16/02/2026
ছোটবেলা থেকে আমি কখনো ফার্স্ট, সেকেন্ড কিংবা থার্ড হইনি। পরিবার থেকেও খুব একটা উৎসাহ বা অনুপ্রেরণা পাইনি সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। তবুও থেমে থাকিনি। নিজের মতো করে পড়াশোনা চালিয়ে গেছি। জীবনের পথে অনেক ধরনের শিক্ষক পেয়েছি। কেউ ছিলেন সত্যিকারের পথপ্রদর্শক, আবার কেউ ছিলেন শুধু নামকাওয়াস্তে শিক্ষক।
প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন কিছু শিক্ষক থাকেন, যারা শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান না দিয়ে সহজ পথে পাশ করিয়ে দেওয়ার কৌশল শেখান। আমরাও এমন শিক্ষক পেয়েছি। তখন বুঝতাম না, তাই যিনি প্রশ্ন ফাঁস করতেন বা সহজ করে দিতেন, তাকেই বেশি ভালো লাগত। মনে হতো তিনিই আমাদের জন্য সবচেয়ে উপকারী। কিন্তু যখন একটু বড় হলাম, বুঝতে শিখলাম, তখন উপলব্ধি করলাম—তিনি আমাদের উপকার নয়, ভবিষ্যৎটাই নষ্ট করছিলেন।
আবার এমন শিক্ষকও পেয়েছি, যারা শিখিয়েছেন কিভাবে নিজের যোগ্যতায় নিজের অবস্থান তৈরি করতে হয়। তারা কখনো শর্টকাট শেখাননি, বরং শিখিয়েছেন পরিশ্রমের মূল্য। আজ বুঝি, সেই শিক্ষাগুলোই আসল সম্পদ।
শিক্ষার কোনো শেষ নেই। আমি এখনো শিখছি, শেখাচ্ছি, আর আল্লাহ চাইলে সারাজীবন শিখেই যেতে চাই।
আমি নিজে একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করি। চেষ্টা করি, আমার ছাত্রছাত্রীরা যেন অন্তত আমার মাধ্যমে একটি অক্ষরও সত্যিকারের শিখতে পারে। আজ আমাদের প্রতিষ্ঠানের ফলাফল প্রকাশ হয়েছে। দেখলাম কিছু অভিভাবক মন খারাপ করছেন—তাদের সন্তান কেন ফার্স্ট হলো না, সেকেন্ড হলো না। তখন একজনকে বলেছিলাম, আপনার সন্তান ফার্স্ট না হলেও মন খারাপ করবেন না। বরং ভাবুন, সে পুরো বছরে কী শিখেছে, কতটুকু নিজেকে উন্নত করতে পেরেছে। অবস্থান নয়, অর্জনটাই বড় কথা।
আমি দু’জন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীকে আলাদা করে পড়াই। কিন্তু আমার কাছে দশজন ছাত্র যেমন, ওই দু’জনও তেমন। আমি কখনো চাই না কেউ বিশেষ সুবিধা পাক। কারণ আমি জানি, অন্যায়ভাবে নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া বা প্রশ্ন ধরিয়ে দেওয়া মানে একটি শিশুর ভবিষ্যৎকে ধীরে ধীরে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া।
আমাদের সময় এমন একজন শিক্ষককে দেখেছিলাম, যিনি এক শিক্ষার্থীর ১৩ নম্বরকে ৩৩ বানিয়ে দিয়েছিলেন, শুধু সে তার কাছে প্রাইভেট পড়তো বলে। সেদিন বুঝেছিলাম, শিক্ষকের অন্যায় সিদ্ধান্ত কতটা ভয়ংকর হতে পারে।
আমি শিক্ষকতার পেশাকে সম্মান করি। আমি নিজেও এই পেশায় আছি। তাই খুব করে চাই, আমরা যেন এমন কিছু না করি যা একটি শিশুর জীবন নষ্ট করে দেয়। আমাদের কারণেই যেন তাদের ভবিষ্যৎ সুন্দর হয়।
আমি এমন শিক্ষক হতে চাই না, যে ক্লাসে এসে একটু হাসাহাসি করল, গল্প করল, তারপর চলে গেল—আর ছাত্ররা তাকে “বেস্ট টিচার” বলল, অথচ কিছুই শিখল না। আমি চাই, আমার ক্লাসে ঢুকলেই তারা বই খুলে বসুক। আমি যে চল্লিশ মিনিট সময় নেব, সেই চল্লিশ মিনিট যেন তাদের জীবনে বৃথা না যায়। তারা হয়তো আজ বুঝছে না, কিন্তু চল্লিশ বছর পর যেন মনে করে—এই মানুষটা আমাদের সত্যিকারের কিছু শিখিয়েছিল।
আজ আমি সবচেয়ে বেশি মিস করি সেই শিক্ষককে, যিনি আমাকে শাসন করেছিলেন, প্রয়োজনে হাতে আঘাতও করেছিলেন। তখন কষ্ট পেয়েছিলাম, কিন্তু আজ বুঝি, তিনি আমাকে সময়ের মূল্য শিখিয়েছিলেন। তার কঠোরতার ভেতরেই ছিল মমতা।
শেষ কথা একটাই—আজকাল শিক্ষা যেন অনেক সময় ব্যবসার মতো হয়ে গেছে। খুশি রাখতে পারলেই পাশ করিয়ে দেওয়া হয়। অনেক অভিভাবক কষ্ট করে সন্তানকে পড়ান, কিন্তু যখন দেখেন যোগ্যতার চেয়ে প্রভাব বা কৌশলে কেউ প্রথম হয়ে যায়, তখন মনটা ভেঙে যায়।
আমি বিশ্বাস করি, সত্যিকারের শিক্ষা হলো চরিত্র গড়ার প্রক্রিয়া। ফার্স্ট হওয়া বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, একজন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা। আর একজন শিক্ষক হিসেবে আমার দায়িত্ব—এই মানুষটাকে তৈরি করার পথে সৎ থাকা।