02/02/2026
অসমের জাতিঙ্গা গ্রামে পাখিদের এই অদ্ভুত আচরণের প্রথম লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় ১৯০৫ সালে, যদিও স্থানীয় আদিবাসীদের কাছে এটি বহু বছরের পুরনো এক ‘অভিশপ্ত’ ইতিহাস। প্রতি বছর বর্ষার শেষের দিকে, বিশেষ করে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে যখন উত্তর-পূর্ব ভারতের এই পাহাড় কুয়াশার চাদরে ঢেকে যায়, তখন এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে। অমাবস্যার অন্ধকার রাতে, যখন দক্ষিণ দিক থেকে উত্তরের দিকে তীব্র বাতাস বইতে শুরু করে, তখন হাজার হাজার স্থানীয় ও পরিযায়ী পাখি দিশেহারা হয়ে গ্রামের আলোগুলোর দিকে ছুটে আসে। ল্যাবরেটরির মতো নিখুঁত পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই ঘটনাটি ঘটে কেবল রাত ৭টা থেকে ১০টার মধ্যে। পাখিগুলো এমনভাবে আকাশ থেকে নেমে আসে যে মনে হয় তারা স্বেচ্ছায় আত্মাহুতি দিতে চাইছে। টাইগার বিটার্ন, ব্ল্যাক বিটার্ন, লিটল ইগ্রেট এবং কিংফিশারের মতো প্রায় ৪৪টি প্রজাতির পাখি এই রহস্যময় ঘটনার শিকার হয়।
গল্পের সবথেকে রোমহর্ষক দিকটি হলো এর আবহাওয়া সংক্রান্ত শর্তাবলী। পাখিরা এই ‘আত্মহত্যা’র পথ বেছে নেয় কেবল তখনই, যখন বাইরে ঘন কুয়াশা থাকে, কোনো চাঁদ থাকে না এবং বাতাস একটি নির্দিষ্ট গতিতে বয়। ল্যাবরেটরির কোনো কৃত্রিম পরিবেশে এই ধরণের পরিস্থিতি তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। গ্রামবাসীরা এক সময় বিশ্বাস করত যে আকাশ থেকে পাখিদের এই পতন হলো দেবতার আশীর্বাদ। তাঁরা মশাল জ্বালিয়ে এবং বড় বড় লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। আলো দেখে আকৃষ্ট হয়ে আসা পাখিগুলো যখন ঝোপঝাড় বা বাড়ির দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে নিচে পড়ে যেত, গ্রামবাসীরা সেগুলোকে ধরে রসদ হিসেবে ব্যবহার করতেন। এই নিষ্ঠুর প্রথাটি জাতিঙ্গাকে বিশ্বজুড়ে এক নেতিবাচক পরিচিতি দিয়েছিল, কিন্তু এর পেছনের বিজ্ঞান ছিল অনেক বেশি গভীর।
ভারতের প্রখ্যাত পক্ষীবিশারদ ডাঃ সালিম আলী জাতিঙ্গার এই রহস্য ভেদ করার জন্য অনেক সময় ব্যয় করেছিলেন। তাঁর মতে, পাখিরা আসলে ‘আত্মহত্যা’ করে না। ল্যাবরেটরির সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, জাতিঙ্গার ভৌগোলিক অবস্থান এবং আবহাওয়া পাখিদের নেভিগেশন সিস্টেম বা মগজাস্ত্রকে পুরোপুরি বিকল করে দেয়। উঁচু পাহাড়ের ওপর দিয়ে দ্রুত বেগে বয়ে আসা হাওয়া আর ঘন কুয়াশার কারণে পাখিরা তাঁদের স্বাভাবিক ওড়ার উচ্চতা বজায় রাখতে পারে না। কুয়াশার ভেতর দিয়ে যখন গ্রামবাসীর জ্বালানো তীব্র আলোর প্রতিফলন ঘটে, তখন পাখিরা দিশেহারা (Disoriented) হয়ে পড়ে। তাঁরা মনে করে ওই আলোটাই হয়তো মুক্ত আকাশ বা দিগন্তরেখা, আর সেই ভ্রান্তিতেই তাঁরা সজোরে আলোর দিকে ঝাঁপ দেয় এবং আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারা যায়।
বিজ্ঞানীদের মতে, জাতিঙ্গার মাটির নিচে থাকা এক ধরণের চৌম্বকীয় বিচ্যুতি (Geomagnetic Disturbance) এই ঘটনার জন্য আংশিকভাবে দায়ী হতে পারে। ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, পাহাড়ের শিলাস্তরে থাকা খনিজ পদার্থ এবং তীব্র বাতাসের ঘর্ষণে বায়ুমণ্ডলে এক ধরণের ইলেকট্রিক চার্জ তৈরি হয়। পাখিরা মূলত পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র ব্যবহার করে পথ চেনে। কিন্তু জাতিঙ্গার বিশেষ পরিস্থিতিতে তাঁদের সেই ‘বায়োলজিক্যাল কম্পাস’ কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ফলে সাধারণত দিনের বেলা চলাফেরা করা পাখিগুলো রাতে কুয়াশার মধ্যে দিকভ্রান্ত হয়ে এক মৃত্যুফাঁদে পা দেয়। এটি কোনো অলৌকিক অভিশাপ নয়, বরং এটি হলো ভূ-প্রকৃতি আর জীববিজ্ঞানের এক চরম সংঘর্ষ।
সময়ের সাথে সাথে জাতিঙ্গার মানুষের চিন্তাধারায় এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। তেরঙার নীল চক্রের গতির মতো জাতিঙ্গার সমাজ আজ ‘শিকারি’ থেকে ‘রক্ষক’-এ পরিণত হয়েছে। ভারতের বন্যপ্রাণী বিভাগ এবং বিভিন্ন এনজিওর সচেতনতামূলক প্রচারের ফলে গ্রামবাসীরা এখন মশাল জ্বালিয়ে পাখি শিকার করা বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন তাঁরা সেপ্টেম্বরের সেই দিনগুলোতে পাখিদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন এবং দিশেহারা পাখিদের আশ্রয় দিয়ে সকালে আবার মুক্ত আকাশে উড়িয়ে দেন। জাতিঙ্গা আজ কেবল ‘বার্ড সুইসাইড’-এর জন্য নয়, বরং মানুষের সচেতনতার এক জাদুকরী ও গৌরবোজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। জাতিঙ্গার সেই কুয়াশা ঢাকা আকাশ আজও এক রহস্যের সাক্ষী, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে—প্রকৃতির সব নিয়ম আমরা আজও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।