28/01/2023
বৃষ্টি থেমে গেছে.....!
আমিরুল হক রিবন
- আপনি কীভাবে সুস্থ আর অসুস্থ মানসিকতা, মানে পাগল বুঝেন? আচ্ছা বলুন তো, আমি কী সুস্থ না অসুস্থ মানসিকতার মানুষ?
- আপনি তো কমপ্লিটলি সুস্থ মানসিকতার মানুষ। বসুন....বসুন। আপনার সাথে কথা বলে বেশ ভাল লাগছে!
- আচ্ছা দরজার বাহিরে যে নেইম প্লেট....... ডঃ তানিয়া সামস্ সুইটি,মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, নিশ্চয় সেটা আপনি।
- জ্বি। আপনি ঠিক জায়গায়ই এসেছেন।
- দেখুন সুইটি...। সরি আপনাকে নাম ধরে ডাকছি।
- ঠিক আছে। আপনি বলুন।
- না.....মানে আপনার কাছে যে এতো এতো মানুষ আসে.. সবাই তো মানসিক সমস্যা নিয়ে...! নিশ্চয় আপনার খারাপ লাগে!
- মোটেই না বরং আমার বেশ ভালোই লাগে।
- কী বলেন? আমি হলে তো নিজেই মানসিক রোগী হয়ে যেতাম। ও....আচ্ছা...আচ্ছা বুঝতে পেরেছি,রোগী বেশি হলে তো আপনার আবার আয় রোজগার ও বেশি হয়, সেজন্যই সম্ভবতঃ আপনার ভালো লাগে.....তাই না!
- কী আবোলতাবোল বলছেন? আপনি সমস্যা বলুন।
- আপনার এখানে কেন এসেছি জানেন? পেছনের জানালা দিয়ে দেখুন,বাহিরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।দেখলাম আপনার চেম্বার একেবারে ফাঁকা।এই শহরে ডাক্তারদের চেম্বার সচারাচর এমন ফাঁকা পাওয়া যায় না। তাই সুযোগ টা নিতে ভিজিট দিয়ে ঢুকে পড়লাম। আপনি একজন শিক্ষিত মেয়ে তার উপর মনের রোগ নিয়ে লেখাপড়া করেছেন.... সময়টা ভালোই কাটবে। হা....হা...হা.. ঠিক করেছি না, বলুন?
- হোয়াট?আপনি কী আমার সাথে ফাজলামো করছেন?
- রাগছেন কেন? আমার সমস্যাটা শুনবেন তো!
- ঠিক আছে বলুন।
- "আপনি ঠিক জায়গায় এসেছেন" আপনার কথাটা শুনে নিজেকে তখন মানসিক রোগীই মনে হয়েছে। কিন্তু এখন.....আমার কথায় রাগ করা দেখে নিজেকে সুস্থ মানসিকতার মানুষ মনে হচ্ছে। বিষয়টা কী আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবেন?
- আপনার দুটো ভাবনাই কিন্তু স্বাভাবিক মানুষের পরিচয় বহন করে। আমাকে খুলে না বললে আমি কী করে বুঝবো আপনার সমস্যা কী? সাথে কাউকে নিয়ে আসলে ভালো হতো না?
- তা ঠিক। কিন্তু আমার সেটা ভালো লাগে না।
- সবসময় সবকিছু তো আর ভালো লাগে না, কিন্তু তারপরেও আমাদের তা করতে হয়। প্রয়োজন বলে কথা।
- যেমন আমার সাথে এখন আপনার কথা বলতে....ঠিক এমন না বিষয়গুলো?
- উচ্চস্বরে হেসে উঠে সুইটি..... না.. না... এমন না!
- বিষয়গুলো এমনই। তারপরও আমরা দায়িত্ব,পেশাদারিত্ব সব বিবেচনায় নিয়ে জোর করে মুখে হাসি ঝুলিয়ে রাখি! ভাবটা এমন, আমি বেশ আনন্দিত। তাই না।
- হু....হু...হা...হা। বেশ ইন্টারেস্টিং! হুম এটা অবশ্য ঠিক।
- আচ্ছা আপনি কী জানেন, আপনি কতটা অসাধারণ সুন্দরী! বিশেষ করে আপনার ক্যাটস আই। হাসির কথাটা বাদ দিলে নিজের সাথে প্রতারণা করা হবে। হাসিটাও কিন্তু অসম্ভব সুন্দর।
- দেখুন আমার মনে হচ্ছে আপনি আমাকে বিরক্ত করতে এসেছেন। বলেই ফোনটাতে হাত রাখে সুইটি।
- প্লিজ এই বৃষ্টির মধ্যে আমাকে বের করে দিবেন না। আমি কিন্তু আপনাকে বিরক্ত করছি না। বিশ্বাস করুন আমি আপনাকে সত্যি কথাটাই বলেছি। আমার সমস্যা কিন্তু এটাই।নিশ্চয় এখন আপনি বুঝতে পেরেছেন। আমি আপনাকে সত্যি কথাটা বলেছি কিন্তু আপনি আরো এগিয়ে চিন্তা করে কথাটাকে বিরক্ত হিসাবে ধরে নিয়েছেন! কেন আমরা এটা করি? আমাদের পারিপার্শ্বিক মানুষের মনস্তত্ব বিবেচনা করে। কারণ এরপর তেমনটাই ঘটে যেটা আপনি ভাবছেন,তাই তো! যে জাতি বা সংস্কৃতির মধ্যে এমনটা ঘটে না তাদের কাছে আপনার আগ বাড়িয়ে এই ব্যতিক্রম চিন্তাটার জন্মাই হয় না।
- সুইটি চেয়ারে নড়েচড়ে বসে। মাথাটা সামনে এগিয়ে এনে দূই হাত টেবিলে ভর দিয়ে বসে....
- আপনি কী প্লিজ আপনার সমস্যা টা একটু পরিষ্কার করে বলবেন।
- জ্বি আরো স্পষ্ট করে বলছি, আপনি যদি আমাকে মানসিক রোগী না ভেবে একজন সম্ভ্রান্ত ও হ্যান্ডসাম সুদর্শন যুবক ভাবতেন আর ঠিক এই কথাগুলো,আপনার আগ বাড়ানো চিন্তা সহ ই বলতাম, আমি নিশ্চিত আপনি আমাকে ধন্যবাদ দিতেন। দেখুন আমি মেকি বুঝি কিন্তু সেভাবে চলতে পারি না। ধরুন আপনাকে দেখে আমার বেশ সুন্দর মনে হয়েছে বা কাছে পাওয়ার বাসনা জেগেছে, আমি সরাসরি সেটাই বলতে পারি। এরজন্য অন্যরা যা করে, প্রথমে....আপনি খুব সুন্দর.... আপনাকে আমি ভালবাসি, তারপর.....কাছে পেতে চাই..মানে মূলে ফিরে আসে! এতগুলো ধাপ অযথা কেন আমরা করছি? আমাদের বেঁচে থাকার সময়কাল কী এতটাই দীর্ঘ? নিশ্চয় এখন আমার কথাগুলো বুঝতে পেরেছেন!
- জ্বি। বেশ জটিল ধরনের চিন্তা। অন্যভাবে বললে খুব সাধারণ চিন্তা। আমরা মানুষ সেটাকে অহেতুক জটিল করে নিজের প্যাচে ফেঁসে যাচ্ছি।
- হয়তো....! কিন্তু তার থেকেও জটিল বিষয় হচ্ছে দেখা। আমরা ভাবছি..... আমরা চোখ দিয়ে দেখছি। এটা কিন্তু পুরোপুরি সঠিক না। যেমন আপনি আমাকে মানসিক রোগী হিসাবে দেখছেন। অথচ আমি পুরোপুরি নিখুঁত সুদর্শন হ্যান্ডসাম একজন মানুষ। একটু ভালো করে খেয়াল করে দেখুন আমাকে। নিশ্চয় ভুল বলিনি!
ফ্যামিলি স্ট্যাটাস,অর্থনৈতিক অবস্থা,শিক্ষা সবকিছুই বেশ উঁচু দরের। এই আমাকে আপনি কিন্তু ভালবাসবেন না,বেশি জোর একটা মায়া বা করুণা জাতীয় আবেগের জন্ম হতে পারে। তা-ও খুব ক্ষনস্থায়ী।
তেমনি উল্টোটাও... সুস্থ,স্বাভাবিক,নিখুঁত পরিপাটি সুদর্শন অথচ বাকি সব..... মানে ফ্যামিলি স্ট্যাটাস,অর্থনৈতিক অবস্থা,শিক্ষা সবই নিচু দরের সেক্ষেত্রে ও একই প্রতিক্রিয়া।
কিন্তু যখনই এই আমাকে সুস্থ মানুষ হিসাবে দেখবেন। আমি নিশ্চিত আমার ভালবাসার প্রস্তাব আপনি ফেরাতে পারবেন না। আমি কী আপনাকে বুঝাতে পেরেছি?
দেখা শুধু বস্তুর আলো চোখে এসে পড়া-ই নয়,আরো বিস্তৃত। দাঁড়ান আমি আপনাকে আরো একটু গুছিয়ে বলার চেষ্টা করছি! ধরুন,গহীন জঙ্গলে নদীর তীরে একটা কুমির মুখ খুলে হা হয়ে আছে আর কিছু প্লোভার পাখি তার মুখের ভিতরে অনায়াসে ঘুরে আসছে। কি সাংঘাতিক! হিংস্র এই প্রাণীর কাছাকাছি গেলেই নিশ্চিত বিপদ। শুধু কি মানুষ, কুমিরকে ভয় পায় অন্যান্য প্রাণীরা ও।
কারণ মুখের কাছে যা পায় তাই গিলে খায় সে। কিন্তু এই গ্লোভার পাখিরা তাকে একটু ও ভয় করে না। তার মুখের ভিতরে ঢুকে দাঁতে লেগে থাকা উচ্ছিষ্ট খাবার ঠোঁট চালিয়ে উদরপূর্তির উৎসবে উল্টো ব্যস্ত হয়ে উঠে। অথচ এ সময় কুমির মুখ বন্ধ করলেই পাখিগুলো উদরসাৎ হয়ে যাবে নিমেষেই।কিন্তু কুমির তাদের সাথে এমন আচরণ কখনোই করে না। সিমবায়োসিস না বুঝলে দেখাটা নিশ্চয় চিন্তায় ফেলবে আপনাকে। আসলে দেখতে হলে অনেক কিছুরই প্রয়োজন হয়। কি বলেন?
- হুম। আচ্ছা আপনি কী আমাকে আপনার পরিচয়টা বলবেন?
- অবশ্যই। আমার নাম দ্রোহ। বয়স ৩৫ বছর।
- আপনার মা-বাবা,ভাই-বোন?
- মা-বাবাকে হারিয়ে ফেলেছি। এক বোন আছে,বিয়ে হয়ে গিয়েছে।
- বিয়ে করেছেন নিশ্চয়?
- না।
- বোনের কাছে থাকেন?
- না।
- বোন কি আপনার পাশাপাশি থাকেন?
- না। প্রায় ১২৬০০ মাইল দূরত্বে।
- মানে কি?
- দেশের বাহিরে।
- কোন দেশে?
- এই তো আপনি আমার স্ট্যাটাস বুঝতে চাচ্ছেন?
- হেসে দেয় সুইটি....ঠিক বলেছেন!
- আপনি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হয়ে ও সহজ কৌতুহলকে জটিল করে প্রকাশ করছেন! কেন এটা করছেন,জানেন? যাহোক ; অর্থনৈতিক ও একাডেমিক দুইটা স্ট্যাটাসই মন্দ বলতে পারবেন না। সাধারণ মানুষ হিসাবে নিয়েছেন বলেই আমার নামটা শুনে চমকে ওঠেননি! হা....হা....! ফান করলাম।
সুইটি সত্যিই চমকে উঠে। ধীরে ধীরে ভাবনার গভীরে তলিয়ে যেতে থাকে। উনি কী তাহলে সেই দ্রোহ....!
- দেখুন একজন মানুষ সাধারণ হলে তার অসাধারণ কথা ও মূল্যহীন কিন্তু একজন মানুষ অসাধারণ হয়ে উঠলেই তার সাধারণ কথা ও অসাধারণ হয়ে উঠে। আপনি এখন সে গোলক ধাঁধায় ঘুরছেন!
- ঠিক তা না! তবে আংশিক সত্য। আমি আপনাকে চেনার চেষ্টা করছি।
- হা....হা...হাহা..হা..! মানুষ সে তার নিজেকেই চেনে না, সেখানে অন্যকে চেনার ব্যাকুলতা!! আচ্ছা ধর্ম,সমাজের রীতি অনুযায়ী আপনি তো এখনো অবিবাহিত।
- হ্যাঁ। মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দেয় সুইটি। আচ্ছা আপনি ধর্ম,সমাজ যোগ করে কেন অবিবাহিত কথাটা বললেন।
- সত্য শুনতে হলে যা বলতে হয়!
- মানে কী? ক্ষেপে উঠে সুইটি। আপনি যে-ই হোন না কেন, এখান থেকে বের হবেন এক্ষুনি। তা না হলে আপনাকে দারোয়ান ডেকে বের করবো।
- সত্যি শুনলেই মানুষ ক্ষেপে উঠে। আবার সত্যের সন্ধান করতে করতে ঘেমে-নেয়ে শেষ! হা...হা...হা...! দেখুন দেখুন জানালা দিয়ে.... বৃষ্টি থেমে গেছে। আমি তো উঠতেই চাচ্ছিলাম কিন্তু আপনি অংকের ভালবাসায় আমাকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন, রোগীর চিকিৎসা ফেলে নিজের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। আমি উঠতে চেয়েছি বলেই তো আপনার আই-কিউ পরীক্ষা নিয়েছি। হা.....হা.....হা.....!! ভালো করে দেখুন....বৃষ্টি সত্যিই থেমে গেছে!