26/09/2026
এক গ্রামে এমন এক মহিলা বাস করতেন, যার সবচেয়ে প্রিয় শখ ছিল অন্যের নামে গুজব ছড়ানো এবং কান-কথা লাগানো (চোগলখোরি)। তিনি একজনের কথা আরেকজনের কাছে এমনভাবে রসিয়ে রসিয়ে বলতেন যে, মুহূর্তের মধ্যেই গ্রামে বিশাল ঝগড়া বেধে যেত।
একদিন তিনি গ্রামের এক অত্যন্ত সৎ ও নিরীহ পরিবারের নামে একটি ভয়ংকর মিথ্যা কথা ছড়ালেন। তার এই চোগলখোরির কারণে পুরো গ্রামে ওই পরিবারের মান-সম্মান ধুলোয় মিশে গেল। অপমানে ও লজ্জায় পরিবারটি ঘর থেকে বের হওয়াই বন্ধ করে দিল।
কিছুদিন পর মহিলার মনে হঠাৎ অনুশোচনা হলো। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি রাগের মাথায় একটি মিথ্যে কথা বলে কত বড় পাপ করে ফেলেছেন। অনুতপ্ত হয়ে তিনি ছুটে গেলেন গ্রামের এক প্রজ্ঞাবান দরবেশের কাছে।
তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "হুজুর! আমি এক নিরীহ পরিবারের নামে মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়ে অনেক বড় ভুল করেছি। আমার কারণে তাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। আমি এখন তওবা করতে চাই। আমাকে এমন কোনো উপায় বলে দিন, যাতে আমার এই পাপ মোচন হয় এবং আমি আমার ভুল শুধরে নিতে পারি।"
দরবেশ কিছুক্ষণ শান্ত থেকে বললেন, "তুমি যদি সত্যিই তোমার ভুল শুধরাতে চাও, তবে তোমাকে একটি কাজ করতে হবে।"
মহিলাটি বললেন, "আপনি যা বলবেন, আমি তা-ই করব।"
দরবেশ তাকে একটি বস্তা ভর্তি 'পাখির পালক' দিয়ে বললেন, "আজ রাতে তুমি গ্রামের প্রত্যেকটি বাড়ির দরজার সামনে এই বস্তা থেকে একটি করে পালক রেখে আসবে। কাজ শেষ হলে কাল সকালে আমার কাছে আসবে।"
মহিলাটি ভাবলেন, এ আর এমন কী কঠিন কাজ! তিনি সারারাত জেগে গ্রামের প্রতিটি বাড়ির সামনে একটি করে পালক রেখে এলেন এবং সকালে হাসিমুখে দরবেশের কাছে গিয়ে বললেন, "হুজুর, আমি আপনার কথা মতো সব পালক রেখে এসেছি।"
দরবেশ এবার বললেন, "খুব ভালো করেছ। এবার যাও, কাল রাতে যে পালকগুলো যেখানে যেখানে রেখে এসেছিলে, সেগুলো কুড়িয়ে আবার এই বস্তায় ভরে নিয়ে আসো।"
মহিলাটি সাথে সাথে ছুটে গেলেন গ্রামে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তার মাথায় হাত! রাতের বাতাসে পালকগুলো উড়ে পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। কোনোটি খালে-বিলে, কোনোটি জঙ্গলে, আবার কোনোটি দূর-দূরান্তে উড়ে চলে গেছে। সারাদিন হন্যে হয়ে খুঁজেও তিনি একটি পালকও জমা করতে পারলেন না।
অশ্রুসিক্ত চোখে খালি বস্তা হাতে তিনি দরবেশের কাছে ফিরে এসে বললেন, "হুজুর, আমি তো একটি পালকও কুড়িয়ে আনতে পারলাম না! রাতের বাতাসে সব উড়ে কোথায় যে হারিয়ে গেছে, তার কোনো হদিস নেই।"
দরবেশ তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"মা! তোমার ছড়ানো অপবাদ আর কান-কথাগুলোর অবস্থাও ঠিক এই পালকগুলোর মতোই। মুখ থেকে একবার যে কথা বেরিয়ে যায়, তা বাতাসের মতো মানুষের মুখে মুখে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, তুমি চাইলেও তা আর কখনো কুড়িয়ে আনতে পারবে না।
তুমি হয়তো আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিজের মনকে সান্ত্বনা দিতে পারবে, কিন্তু ওই নিরীহ পরিবারটির সম্মান যে পুরো সমাজে চিরতরে নষ্ট হয়ে গেল, তা তুমি কীভাবে ফিরিয়ে দেবে?"
মহিলাটি এবার ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, তলোয়ারের ক্ষত শুকিয়ে যায়, কিন্তু চোগলখোরি আর অপবাদের ক্ষত কখনো মোছে না।
হযরত আলী (রা.) অত্যন্ত চমৎকার একটি কথা বলেছেন, "তীর ধনুক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর যেমন আর ফিরিয়ে আনা যায় না, মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়া কথাও তেমনি আর কখনো ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।"
তাই, নিজের মুখ থেকে কারো সম্পর্কে কোনো কথা বের করার আগে অন্তত একবার ভাবুন, আপনি কি সত্য বলছেন, নাকি বাতাসে এমন কোনো পালক ওড়াচ্ছেন যা আপনি আর কখনোই কুড়িয়ে আনতে পারবেন না?
ইয়া রব! আমাদের জিহ্বাকে অন্যের গিবত, চোগলখোরি এবং অপবাদ দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র রাখুন। আমরা যেন কখনো কারো সম্মান নষ্ট করার কারণ না হই, আমাদের সেই তাওফিক দান করুন। আমিন
Salman Farsi
-- ইবরতনাক ওয়াকিয়াত