08/07/2025
ইসলামে নারীর জন্য পর্দার বিধান একটি ফরজ বিধান, যা কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত। এটি কেবল পোশাকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থা যা নারীর সম্মান, সতীত্ব ও পবিত্রতা রক্ষা করে এবং সমাজে অশ্লীলতা রোধে সহায়তা করে। ইসলামে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই পর্দার বিধান রয়েছে, তবে তাদের প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভিন্নতা আছে।
পর্দার উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব:
* সতীত্ব ও পবিত্রতা রক্ষা: পর্দা নারীর সতীত্ব ও ইজ্জত-আব্রুর রক্ষাকবচ। এটি নারী-পুরুষ উভয়ের চারিত্রিক পবিত্রতা ও হৃদয়-মনের পরিশুদ্ধি অর্জনে সহায়ক। আল্লাহ তাআলা বলেন, "এ বিধান তোমাদের ও তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ।" (সূরা আহযাব: ৫৩)
* ফিতনা (অশ্লীলতা) থেকে সুরক্ষা: নারীর সৌন্দর্য প্রদর্শন পুরুষদের অবৈধ ও অশ্লীল কাজের প্রতি উত্তেজিত করে তোলে, যা সমাজে ব্যভিচার, ধর্ষণ ও অন্যান্য অপরাধ বৃদ্ধির কারণ হয়। পর্দা এই ফিতনা থেকে সুরক্ষা দেয়।
* নারীর মর্যাদা ও সম্মান: পর্দা নারীকে সমাজে সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করে। এটি নারীকে পণ্য হিসেবে বিবেচিত হওয়া থেকে রক্ষা করে।
* পরিচয় ও নিরাপত্তা: পর্দা নারীদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে এবং তাদের সম্মানজনক পরিচয় দেয়, ফলে দুষ্ট প্রকৃতির লোকেরা তাদের বিরক্ত করার সাহস পায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, "এটি অধিকতর উপযোগী পদ্ধতি, যাতে তাদেরকে চিনে নেয়া যায় এবং কষ্ট না দেয়া হয়।" (সূরা আহযাব: ৫৯)
নারীর পর্দার বিধান (কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে):
ইসলামী শরীয়তে নারীর পর্দার মূলনীতি হলো, মাহরাম (যাদের সাথে বিবাহ হারাম) ব্যতীত অন্য পুরুষের সামনে শরীরের যেসব অংশ ফিতনার কারণ হতে পারে, সেসব ঢেকে রাখা। এর বিস্তারিত রূপ নিম্নরূপ:
১. পোশাকের ক্ষেত্রে:
* সম্পূর্ণ শরীর ঢাকা: প্রাপ্তবয়স্কা নারীর জন্য মুখমণ্ডল ও দুই হাতের কব্জি পর্যন্ত ব্যতীত শরীরের সমস্ত অংশ ঢেকে রাখা ফরজ। কিছু আলেম মুখমণ্ডলও ঢাকার কথা বলেন, বিশেষত ফিতনার যুগে।
* খিমার (মাথার ওড়না) ব্যবহার: সূরা নূর-এর ৩১ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, "আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে; আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে তবে যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে থাকে। আর তারা তাদের গলা ও বুক যেন মাথার কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখে।" (সূরা নূর: ৩১) এই আয়াত দ্বারা গলা ও বক্ষদেশ মাথার ওড়না বা খিমার দ্বারা ঢেকে রাখা ফরজ।
* জিলবাব (বড় চাদর) ব্যবহার: সূরা আহযাবের ৫৯ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, "হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রী, কন্যাগণকে ও মুমিনদের নারীগণকে বল: তারা যেন তাদের ওড়না বা চাদরের কিছু অংশ নিজেদের (চেহারা ও বুকের) উপর টেনে দেয়।" (সূরা আহযাব: ৫৯) "জিলবাব" হলো এমন এক প্রকারের বড় চাদর যা মাথা থেকে পা পর্যন্ত পুরো শরীরকে আবৃত করে।
* পোশাকের ধরন: পোশাক এমন হতে হবে যা শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও আকৃতি প্রকাশ করে না, আঁটসাঁট হয় না, পাতলা বা স্বচ্ছ হয় না, এবং পুরুষদের পোশাকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয় না। এটি যেন কোনো আকর্ষণীয় বা মনোযোগ আকর্ষণকারী পোশাক না হয়।
* সুগন্ধি ব্যবহার পরিহার: বাইরে যাওয়ার সময় এমন সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে না যা পরপুরুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে।
২. দৃষ্টি সংযত রাখা:
* নারীর জন্য পরপুরুষের দিকে কুদৃষ্টিতে তাকানো হারাম। আল্লাহ তাআলা নারী-পুরুষ উভয়কেই দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। (সূরা নূর: ৩০-৩১)
৩. কথা বলার ক্ষেত্রে:
* পরপুরুষের সাথে প্রয়োজন অনুযায়ী কথা বলা যাবে, তবে আকর্ষণীয় বা কোমল কণ্ঠে কথা বলা যাবে না, যা দুর্বল হৃদয়ের পুরুষদের মনে লালসা সৃষ্টি করতে পারে। আল্লাহ তাআলা নবীপত্নীদের উদ্দেশে বলেন, "তোমরা (পরপুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। এবং তোমরা পরিষ্কার ও স্বাভাবিকভাবে কথা বলবে।" (সূরা আহযাব: ৩২)
৪. চলাফেরার ক্ষেত্রে:
* নারীরা যেন এমনভাবে চলাফেরা না করে যাতে তাদের গোপন সৌন্দর্য বা অলঙ্কারের শব্দ প্রকাশিত হয়।
* প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যাওয়া জায়েজ, তবে তা যেন পর্দার বিধান মেনেই হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "নারী পর্দাবৃত থাকার বস্তু। যখন সে পর্দাহীন হয়ে বের হয় তখন শয়তান তার দিকে চোখ তুলে তাকায়।" (তিরমিজি, হাদিস: ১১৭৩)
মাহরাম ও গায়রে মাহরাম:
পর্দার বিধান প্রযোজ্য হয় গায়রে মাহরাম পুরুষের ক্ষেত্রে। মাহরাম পুরুষ হলো এমন আত্মীয় যাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া স্থায়ীভাবে হারাম। যেমন: পিতা, ভাই, পুত্র, শ্বশুর, চাচা, মামা, ভাগ্নে, ভাতিজা ইত্যাদি। মাহরাম পুরুষের সামনে নারীর জন্য মুখমণ্ডল, চুল, গলা, কাঁধ, হাত এবং পা খোলা রাখা জায়েজ।
অন্যদিকে, গায়রে মাহরাম পুরুষ হলো এমন পুরুষ যাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েজ। যেমন: দেবর, ভাসুর, চাচাতো ভাই, মামাতো ভাই, ফুফাতো ভাই, খালতো ভাই, এবং অন্যান্য অচেনা পুরুষ। এদের সবার সামনে নারীর জন্য পূর্ণ পর্দা করা ফরজ।
সংক্ষেপে, ইসলামে নারীর জন্য পর্দা তাদের সম্মান, নিরাপত্তা এবং সমাজের পবিত্রতা রক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ফরজ বিধান।