25/12/2020
From sister Zainab Al-Gazi
একজন মুসলিমের দিনের প্রতিটা মুহূর্ত কাটবে ইবাদাতে এমনটাই স্বাভাবিক। নিয়তের মাধ্যমে, কোনো আমল কিংবা জিকিরের মাধ্যমে। আর কাটবে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টায়।
এরজন্য খাটুনি করা লাগে, নফসের সাথে যুদ্ধ করা লাগে, গুনাহমুক্ত পরিবেশে থাকা লাগে, বা এমন পরিবেশে থাকা লাগে যেখানে সব সময়েই একটা ইবাদাতের আমেজ থাকে।
আমাদের মাঝে এমন অনেকেই আছেন যারা প্র্যাকটিসিং কিন্তু তাদের পরিবার প্র্যাকটিসিং না, তাদের জন্য ঘরে ইবাদাতের মহলে থাকা বা এমন এক মহল তৈরি করা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
তবে কিছু বিষয় খুবই সম্ভব। আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু বিষয় বা সময় থাকে যা একান্ত ব্যক্তিগত, পরিবারের কেউই সেসবে এক্সেস পায়না, যেমন কারও ব্যক্তিগত ডায়েরি, কিংবা আলমারির একটা অংশ, বা লক করা একটা ড্রয়ার, কোনো বক্স বা এ্যালবাম ইত্যাদি। আমরা চাইলেই পারি আমাদের ইবাদাতের বিষয়টাকে এমন ব্যক্তিগত বানিয়ে ফেলতে, নিজস্ব কোনো প্রিয় কিছু, যেখানে আর কারও এক্সেস থাকবে না, অর্থাৎ কেউ জানবেও না বুঝবেও না আমি আসলে কেনো এমন করছি। কেউ কিছু বলতেও পারবে না।
পারিবারিক ভাবে না পারেন, মানসিক ও শারীরিক ভাবে কিন্তু আপনি ইবাদাতের পরিবেশ তৈরি করে রাখতে পারেন।
কীভাবে?
• দিনের একটা সময় অল্প একটু তিলাওয়াত শুনতে পারেন, এতে করে যা হবে, সারাদিনই আমার মুখে বা মনে তিলাওয়াতের একটা আয়াত বা কিছু অংশ গুন গুন করতে থাকবে, কানে তিলাওয়াত বাজতে থাকবে, এতে করে মনে বা মুখে ফাহেসা চিন্তাভাবনা আসবে না, দিলে একধরণের শুভ্রতা অনুভূত হবে। এতে আরেকটা উপকার হবে, নাফসুল আম্মারাতু বিস সু’ অর্থাৎ গুনাহের কাজের দিকে যে নাফস ডাকে সে দুর্বল হতে থাকবে।
• যখন সংসারের কোনো কাজে যান, তখন যাওয়ার আগে আল্লাহর একটা গুণবাচক নাম শিখে এরপর যান, বেশি সময় লাগবে না, পাঁচ মিনিটের কম লাগবে। একটা নাম, তার অর্থ ও ফযিলত জেনে যান, পুরোটা কাজের সময় সেই নামই জপতে থাকুন। ভাল লাগবে, খুবই ভাল লাগবে, নতুন কিছু শেখা হল, সময়টা ইবাদাতে কাটল, অনেকগুলো সোওয়াব পাওয়া হল, নাফসকে দমিয়ে রাখা হল।
• কিছুদিন আল্লাহর গুণবাচক নাম ও কিছুদিন কোনো ছোটো একটা ফযিলতপূর্ণ ছোট্ট দুয়া বা জিকির শিখে যেতে পারেন।
• সব সময় খিমার পরে থাকবেন, নামাজের আগে খিমার পরা মাত্রই আমাদের ব্রেইনে খবর চলে যায় এখন ইবাদাত করা হবে, ব্রেইন তখন মনকে বার্তা পাঠায়- এখন ইবাদাত করা হবে, গুনাহের কাজ বা চিন্তা মুক্ত থাকতে হবে। মন তখন প্রচণ্ড খুশু সাপ্লাই দিতে থাকে, একাগ্রতা, আল্লাহর প্রতি ভয় ও নম্রতায় ছেয়ে যেতে থাকে মনে। রোজা অবস্থায় সহবাস বা পানাহার করার চিন্তাটা কেমন না? ঠিক ইবাদাতের পোশাকে থেকে গুনাহ করার চিন্তাটাও তেমন। সুন্দর পরিবেশ যেমন গুনাহমুক্ত থাকতে সাহায্য করে, তেমনই ইবাদাতের পোশাকও সাহায্য করে। আর হ্যাঁ, খিমার বানাবেন খুব সুন্দর কাপড় দিয়ে, এক কালারের সাদামাটা কাপড় দিয়ে না, আপনাকে মানায় এমন কালার ও প্রিন্টের কাপড় দিয়ে। দেখতে ভাল দেখায় এমন কালার ও কাপড় পরতেই আমাদের বেশি ভাল লাগে তাই না? খিমার যদি হয় এমন সব সুন্দর কালার ও প্রিন্টের তবে তো ভালই লাগবে সারাক্ষণ পরে থাকতে। আমরা খিমার বানাইও একটা দুইটা, শুধু নামাজের সময় পরার জন্য, সারাদিন পরে থাকার জন্য বানাইনা, সারাদিন পরে থাকার কাপড় হিসেবে খিমারকে দেখিইনা। কথা হচ্ছে, দেখলে সমস্যা কই?
• অল্প করে আতর লাগাবেন, গলাতে,কানের লতিতে, থুতনির নিচে বা খিমারে মুখের কাছের কোনো এক অংশে। এতে করে ঘ্রাণটা আপনার নাকে আসবে। আতরের ঘ্রানে একটা জাদু আছে, পবিত্রতায় মগ্ন করে রাখার মত জাদু, কিংবা বলতে পারি আতর শব্দটায় আছে জাদু, বা আতরদানিতে, বা এই সবগুলোতেই জাদু আছে, যা জুমুয়ার দিন, বা ঈদের দিনের অনুভুতি দেয়, মনে আনন্দ দেয়, আতরের সাথে সুন্নত বা ইবাদাতের একটা সম্পর্ক আছে, হতে পারে এর জন্যই আতরের ঘ্রাণ মনকে পবিত্রতা দেয়। তখন ইচ্ছে হয় মনকে গুনাহমুক্ত রাখতে, আর গুনাহমুক্ত মনেই আল্লাহর খেয়াল আসে।
• নিজের ঘরে বা রুমে নামাজের জন্য আলাদা কর্নার অবশ্যই রাখবেন, স্পেস না থাকলেও যেখানে নিয়মিত নামাজ আদায় করেন সে জায়গাটাকেই মনে মনে ইবাদাতের বিশেষ স্থান হিসেবে নিবেন। মনকে বুঝ দিবেন এটাই আপনার শুধু মাত্র আপনার একার মাসজিদ। দেখবেন খুবই ভাল লাগবে। মনে স্নিগ্ধতা এনে দেয় এমন একটা সফট কালারের জায়নামাজ ব্যবহার করবেন, জায়নামাজ যদি নরম তুলতুলা হয় তবুও সমস্যা নেই। জায়নামাজ যদি খুবই দামি হয় তবুও সমস্যা নেই। বসার জন্য আমাদের কত দামি আর নরম সোফা বা চেয়ার থাকে, ঘুমানোর জন্য কত আরামদায়ক বিছানা থাকে, অথচ নামাজের জন্য থাকে পাতলা পুরাতন হাঁটুর জায়গা ক্ষয়ে যাওয়া জায়নামাজ। যা ফ্লোরে বিছিয়ে নামাজ পড়লে হাঁটুতে, টাখনুতে ব্যথা করে, বেশিক্ষণ বসে থাকলে নিতম্ব ব্যথা করে, শুধু ইচ্ছে হয় উঠে যাই। জায়নামাজ যদি হয় এমন যে বসে আরাম পাচ্ছেন, তাকিয়ে চোখের শান্তি পাচ্ছেন, তবে কি আপনার ভাল লাগবে না সেখানে বেশি সময় কাটাতে? আমি বলছিনা অনেক নকশা ওয়ালা জায়নামাজ ব্যবহার করতে, বলছি এক কালারের মাঝেও কত প্রশান্তিকর জায়নামাজ পাওয়া যায়, তাই না? নামাজের জায়গাটাকে স্পেশাল ইবাদাতখানা ভাববেন, দেখবেন সেখানে সময় কাটাতেও খুব ভাল লাগছে।
• আতরের কথা বলেছি, তা যেমন জাদুকরী ঠিক তেমনই জাদুকরী হচ্ছে বখুর, বখুর না চিনলে গুগল করে দেখতে পারেন। মাসজিদ আন নাবাওইতে যখন হালাকায় বসে থাকতাম তখন সেখানকার গার্ডরা বিরাট বিরাট বখুরদানি হাতে নিয়ে ঘুরত, মিশক আম্বরের ঘ্রাণে একদম মন মাতাল হয়ে যেত, এত বেশি ভাল লাগত যে সেখানেই থাকতে ইচ্ছে করত। একবার ভেবে দেখুন তো কেনো মেয়েদের সুগন্ধি লাগিয়ে বাহিরে বের হওয়া নিষেধ, বা গাইর মাহরাম থেকে নিজের শরীর থেকে আসা ঘ্রাণকে বাঁচিয়ে রাখতে বলা হয়েছে? ঠিক এই কারণেই। ঘ্রাণে মন মাতাল করার ও ঘ্রাণ যার থেকে আসছে তার প্রতি আকৃষ্ট করার এক আজীব জাদু আছে। যা মনে পবিত্রতা এনে দিতে পারে আবার ফিতনাও এনে দিতে পারে।
যা বলছিলাম, বখুর জ্বালিয়ে রাখতে পারেন ঘরে, দিনে অন্তত একবার, বা ইবাদাতের সময়, এতে করে মানসিক ভাবে ইবাদাতের এক লালসা জাগবে।
• হালকা সাজ দিয়ে রাখবেন, একটু কাজল বা সুরমা হলেও লাগিয়ে রাখবেন, সুন্দর পোশাক পরে থাকবেন। আমাদের হয় না এমন? ঘরের জন্য ত্যানা কাপড়, মেহমানের জন্য সুন্দর কাপড়। এমন কেনো নিয়মটা? চাইলেই তো আরামদায়ক তবে সুন্দর কাপড় ঘরেও পরে থাকা যায়। বিবাহিত, অবিবাহিত, বাচ্চার মা, অনেক কাজ হ্যানতান এইসবের মাঝেও সুন্দর কাপড় পরে পরিপাটি থাকা যায়। পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র থাকাটাও একটা ইবাদাত। এতে মন প্রফুল্ল থাকে। ভেবে দেখুন একবার, খুব সুন্দর পরিপাটি হয়ে আছেন, দেখতে সুন্দর লাগছে, শরীর থেকে ঘ্রাণ আসছে, মনে সারাদিন গুন গুন করে জিকির করলেন, ঘরটা পরিপাটি করে গোছানো, নামাজের জায়গাটা কী সুন্দর আর আরামদায়ক। আপনার কি মনে প্রফুল্লতা কাজ করবে না? ইবাদাত করতে ভাল লাগবে না? গুনাহ করতে ইচ্ছে করবে?
• সর্বশেষ তবে সবচেয়ে জরুরী টিপস, অবসর সময়টা কাটাবেন জায়নামাজে বসে ও খিমার পরে, এমন কোথাও বলা হয়নি যে নামাজের সময় ছাড়া অন্য কোনো সময় জায়নামাজে বসে থাকা যাবে না। আপনার অবসর সময় আপনি সেখানেই কাটাবেন। বই পড়লেও সেখানে, মোবাইল টিপলেও সেখানে, চা নাস্তা করলেও সেখানে বসে, কারও সাথে কথা বললেও সেখানে বসে থাকবেন। এতে কী কী উপকার হচ্ছে ?
☆ আপনার শরীর ও মন অভ্যস্ত হচ্ছে লম্বা টাইম ইবাদাতখানায় বসে থাকতে।
☆ খিমার পরে ইবাদাতখানায় বসে থেকে আপনার অবশ্যই ইচ্ছে করবে না কোনো গুনাহ করতে, নাফসুল লাওয়ামা আপনাকে বাধা দিতে থাকবে।
☆ বই পড়তে নিলেও ইচ্ছে হবে দ্বীনি কোনো বই পড়তে, জায়নামাজে বসে অবশ্যই আপনার ম্যাগাজিন পড়তে ইচ্ছে হবে না।
☆ কারও সাথে কথা বলার সময়েও ইচ্ছে হবে ভাল কথা বলতে, জায়নামাজে বসে অবশ্যই আপনার ইচ্ছে হবে না গীবত গাইতে।
☆ মোবাইল টেপার সময়েও আপনার ইচ্ছে হবে ভাল কিছু দেখতে বা পড়তে, জায়নামাজে বসে অবশ্যই আপনার ইচ্ছে হবে না নাটক, সিনেমা দেখতে বা গান শুনতে। কিংবা ইচ্ছে হবেনা অহেতুক সময় নষ্ট করতে। খারাপ কিছু সামনে আসলেও, নফসুল আম্মারাতু বিস সু’ তা দেখতে চাইলেও আপনার নাফসুল লাওয়ামা তাতে বাধা দেবে, আপনি স্ক্রোল করে চলে যাবেন।
☆ আপনার সময়টা গুনাহমুক্ত কাটবে, আপনার মনটা ভাল থাকবে।
☆ ধীরে ধীরে নাফসকে বশে আনতে পারবেন।
☆ পারিবারিক পরিবেশের আফসুস থাকবে না, মানসিক ও শারীরিক পরিবেশেই অনেক শান্তি পাবেন।
উপরের প্রতিটা বিষয়ই আমার নিজের পরীক্ষিত, এই কাজগুলো আমাকে যেমন শিখিয়েছে নাফসকে কাবু করা, তেমন সাহায্য করেছে অহেতুক কাজ থেকে বেঁচে থাকা, তেমনই দিয়েছে মনে শান্তি আর ইবাদতে একাগ্রতা। দিয়েছে মনে ও জিহ্বায় লাগাম। দিয়েছে সময়ের বারাকাহ। কাজগুলো মোটেও কঠিন না, মোটেও ব্যয়বহুল না, মোটেও কষ্টকর না, তবে গরমে খিমার পরে থাকাটা কষ্টকর হতে পারে, কিন্তু একটু কষ্ট না করলে কি আর ফলাফল মিঠে হয়?
দিনের পর দিন যখন এভাবে থাকা হবে তখন আপনার সংস্পর্শে পরিবারের মানুষগুলোর মাঝেও পরিবর্তন আশা করা যেতে পারে। আর কিছু না হোক, আপনি ইবাদাতের বেলায় আমার আমিত্বতে অনেক শান্তিতে থাকবেন।