08/05/2026
১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি, আমেরিকা সৌদি আরবকে অনুরোধ করে বিশ্ববাজারে তেল কেনাবেচার একমাত্র মাধ্যম হিসেবে মার্কিন ডলারকে গ্রহণ করতে, সৌদি রাজি হয়। তাদের এই 'পেট্টো-ডলার' চুক্তির ফলে আমেরিকা নিজের মূল্যবান খনিজ তেল মাটির নিচে রিজার্ভ হিসেবে জমিয়ে রেখে, ছাপানো কাগজের নোটের বিনিময়ে আরবদের থেকে আজও দেদারসে তেল কিনে নিচ্ছে।
বিষয়টি আরও খোলাসা করা যাক, আমেরিকা একটি বিশেষ কাগজ বা ডলার ছাপাতে খরচ করে মাত্র কয়েক সেন্ট, কিন্তু সেই কাগজের বিনিময়ে তারা পাচ্ছে এক ব্যারেল মূল্যবান তেল। অর্থাৎ, আমেরিকা বিনামূল্যে পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরি জ্বালানি ভোগ করছে, আর বিনিময়ে দিচ্ছে এমন একটি কাগজ যার প্রকৃত কোনো উৎপাদন খরচই নেই।
সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং বোকামিপূর্ণ বিষয়টি হলো, আরব শাসকরা তেল বিক্রির সেই বিশাল অঙ্কের ডলার অলস ফেলে না রেখে আবার আমেরিকার 'ট্রেজারি বন্ডে' বিনিয়োগ করছে। এখানে সাধারণ পাঠকদের জন্য ট্রেজারি বন্ডের বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন: এটি মূলত আমেরিকার সরকারি ঋণের একটি দলিল। সহজ কথায়, আরবরা যখন এই বন্ড কেনে, তখন তারা আসলে আমেরিকাকে ঋণ দিচ্ছে। অর্থাৎ, আমেরিকা যে কাগজ ছাপিয়ে আরবদের কাছ থেকে তেল কিনল, আরব শাসকরা সেই কাগজই আবার 'বিনিয়োগ' হিসেবে আমেরিকার পকেটেই ফেরত পাঠিয়ে দিল!
এতে আমেরিকা দুটি সুবিধা পাচ্ছে: প্রথমত, তারা ডলারের এই বিশাল চাহিদা বজায় রেখে
মুদ্রাস্ফীতিকে অন্য দেশের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সেই ঋণের টাকা দিয়ে আমেরিকা তাদের সামরিক বাজেট পরিচালনা করছে এবং প্রতি বছর ৩.৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা হিসেবে ইসরায়েলকে দান করছে। এই অর্থের বিনিময়েই ইসরায়েল আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর বছরের পর বছর গণহত্যা চালাচ্ছে। নিজের শত্রুকে শক্তিশালী করার জন্য নিজেরই সম্পদ বিনিয়োগ করার চেয়ে বড় কৌশলগত বোকামি ইতিহাসে বিরল।
এই লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায় মুদ্রাস্ফীতিকে ব্যবহার করা হয় সাধারণ মানুষের সম্পদ চুরির হাতিয়ার হিসেবে। এখানে কাজ করে 'ক্যান্টিলন ইফেক্ট', যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন নতুন ডলার ছাপে, সেই টাকা সবার আগে পৌঁছায় বড় ব্যাংক এবং করপোরেট জায়ান্টদের হাতে। তারা বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার আগেই সস্তায় রিয়েল এস্টেট ও সম্পদ কিনে নেয়। এরপর যখন সেই ছাপানো টাকা সাধারণ মানুষের পকেটে পৌঁছায়, তখন বাজারে সবকিছুর দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায়, আর সঞ্চয়ের প্রকৃত মান কমে যায়।
একটি চেয়ার ও টেবিলের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরও সহজ করা যায়: ধরুন, একটি ঘরে দুটি চেয়ার ও দুটি টেবিল আছে, যেগুলোর দাম সব মিলিয়ে ১০০ টাকা (প্রতিটির দাম ২৫ টাকা)। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি হুট করে আরও ২০০ টাকা বাজারে ছাড়ে, চেয়ার-টেবিল কিন্তু আর বাড়ল না, বেড়ে গেল কেবল কাগজের পরিমাণ। ফলে আগের সেই চেয়ার-টেবিল কিনতে এখন ৩০০ টাকা লাগবে, অর্থাৎ আপনার জমানো টাকার মান তিনগুণ কমে গেল। আমেরিকা যখন এভাবে দেদারসে ডলার ছাপে, তখন পুরো পৃথিবীর পণ্যের সরবরাহ অপরিবর্তিত রেখে ডলারের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।
এর ফলে আপনার উপার্জিত টাকার মান কমে যায়, কারণ একই টাকা দিয়ে আপনি এখন আগের চেয়ে অনেক কম পণ্য কিনতে পারছেন।
আমেরিকা আজ যে সামরিক দাপট দেখাচ্ছে, তার পেছনে কোনো উৎপাদনশীল অর্থনীতির ভিত্তি নেই; আছে কেবল অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন করে ডলারের কৃত্রিম চাহিদা টিকিয়ে রাখার মরণপণ প্রচেষ্টা। কাবুলের ধূসর চোরাবালিতে যখন তালেবানরা খালি পায়ে লড়াই করছিল, তখন বিশ্ব দেখেছিল এক সামরিক ও অর্থনৈতিক দম্ভের চূর্ণ হওয়ার উপক্রম। এই যুদ্ধে মার্কিনীদের প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিলো। তালেবান যোদ্ধারা টানা দুই দশক ধরে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীকে নাজেহাল করে ছেড়েছে। কেবল পেট্রো-ডলারের সেই জাদুকরী সুরক্ষা কবচ বা বন্ডের মাধ্যমে আসা বিনিয়োগই ওয়াশিংটনকে এক চূড়ান্ত অর্থনৈতিক মহাপ্রলয় থেকে রক্ষা করেছিল। অর্থাৎ, তালেবানের হাতেই আমেরিকা প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো, টিকে গেছে কেবল আরবের রাজতন্ত্রের কারনে!
পোস্টটি শেয়ার করে সবাইকে দেখার সুযোগ করে দিন এবং ফলো করে সাথে থাকুন।