09/10/2020
ব্যাপারটা যদি এমন হত রেপিস্ট ক্রিমিনালরা কনভিক্টেড হয়ে যাবজ্জীবন বা দশ বছরের কারাদণ্ড পাচ্ছে কিন্তু তারপরেও রেইপ কমছে না তাহলে রেইপের শাস্তি বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ডের দাবীর একটা যৌক্তিকতা থাকত। আমাদের সমস্যা হচ্ছে রেইপের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দোষীই প্রমাণ করা যাচ্ছে না। এখন আপনি শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন রেখে কী করবেন ? অভিযুক্ত যে অপরাধী সেটা প্রমাণ করতে না পারার কারণে আসামি খালাস পেয়ে যাচ্ছে। আমরা আছি মৃত্যুদণ্ড নিয়ে। যার দোষ প্রমাণিত হয় নাই তাকে মৃত্যুদণ্ড কীভাবে দেবেন ?
আমাদের দেশে ক্রিমিনাল মামলায় কনভিকশনের রেট ১০-১২% মাত্র। অর্থাৎ আমাদের দেশে ১০০ টা ক্রিমিনাল মামলা হলে ১০- ১২ টা মামলায় আসামি সাজা পায় বাকি প্রায় ৯০ টা মামলায় আসামি খালাস পায়। রেইপের ক্ষেত্রেও স্ট্যাটিস্টিক্স একইরকম। ১০০ টা রেইপ মামলা দায়ের করা হলে ১০-১৫ টার মত মামলায় আসামিকে দোষী প্রমান করা যায় এবং শাস্তি হয়। বাকি ৮০% এর অধিক মামলায় আসামি খালাস পেয়ে যায় কারণ তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।
অপরাধীকে কম শাস্তি দেওয়া হচ্ছে এটা আমাদের সমস্যা না৷ আমাদের মূল সমস্যা হচ্ছে অপরাধীর অপরাধ প্রমাণ করা যাচ্ছে না। এই ক্ষেত্রে আমরা বিচার বিভাগকে হয়ত কিছুটা দোষারোপ করতে পারি। কিন্তু বিচারককে দোষ দিতে পারি না৷ কারণ, বিচারক তার সামনে উত্থাপিত সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে রায় দেবেন। অভিযোগকারী পক্ষ যদি পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ না দিতে পারে তাহলে খালাস দেওয়া ছাড়া বিচারকের কাছে আর কোন অপশন থাকে না। অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও বিচারক অনেক সময় জামিন না দিয়ে আসামিকে কারাগারে আটকে রাখেন এটিও আসামির প্রতি অন্যায়।
প্রথমে থানায় এফআইআর বা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে কমপ্লেইন দায়ের করে মামলা শুরু হবে। এরপরে পুলিশ ইনভেস্টিগেশন শুরু করবে। এই পর্যায়ে এসে দেখতে হবে পুলিশে রেইপ, মার্ডার এর মত সিরিয়াস ক্রাইম গুলো ইনভেস্টিগেট করার মত দক্ষ অফিসার আছে কিনা, আইন শৃঙ্খলা রক্ষা এবং অনেকের প্রটোকল দেওয়ার পাশাপাশি ধীরে সুস্থে ইনভেস্টিগেশন করার সামর্থ্য এবং সুযোগ পুলিশের আছে কিনা। স্বাভাবিকভাবেই এত বড় দেশে একটা থানায় এত অল্প সংখ্যক পুলিশ দিয়ে সব অপরাধের ক্ষেত্রে সঠিক ইনভেস্টিগেশন সম্ভব না। এরপরে আসে পুলিশের ইনভেস্টিগেশন নিরপেক্ষ হবে কিনা। পুলিশের উপর প্রভাবশালীদের প্রেশার এবং দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের লোভ থেকে ইনভেস্টিগেশন নিরপেক্ষ নাও হতে পারে। অনেকক্ষেত্রে এমন হতে পারে প্রভাবশালীদের ভয়ে ভিকটিম থানায় আসারই সাহস পেল না৷
এরপরে প্রসিকিউশন লইয়ারের কাজ হচ্ছে কোর্টে অপরাধ অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করা। বাংলাদেশে প্রসিকিউটরই নিয়োগ করা হয় সরকারি দলের কর্মী উকিলদের মধ্য থেকে। তাদের বেশীরভাগই অদক্ষ। প্রসিকিউটরের বেতন দিনমজুরদের চেয়েও কম। তাই কোন ভালো উকিলই প্রসিকিউটর হতে চায় না। এক্ষেত্রে আসামি যদি প্রভাবশালী হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে সাক্ষী কোর্টে এসে সাক্ষ্য দিতে ভয় পায়।
কোর্টে বিচারক আছে প্রয়োজনের তুলনায় পাঁচ ভাগের একভাগ। তাই মামলা ঝুলে থাকে অনেকদিন। টাইম টেবিলের কোন ঠিক নাই। এত ভোগান্তি স্বীকার করে কে এসে কোর্টে সাক্ষ্য দেবে!! ততদিনে তদন্তকারী পুলিশ অফিসার বদলি হয়ে দেশের অন্য প্রান্তে চলে যায়। তাকে এনে জেরা করতে অনেক সময় পার হয়ে যায়।
এই ব্যাপারগুলো রেইপসহ সব ক্রিমিনাল কেইসের ক্ষেত্রে সত্যি। এখন এগুলো ঠিক করতে না পারলে অপরাধী তো অপরাধ করেছে তাই প্রমাণিত হবে না। প্রমাণের অভাবে খালাস পেয়ে বেরিয়ে যাবে। তাহলে ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যুদন্ড আইনে রেখে কোন লাভ হচ্ছে না৷
অপরাধবিজ্ঞানী সিজার বেকারিয়া বলেছেন, Severity of punishment doesn’t deter. It is certainty of punishment that deters.
উদাহরণস্বরূপ : ১০০ জন রেপিস্ট রেইপ করেছে। এখন বিচারব্যবস্থা যদি এমন হয় যে দশজন রেপিস্টের ফাঁসি হয়েছে কিন্তু ৯০ জন প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়ে গেছে। তাহলে রেইপ খুব একটা কমবে না। কারণ, ছাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা ৯০%। কিন্তু যদি এমন হয় যে, রেইপের শাস্তি ৫ বছরের জেল। ১০০ জন অপরাধীর ক্ষেত্রে ৯০ জনের ৫ বছর করে জেল হল, ১০ জন ছাড়া পেল তাতে কিন্তু অপরাধ অনেক কমে যাবে। কারণ, এবার ধরা পড়ার সম্ভাবনা ৯০%।
তাই কঠোর শাস্তির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে শাস্তির নিশ্চয়তা।
রেইপকে নারীর প্রতি সহিংসতার জায়গা থেকে দেখে নারীর নিরাপত্তা এবং ক্ষমতায়নের জন্য অবশ্যই কাজ করতে হবে। কিন্তু বিচারের ক্ষেত্রে রেইপকে দেখতে হবে একটা ক্রাইম হিসেবে। ক্রাইমের বিচার পেতে হলে শুধু রেইপের জন্য কিছু রিফর্মেশন দাবী করে লাভ হবে না। কথা বলতে হবে পুরো 'ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম' এর রিফর্মেশন এর জন্য। আমাদের এখন যে ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম আছে তাতে রেইপসহ যেকোন ক্রাইমের ক্ষেত্রে রিফর্মেশন না আনলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা মোটামুটি অসম্ভব।
collected