা আছে ‘Myth Busters’ বলে। সেখানে প্রথমেই বলা আছে ‘COVID-19 virus can be transmitted in areas with hot and humid climates’। এখন পর্যন্ত পাওয়া সমস্ত তথ্য বলছে গরম এবং আর্দ্র এলাকাতেও COVID-19 রোগ ছড়াতে পারে। বাংলাদেশ গরম দেশ, তাতে হাত গুটিয়ে বসে থাকার কিছু নাই। ১৪ মার্চ, ২০২০ পর্যন্ত সৌদি আরব, মিশরে, ভারত, ইরাক - সব জায়গায় ১০০ এর উপরে আক্রান্ত (সূত্র)। এগুলো কোনোটাই ঠাণ্ডার দেশ না।
৩) শিশুরা নাকি আক্রান্ত হয় না ... -ভুল, সব বয়সের মানুষ আক্রান্ত হতে পারে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লিঙ্কে গেলে এটাও পাওয়া যাবে। সব বয়সের মানুষই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। সবাইকেই সচেতন থাকতে হবে। যতদূর জানা গেছে বৃদ্ধ কিংবা বয়স্করা যদি আক্রান্ত হয় তাদের ক্ষেত্রে রোগের জটিলতা বেশি হবার সম্ভাবনা আছে, শিশুদের ক্ষেত্রে রোগটা মারাত্মক আকার ধারণ করে না (ইউনিসেফের তথ্য)। তাই বলে শিশুদের কিছু হবে না ভেবে অবহেলা করার মানে নেই। তাদের জন্য রোগের ভয়াবহতা হয়তো বেশি হবে না, কিন্তু তারা বাহক হিসেবে এই রোগ ছড়িয়ে দিতে পারে অসুস্থ কিংবা ঝুকিপূর্ণ মানুষের কাছে। বয়স্ক যারা এবং যাদের দেহে আগে থেকেই কোনো একটা অসুস্থতা আছে (যেমন অ্যাজমা, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ) তাদের ক্ষেত্রে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
৪) সবাইকে কি মাস্ক পরতে হবে? -না, যারা নিজেরা অসুস্থ, যারা স্বাস্থ্যকর্মী এবং যারা রোগীর দেখাশোনা করছে তাদেরকে মাস্ক পরতে হবে
বাংলাদেশে মাস্কের আকাল পড়ে গেছে, অসাধু ব্যবসায়ীরা চড়া দামে মাস্ক বিক্রি করছেন এমন খবর চোখে পড়ছে হরহামেশাই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে আপনি যদি সুস্থ হন, বিনা কারণে মাস্ক পরার দরকার নেই (লিঙ্ক এখানে)। একই কথা বলেছে Center for Disease Control - CDC (লিঙ্ক এখানে- Respirators অনুচ্ছেদে দেখুন) আপনি যদি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কিংবা সন্দেহভাজন কোনো রোগীর দেখাশোনা করেন, তাহলে নিজেকে সুরক্ষার জন্য মাস্ক পরুন। যদি আপনি নিজে হাঁচি বা কাশিতে আক্রান্ত হন, তাহলে মাস্ক পরুন, যেন আপনার থেকে জীবাণু আর না ছড়াতে পারে। তারা এটাও বলছে যে শুধু মাস্ক পরে নিজেকে করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষিত রাখা যাবে না। সাথে সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোঁয়া, হাঁচি-কাশি এলে কনুই বা টিস্যু দিয়ে ঢাকা- এগুলোর চর্চাও লাগবে।
যদি মাস্ক ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে সেটা ব্যবহারের সঠিক নিয়মটাও জেনে রাখতে হবে। কী করে পরতে হয়, কী করে খুলতে হয়, কোথায় কীভাবে ফেলতে হয়- এগুলোও জানাটা জরুরি। নিচের ভিডিওতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজন কর্মী জানাচ্ছেন মাস্ক ব্যবহারের নিয়মাবলি।
https://www.youtube.com/watch?v=lrvFrH_npQI
৫) রসুন খেলে, গরম পানি খেলে, ‘অমুক বলেছে তমুক খেলে’, অ্যান্টিব