Bangla Story Link World

Bangla Story Link World only story upload here, you can buy books here very soon.....

গল্প> #আমার_গল্পে_তুমি ( পালিয়ে বিয়ে)  সকল পর্ব একসাথে। লিখক> Md Najmul Huda Sharif 🚫এই গল্পটা Raihan dairy ইউটিউব চ্যান...
23/08/2026

গল্প> #আমার_গল্পে_তুমি ( পালিয়ে বিয়ে) সকল পর্ব একসাথে।
লিখক> Md Najmul Huda Sharif

🚫এই গল্পটা Raihan dairy ইউটিউব চ্যানেলকে voice আকারে আপলোড করার কপিরাইট দেওয়া হলো অন্য কোন ইউটিউবার কপি করা হতে বিরত থাকবেন 🚫

১

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192001584894169/?app=fbl

২

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192033696894169/?app=fbl

৩

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192120060894169/?app=fbl

৪

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192146844894169/?app=fbl

৫

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192214932894169/?app=fbl

৬

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192265818894169/?app=fbl

৭

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192330918894169/?app=fbl

৮

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192387246894169/?app=fbl

৯

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192453876894169/?app=fbl

শেষ পর্ব

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192501330894169/?app=fbl

এমন আরো গল্প পেতে এই পেজটি ফলো করে রাখুন
>>>>>>>> গল্পের শহরে তুমি আমি >>>>>>

গল্প> #আমার_গল্পে_তুমি ( পালিয়ে বিয়ে) ১ম পর্ব
লিখক> Md Najmul Huda Sharif

🚫এই গল্পটা Raihan dairy ইউটিউব চ্যানেলকে voice আকারে আপলোড করার কপিরাইট দেওয়া হলো অন্য কোন ইউটিউবার কপি করা হতে বিরত থাকবেন🚫

( গল্পটা ২০১০ থেকে ২০১৩ ঘটনা চিন্তা করে লিখা)

অনন্যা তখন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার চোখেমুখে একটুও মায়া নেই। যেন এই বাড়িতে, এই মানুষটির সঙ্গে কাটানো গত দুই বছরের কোনো স্মৃতিই তার মনে আর অবশিষ্ট নেই।

আকাশ বারবার তাকে আটকানোর চেষ্টা করছে। একসময় অসহায় হয়ে অনন্যার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। দু’হাত জোড় করে কাঁপা কণ্ঠে বলতে লাগল,

—প্লিজ অনন্যা... আমাকে ছেড়ে যেও না। এই দুনিয়ায় তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই। তোমাকে ভালোবেসে আমি সব হারিয়েছি। মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন—সবাইকে ছেড়ে দিয়েছি। এমনকি আমার বাবা-মাও আমাকে ত্যাজ্য করেছে। এই মুহূর্তে তুমি যদি আমাকে ছেড়ে চলে যাও, আমি কোথায় যাব? কার কাছে যাব?

আকাশের চোখ বেয়ে তখন অঝোরে পানি পড়ছে। তার কণ্ঠে ছিল এমন এক অসহায়ত্ব, যা দেখে পাথরের হৃদয়ও হয়তো গলে যেত।

কিন্তু অনন্যার চোখে তার জন্য কোনো মায়া জন্মাল না।
হঠাৎ অনন্যা বাবা প্রচণ্ড রাগে আকাশকে লাথি মেরে সরিয়ে দিল।
আকাশ ভারসাম্য হারিয়ে কয়েক হাত দূরে ছিটকে পড়ল। মেঝেতে পড়ে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল সে।

সেই মুহূর্তে অনন্যার বাবা মাহাবুব সাহেব কঠিন গলায় বলে উঠলেন,
—আমার মেয়ে তোকে একটু আগেই ডিভোর্স দিয়েছে। এখনো কোন অধিকারে তুই আমার মেয়েকে আটকাচ্ছিস?

আকাশ ধীরে ধীরে উঠে বসে চারপাশে তাকাল।
তার চোখ গিয়ে থামল অনন্যার বাবা, মা আর ছোট বোনের মুখে।
কয়েক মুহূর্ত তাদের দিকে নির্বাক তাকিয়ে রইল সে।

মনের ভেতর তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
এই মানুষগুলোর সব দায়িত্ব তো আমি নিয়েছিলাম!

দুই বছর ধরে এই পরিবারটা তার ওপর নির্ভর করে বেঁচেছে। তাদের খাওয়া-পরা থেকে শুরু করে সংসারের প্রয়োজনীয় সবকিছু সে নিজের দায়িত্ব মনে করে পূরণ করেছে। অথচ আজ তাকে বুকের ওপর লাথি মারার আগে একজন মানুষও একবার ভাবল না—এই মানুষটা তাদের জন্য কতটা করেছে!

তবু ভালোবাসা বড় অদ্ভুত জিনিস।
এত অপমানের পরও আকাশের হৃদয় অনন্যার কাছেই ছুটে গেল।

সে আবার উঠে দাঁড়িয়ে অনন্যার কাছে গিয়ে তার পা জড়িয়ে ধরল।

—প্লিজ অনন্যা... আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তোমাকে ভালোবেসেই তো বিয়ে করেছি। আমাদের যে সমস্যা হয়েছে, আমরা চাইলে একটা বাচ্চা দত্তক নিতে পারি। শুধু তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না।

অনন্যার মুখ মুহূর্তেই বিকৃত হয়ে উঠল বিরক্তিতে।
পরের মুহূর্তেই সে প্রচণ্ড জোরে আকাশের বুক বরাবর লাথি মারল।

লাথিটা শুধু আকাশের বুকে লাগেনি—
মনে হলো, সরাসরি তার অন্তরে গিয়ে আঘাত করেছে।

আকাশ স্থির হয়ে গেল।
চোখ বড় বড় করে অনন্যার দিকে তাকিয়ে রইল সে।

নিজের ভালোবাসার মানুষটি সত্যিই তাকে এভাবে লাথি মারতে পারে—এটা যেন কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।

অনন্যা এবার চিৎকার করে বলল,

—আমি কি পাগল যে তোর মতো একটা হিজলার সঙ্গে সারাজীবন সংসার করব? যে আমাকে কখনো সন্তানের সুখ দিতে পারবে না, আমাকে মা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে না,আর আমি কি পাগল হয়েছি যে অন্য সন্তানকে নিজের সন্তানের মত লালন পালন করব।

কথাগুলো আকাশের কানে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে যেন চারপাশের সমস্ত শব্দ থেমে গেল।

তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল।
এতদিন যে মানুষটাকে নিজের পৃথিবী ভেবেছিল, সেই মানুষটির মুখ থেকেই আজ এমন কথা শুনতে হচ্ছে!

আকাশের ঠোঁট কাঁপতে লাগল। চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারল না।
কাঁদতে কাঁদতে সে অনন্যার দিকে তাকিয়ে বলল,

—তোমার পায়ে পড়ি অনন্যা... তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না। তুমি চলে গেলে আমি কোথায় দাঁড়াব, আমি জানি না। তুমি আমার সবকিছু...তুমি চলে গেলে অনন্যা আমি মরে যাবো।

অনন্যার মা এবার তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন,

—তুই থাকলে কি আর না থাকলে, তাতে আমাদের কী? আমার মেয়ের রূপে-গুণে কোনো কমতি নেই। তোর চেয়ে হাজার গুণ ভালো পরিবারের ছেলের সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে দেব। তুই তো...একটা হিজলা।

তিনি থেমে গিয়ে অপমানজনক শব্দটি উচ্চারণ করলেন।
ঘরের এক কোণে অনন্যার ছোট বোন দাঁড়িয়ে ছিল। পুরো ঘটনাটা সে নীরবে মোবাইল ফোনে ভিডিও করছিল। কারও প্রতি তার কোনো মায়া নেই, বরং আকাশের অপমান যেন তার কাছে বিনোদনের বিষয়।

অনন্যা ঠোঁটে বিদ্রূপের হাসি ফুটিয়ে বলল,

—তুমি যদি আমাকে ছাড়া বাঁচতেই না পারো, তাহলে আগে নিজের জীবনটা নিয়ে ভাবো। আমার পেছনে পড়ে থেকে কোনো লাভ নেই। আমি তোমার সঙ্গে আর এক মুহূর্তও থাকতে চাই না,তাছাড়া তোমার মত পুরুষকে কেউ বিয়ে করবে না, তার চেয়ে তুমি মরে যাও এটাই ভালো তোমার জন্য, আরেকটা কথা তোমার অফিসের বস মানে আরিয়ান আহমেদ এর সাথে দুদিন পর আমার বিয়ে।

কথাগুলো বলে সে আবারও আকাশকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
তারপর পেছনে ফিরে তাকাল না।
অনন্যার মা আর বোনও তাকে অনুসরণ করে বেরিয়ে গেল।

দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
আর ঘরের মাঝখানে পড়ে রইল আকাশ,শেষের কথাটা রীতিমতো তির হয়ে গেতে যাই আকাশের বুকে, আকাশ তখন একটা কথাই মনে পড়ে, তার বন্ধু রাসেল বলেছিল আমার অফিসের বস আরিয়ানের সাথে অনন্যার একটা সম্পর্ক চলছে যেটাকে আমরা পরকীয়া বলি।

একটা মানুষ—
যে কয়েক মুহূর্ত আগেও তার ভালোবাসার মানুষটাকে ধরে রাখার জন্য কাকুতিমিনতি করছিল।

এখন সে একা।
ভীষণ একা।
কিছুক্ষণ পর আকাশ ধীরে ধীরে মাথা তুলে বন্ধ দরজার দিকে তাকাল। চোখ থেকে তখনো পানি ঝরছে।

কাঁপা কণ্ঠে নিজেকেই বলল,

—অনন্যা... যেদিন তুমি সত্যিটা জানবে, সেদিন জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা বুঝতে পারবে। আজ তুমি চলে যাচ্ছ... কিন্তু একদিন তুমি আবার ফিরে আসতে চাইবে। একদিন তুমি আমাকে ভালোবেসে পাগল হয়েছিলে। আজ তোমার সেই ভালোবাসা কোথায় হারিয়ে গেল?

সে চোখ বন্ধ করল।
তারপর নিজের মনেই প্রশ্ন করল,

—তুমি কি সত্যিই কোনোদিন আমাকে ভালোবেসেছিলে, অনন্যা?

রাত পেরিয়ে ধীরে ধীরে সকাল হয়ে গেল।
কিন্তু আকাশের জীবনে যেন রাতটাই রয়ে গেল।

সারারাত সে ঘুমাতে পারেনি। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল অনন্যার মুখ। সেই মানুষটার মুখ, যার জন্য সে নিজের পরিবার পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছিল।

দুই বছর ধরে অনন্যার পুরো পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল সে।
তাদের খাবার, পোশাক, সংসারের খরচ—যা কিছু তার সামর্থ্যের মধ্যে ছিল, সবকিছুই পূরণ করার চেষ্টা করেছে। এমনকি অনন্যার বাবা-মাকেও নিজের বাবা-মায়ের মতো সম্মান দিয়েছে।

কিন্তু বিনিময়ে কী পেল?
একটু সম্মানও নয়।
একটু কৃতজ্ঞতাও নয়।

শুধু অপমান।
শুধু অবহেলা।
শুধু ভালোবাসার নামে এক গভীর প্রতারণা।

আকাশের বুকটা ভারী হয়ে উঠল।
ঠিক তখনই তার বাবার পুরোনো কথাগুলো মনে পড়ল।

বাবা কতবার তাকে সতর্ক করেছিলেন—

‘এই মেয়ে আর তার পরিবার ভালো নয়। একদিন তোকে ধোঁকা দেবে। তখন বুঝবি, তুই কী হারিয়েছিস।’

তখন আকাশ বাবার কথা শোনেনি।
ভালোবাসার নেশায় অন্ধ হয়ে ভেবেছিল, পৃথিবীর সবাই ভুল হতে পারে, কিন্তু অনন্যা কখনো তাকে ঠকাতে পারে না।

আজ সেই বিশ্বাসটাই তার সামনে ভেঙে চুরমার হয়ে পড়ে আছে।

আকাশ চোখ মুছে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

তার জীবনে প্রথমবারের মতো মনে হলো—

ভালোবাসার জন্য মানুষ সবকিছু হারাতে পারে, কিন্তু যে মানুষটির জন্য সব হারায়, সেই মানুষটিই যদি একদিন তাকে অস্বীকার করে, তখন হারানোর যন্ত্রণাটা কতটা গভীর হয়—তা শুধু সেই মানুষটিই জানে।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে আকাশ ধীর পায়ে রাস্তায় হাঁটছিল। কোথায় যাবে, কী করবে—কিছুই জানে না সে। শুধু জানে, যে বাড়িটাকে এতদিন নিজের পৃথিবী ভেবেছিল, সেই বাড়িটাই আজ তার কাছে অপরিচিত হয়ে গেছে। অনন্যার মুখ, তার কথাগুলো, বুকের ওপর এসে পড়া সেই লাথি—সবকিছু বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।

এমন সময় হঠাৎ কয়েকজন হিজড়ার দল এসে তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল। তাদের মধ্যে একজন আকাশের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে উঠল,—
আরে! এটাই তো সেই ছেলে, ফেসবুকে যার ভিডিও দেখেছি। আজ থেকে আমাদের নতুন সঙ্গী হতে চলেছে!

কথাগুলো আকাশের মাথার ওপর দিয়ে গেল। সে অবাক হয়ে তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুই বুঝতে পারছিল না—কেন তারা তাকে ঘিরে ধরেছে, কীসের ভিডিও দেখেছে, আর কেনই বা তাকে তাদের নতুন সঙ্গী বলছে। আকাশ তাদের পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলে একজন আবার বলে উঠল,—

আরে, চলে যাচ্ছিস কেন? তোকে তো আবার আমাদের কাছেই ফিরে আসতে হবে। গতকাল তোর বউ তোকে ছেড়ে গেছে না? ফেসবুকে তো এখন পুরো দেশই দেখে ফেলেছে!

কথাটা শুনতেই আকাশের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। মনে হলো, তার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেছে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু সে কোনো উত্তর দিল না। দ্রুত সেখান থেকে সরে গেল।

কিছুদূর যাওয়ার পর আকাশ হঠাৎ আশপাশের মানুষগুলোর দিকে তাকাল। অদ্ভুত ব্যাপার—প্রায় সবাই যেন তাকে দেখছে। কেউ আড়চোখে তাকিয়ে হাসছে, কেউ আবার সরাসরি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে। আকাশের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ে তার বান্ধবীকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,—

এই ছেলেটাই নাকি! দেখ তো, কত হ্যান্ডসাম, দেখতে কত সুন্দর একটা ছেলে! অথচ শুনছি, ও নাকি...হিজলা কথাটা শেষ না করেই মেয়েটা হেসে ফেলল।

আকাশের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। আরও কিছুদূর এগোতেই কয়েকজন ছেলে আর বয়স্ক মানুষ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। আকাশকে দেখেই তাদের একজন বলে উঠল,—
আরে, এই ছেলেটাই তো! দেখতে এত সুন্দর, দেখলে তো বোঝাই যায় না সে হিজলা!

অন্যজনও মুচকি হেসে বলল, —
ফেসবুকে যা দেখেছি, এখন তো সবই জানা।

আকাশ দ্রুত পা বাড়াল। কিন্তু যেদিকেই যাচ্ছে, সেদিকেই মানুষের চোখ যেন তার পিছু নিচ্ছে। কেউ হাসছে, কেউ ফিসফিস করছে, কেউ আবার প্রকাশ্যেই কটাক্ষ করছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার বেঁচে থাকা জীবনটাই যেন মানুষের হাসি-তামাশার বিষয় হয়ে গেছে। যে পৃথিবীতে এতদিন সে মাথা উঁচু করে হেঁটেছে, সেই পৃথিবীটাই আজ তার কাছে এক অসহ্য কারাগারের মতো মনে হচ্ছে।

আকাশ একটা নিরিবিলি জায়গা খুঁজছিল। এমন একটা জায়গা, যেখানে গিয়ে অন্তত কয়েক মুহূর্তের জন্য মানুষের চোখের আড়ালে দাঁড়াতে পারবে, নিজের ভেঙে পড়া মনটাকে সামলাতে পারবে। ঠিক তখনই আঠারো-উনিশ বছরের একটা ছেলে সামনে এসে দাঁড়াল। ছেলেটা কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,—

আচ্ছা ভাইয়া, একটা কথা জিজ্ঞেস করব? আপনি কি সত্যিই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ? জানি না কেন, আপনাকে দেখে তো আমার তেমন মনে হয় না।

আকাশ বিরক্ত হয়ে তাকাল তার দিকে। সারাদিনের অপমান, লজ্জা আর অসহায়তা যেন এবার তার কণ্ঠে জমে উঠল। সে বলল,—

তোমাকে এসব কে বলেছে? সকাল থেকে সবাই এসব কথা কেন বলছে?

ছেলেটা অবাক হয়ে বলল,
—কেন ভাইয়া, আপনি জানেন না? আপনি তো ভাইরাল! এই দেখেন, আপনার বউ গতকাল একটা ভিডিও করে ছেড়ে দিয়েছে ১২ ঘন্টার মধ্যে ৫মিলিয়ন ভিউ। আপনাকে ছেড়ে যাওয়ার সময় কী হয়েছে, সব বলেছে।

ছেলেটা নিজের মোবাইলটা আকাশের হাতে তুলে দিল। আকাশ কাঁপা হাতে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। ভিডিও চালু হতেই তার চোখ স্থির হয়ে গেল। সেখানে দেখা যাচ্ছে—গতকাল রাতে সে অনন্যার পা ধরে কাঁদছে, হাত জোড় করে তাকে চলে যেতে নিষেধ করছে, বারবার নিজের ভালোবাসার কথা বলছে।

আর ভিডিওর শেষে অনন্যা ও তার মা বলছে,
আকাশ হিজলা সেজন্যই আমার মেয়ের সাথে তার ডিভোর্স করি আজকে আমরা চলে যাচ্ছি।

যার মাধ্যমে আকাশের ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়টাকে সবার সামনে এনে তাকে অপমান করা হয়েছে। ভিডিওটা শেষ হওয়ার আগেই আকাশের হাত কাঁপতে শুরু করল। তার মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো। এখন আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না—মানুষ তাকে দেখে কেন হাসছে, কেন রাস্তায় সবাই তাকে চিনে ফেলছে, কেন হিজড়াদের দল তাকে ঘিরে ধরে তাদের সঙ্গে যাওয়ার কথা বলছিল। অনন্যা শুধু তাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যায়নি; নিজের পরিবারের সম্মান বাঁচানোর জন্য তার সম্মানটাকেও পুরো সমাজের সামনে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে।

ঠিক তখনই আকাশের পকেটে থাকা মোবাইলটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে লেখা—বাবা।

আকাশ কয়েক সেকেন্ড ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কাঁপা হাতে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বাবার কঠিন কণ্ঠ ভেসে এল,—
তোকে তো আমরা আগেই ত্যাজ্য করেছি। আল্লাহর দোহাই লাগে, তুই আর আমাদের বাড়ির আশেপাশে আসবি না। কাউকে বলবি না যে তুই আমাদের ছেলে। মানুষ যদি জানতে পারে তুই আমাদের সন্তান, তাহলে আমাদের মান-সম্মান শেষ হয়ে যাবে।

বাবার মুখে এমন কথা শুনে আকাশের পৃথিবীটা যেন মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকার হয়ে গেল। যে বাবা-মায়ের কাছে একদিন ফিরে যাওয়ার আশায় বুক বেঁধেছিল, আজ সেই বাবাই তাকে নিজের সন্তান হিসেবে পরিচয় দিতে নিষেধ করছেন। ফোনটা কানে ধরা অবস্থাতেই আকাশ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল, পুরো পৃথিবীটা যেন তার মাথার ওপর ভেঙে পড়েছে। নিজের মান-সম্মান, ভালোবাসা, পরিবার—সবকিছু একসঙ্গে মাটিতে মিশে গেছে। তখন তার বুঝতে বাকি রইল না, অনন্যা ও তার পরিবার সমাজের সামনে নিজেদের সম্মানটুকু বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে তার সম্মানটাকেই বলি দিয়েছে।

আকাশ ফোনটা নামিয়ে ধীরে ধীরে সামনের দিকে হাঁটতে লাগল। মাথার ভেতর তখন একের পর এক অন্ধকার চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। জীবনের প্রতি সমস্ত আশা যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ঠিক সেই সময় হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল বহু বছর আগের একটা দিন। এমন একটা সময়, যখন তার জীবন এতটা কঠিন ছিল না; যখন ভালোবাসা মানে ছিল একটা ছোট্ট বাটন ফোন, কয়েকটা এসএমএস আর ফোনের ওপাশ থেকে প্রিয় মানুষের কণ্ঠ শোনা। অতীতের সেই স্মৃতি ধীরে ধীরে তার মনকে টেনে নিয়ে গেল অনেক দূরে।

চলুন, অতীত থেকে একটু ঘুরে আসি।

সাল ২০১০। তখনকার ভালোবাসায় আজকের মতো এত আড়ম্বর ছিল না। ভালোবাসা লুকিয়ে থাকত মোবাইলের ছোট্ট ইনবক্সে। একটা ‘হ্যালো’, একটা ‘কেমন আছো?’ কিংবা গভীর রাতে আসা একটা ছোট্ট এসএমএস—এসবের মধ্যেই মানুষ খুঁজে নিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দ। প্রিয় মানুষের কণ্ঠ একবার শুনতে পেলেই মনটা জুড়িয়ে যেত। দিনটা ছিল ২০১০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি—ভালোবাসা দিবস। আকাশের সব বন্ধুরা সেদিন তাদের গার্লফ্রেন্ড নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে বেরিয়েছিল। কেউ রেস্টুরেন্টে, কেউ পার্কে, কেউ আবার শুধু পাশাপাশি হাঁটতেই বেরিয়েছে। কিন্তু আকাশ যেতে পারেনি। কারণ তার কোনো গার্লফ্রেন্ড ছিল না। তাই বাড়িতে বসে সেদিন তার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে ছিল।

ঠিক তখনই হঠাৎ তার ফোনটা বেজে উঠল। অচেনা একটা নম্বর। আকাশ অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফোনটা রিসিভ করল। ওপাশ থেকে ভেসে এল এক মেয়ের সুমধুর কণ্ঠ, —
হ্যালো... ইসরাত? আমি মেঘ বলছি। তুমি কোথায়? আমি তো এখনো দাঁড়িয়ে আছি।

কণ্ঠটা শুনে আকাশ কয়েক মুহূর্ত থমকে গেল। তারপর নিজেকে সামলে বলল,—
সরি, আমি ইসরাত নই। আমার নাম আকাশ। আপনি ভুল নম্বরে ফোন করেছেন।

কথাটা বলেই সে ফোন কেটে দিল। এমনিতেই তার মনটা খারাপ ছিল, তার ওপর আবার রং নম্বরের ফোন—বিষয়টা তার কাছে বিরক্তিকরই লাগল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সেই একই নম্বর থেকে আবার ফোন এল। ওপাশে আবারও সেই মিষ্টি কণ্ঠ। আকাশ আবারও বলল, —আপনি ভুল নম্বরে ফোন করেছেন।

তারপর ফোন কেটে দিল। এভাবে তিন-চারবার ফোন আসার পর আকাশের বিরক্তি বাড়তে লাগল। তার মনে হলো, নিশ্চয়ই তার বন্ধুরা কোনো মেয়েকে দিয়ে তাকে ফোন করিয়ে জ্বালাচ্ছে। তাই ষষ্ঠবার ফোন আসতেই সে রাগের মাথায় মেয়েটাকে যা নয় তা বলে বকাঝকা করে ফেলল, কথাবার্তার মাঝেও খারাপ ব্যবহার করল।

বিকেলের দিকে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে আকাশ রাসেল, কাদের আর মুন্নাকে জিজ্ঞেস করল—
তোরা কি কোনো মেয়েকে দিয়ে আমাকে ফোন করাচ্ছিস?

রাসেল অবাক হয়ে বলল,—
আরে না দোস্ত! এমনিতেই আমরা জানি তোর কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই। তাই বলে অন্য মেয়েকে দিয়ে ফোন করিয়ে তোকে জ্বালাব নাকি?

কাদের আর মুন্নাও একই কথা বলল। আকাশ চুপ হয়ে গেল। তার বুকের ভেতর হঠাৎ অপরাধবোধ জেগে উঠল। মেয়েটাকে সে অযথাই গালিগালাজ করেছে, খারাপ ব্যবহার করেছে। কিছুক্ষণ পর আর নিজেকে সামলাতে না পেরে সেই নম্বরে আকাশ নিজেই ফোন করল। ফোন রিসিভ হতেই সে বলল,—

আসলে আমি ভেবেছিলাম আমার বন্ধুরা আমার সঙ্গে কোনো মেয়েকে দিয়ে ফাজলামি করছে। তাই আপনার সঙ্গে এমন খারাপ ব্যবহার করেছি।

মেয়েটা শান্ত কণ্ঠে বলল,—
সরি বলার দরকার নেই। আমি কিছু মনে করিনি। আসলে আমি আজ ঢাকায় এসেছি। আমার এক বান্ধবীর নম্বরে ফোন করতে গিয়ে বারবার ভুল করে আপনার নম্বরে ফোন চলে যাচ্ছে। আমি এখনো ঢাকা রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি।

আকাশ অবাক হয়ে বলল,—
এখন তো রাত দশটা বাজে! আপনি এখনো সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন? যাবেন কোথায়?

মেয়েটা একটু ভয় মেশানো কণ্ঠে বলল —
আসলে আমি একা গাড়িতে উঠতে ভয় পাচ্ছি। আমার বান্ধবী আসবে বলেছিল। শুনেছি তারা ধানমন্ডি দশে থাকে, ৬ নম্বর রোড, ১৭ নম্বর বাসা।

আকাশ কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে বলল,—
আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি একটা সিএনজি নিন। ড্রাইভারকে আমার সঙ্গে কথা বলতে দিন।

মেয়েটা একজন সিএনজি ড্রাইভারের হাতে ফোনটা দিলে আকাশ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,—
আমি ধানমন্ডি থানার পক্ষ থেকে বলছি। এটা আমার বাসার মেহমান। উনাকে সুন্দর করে ধানমন্ডি ১০ নম্বর, ৬ নম্বর রোড, ১৭ নম্বর বাসায় পৌঁছে দেবেন। কোনো এদিক-ওদিক যেন না হয়।

আকাশের কথাগুলো শুনে সিএনজি ড্রাইভারের মুখের রং পাল্টে গেল। তার চোখেমুখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল। সে দ্রুত ফোনটা মেয়েটার হাতে দিয়ে বলল, —আপা, উনি পুলিশ বলেছে। আপনি ঠিকানা বলেন, আমি আপনাকে ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিচ্ছি।

সেদিন সেই সিএনজি চালক মেয়েটাকে ঠিকমতো তার গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছিল। আর সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল ছোট্ট একটা বাটন ফোনের মাধ্যমে আকাশের জীবনের নতুন এক সম্পর্ক। কখনো এসএমএস, কখনো ফোনে কথা—ধীরে ধীরে অচেনা দুটো মানুষ একে অপরের খুব কাছের হয়ে উঠতে লাগল। আর সেই মেয়েটির নাম ছিল—সায়রা তাবাসসুম মেঘ

কথা বলতে বলতে একদিন আকাশ হঠাৎ মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করল,—
আচ্ছা, এতদিন ধরে তোমার সঙ্গে কথা বলছি, অথচ তোমার নামটাই তো জানা হলো না! আমার নাম কিন্তু আকাশ।

ওপাশ থেকে মেয়েটা মুচকি হেসে বলল,—
আমার নাম মেঘ।

সেই একটি নাম যেন আকাশের জীবনে আলাদা এক অর্থ নিয়ে এলো। সেদিন থেকেই শুরু হলো দুজনের সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়। মুখে কেউ ভালোবাসার কথা বলেনি, কেউ কাউকে ‘ভালোবাসি’ বলেনি, অথচ অদৃশ্য এক টানে দুজনেই ধীরে ধীরে একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে পড়ল, যেন একজনকে ছাড়া অন্যজনের দিনটাই অসম্পূর্ণ।

আকাশ যদি কোনোদিন মেঘের সঙ্গে কথা বলতে না পারত, অদ্ভুত এক অস্থিরতা তাকে ঘিরে ধরত। বারবার ফোনের দিকে তাকাত, মেঘ কেন ফোন করছে না সেই চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠত।

আর মেঘের অবস্থাও ছিল আরও করুণ। আকাশের সঙ্গে কথা না হলে সে ভার্সিটিতে যেত না, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করত না। কখনো চুপচাপ বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে কাঁদত। নিজের অজান্তেই মেঘ বুঝতে শুরু করেছিল—সে আকাশকে ভালোবেসে ফেলেছে। শুধু ভালোবাসা নয়, মানুষটা যেন তার রক্তের সঙ্গে, নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশে গেছে। আকাশকে ছাড়া একটা দিন কাটানোর চিন্তাই তার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল।

বিষয়টা বেশিদিন মেঘের হোস্টেলের ভেতর গোপন থাকল না। কান থেকে কানে ছড়িয়ে পড়ল অদ্ভুত সেই প্রেমের গল্প—

মেঘ নাকি এমন একজন ছেলেকে ভালোবেসে ফেলেছে, যাকে সে জীবনে একবারও চোখে দেখেনি। আর ছেলেটাও নাকি তাকে না দেখে ভালোবেসে ফেলেছে।

ধীরে ধীরে ব্যাপারটা হোস্টেলের সবার কাছে এক ধরনের কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠল। মেঘ তখন ১১২ নম্বর রুমে থাকত, আর একই হোস্টেলের ২১৪ নম্বর রুমে থাকত অনন্যা।

মেঘ আর অনন্যা একে অপরকে চিনত না, কিন্তু মেঘের সেই অদেখা ভালোবাসার গল্প অনন্যার কানেও পৌঁছে গেল। এমন অদ্ভুত সম্পর্কের কথা শুনে অনন্যার মনে কৌতূহল জন্ম নিল। মেঘের ভালোবাসা এত গভীর, অথচ সে ছেলেটাকে কোনোদিন চোখেই দেখেনি—কেমন সেই ছেলে? এমন একজন মানুষকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে অনন্যার মনেও জেগে উঠল।

অন্যদিকে আকাশ প্রায়ই মেঘকে বলত,—
চলো না মেঘ, আমরা একদিন দেখা করি। সামনাসামনি বসে একটু কফি খাব। তোমার হাতটা ধরে তোমার সঙ্গে কথা বলব।

কথাগুলো শুনলেই মেঘের বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন যেন ছুটতে শুরু করত। ফোনে আকাশের কণ্ঠ শুনেই যেখানে তার হার্টবিট এত দ্রুত বেড়ে যায়, সেখানে মানুষটার সামনে বসলে কী হবে—ভাবতেই তার শরীর কেঁপে উঠত।

মেঘ মনে মনে সে ভাবত,
‘ফোনে কথা বললেই যদি বুকের ভেতর এমন ঝড় ওঠে, সামনে বসলে তো হয়তো হার্ট অ্যাটাকই হয়ে যাবে!’

তাই প্রতিবার আকাশ দেখা করার কথা বললে মেঘ লাজুক কণ্ঠে শুধু বলত, —
এখন না... সময় হোক, তখন দেখা করব।

কিন্তু মেঘ জানত না, তার এই অপেক্ষার আড়ালেই কেউ একজন নিঃশব্দে তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতার দরজা খুলে ফেলেছে।

একদিন মেঘ তার বাটন মোবাইলটা চার্জে লাগিয়ে হোস্টেলের রুমের বাইরে একটু হাঁটতে বেরিয়েছিল। সেই সুযোগটাকেই কাজে লাগাল অনন্যা। কৌশলে মেঘের মোবাইলটা চুরি করে নিল সে। মেঘ কিছুই বুঝতে পারল না। আর আকাশও জানল না যে ওপাশে যার সঙ্গে সে কথা বলছে, সে আর মেঘ রইলো না, অন্য আরেকজন অনণ্যা।

সেদিন থেকে আকাশ কথা বলতে শুরু করল অনন্যার সঙ্গে—মেঘ ভেবে।
প্রথমদিকে সবকিছু স্বাভাবিকই মনে হচ্ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে আকাশের মনে সন্দেহ জন্মাতে লাগল। মেঘের কথা বলার ধরন, কিছু কিছু উত্তর—কোথাও যেন একটা অদৃশ্য অমিল।

একদিন আকাশ সরাসরি বিষয়টা তুলতেই অনন্যা খুব কৌশলে কথাটা ঘুরিয়ে দিল। তখন বলল,
গলায় সমস্যা হয়েছে,
কখনো বলল অপারেশন হয়েছে, তাই কণ্ঠস্বর কিছুটা বদলে গেছে। ভালোবাসায় অন্ধ আকাশও শেষ পর্যন্ত সেই কথাগুলো বিশ্বাস করে নিল।

অন্যদিকে সত্যিকারের মেঘ তখন মোবাইল হারিয়ে সম্পূর্ণ অসহায়। আকাশের সঙ্গে হঠাৎ সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সে যেন ভেতর থেকে ভেঙে পড়ল। তারপর দিন কেটে গেল, সপ্তাহ কেটে গেল—কিন্তু আকাশের কোন প্রকার যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বা আকাশ হত তার ঠিকানা চিনে না। প্রতিদিন অপেক্ষা করতে করতে একসময় মেঘের মনটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সে পড়াশোনা বন্ধ করে দিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। তার বাবা-মা অবশেষে তাকে বাড়িতে নিয়ে এলেন।

মেঘের সৎ মা ছিল। নিজের সন্তান না থাকায় বাইরে থেকে মেঘকে নিজের সন্তানের মতোই দেখানোর চেষ্টা করলেও তার মনের গভীরে মেঘের প্রতি এক ধরনের হিংসা লুকিয়ে ছিল।

মেয়েটার ভেঙে পড়া অবস্থাটাকেও তিনি মমতা দিয়ে নয়, বিরক্তি আর অবহেলার চোখে দেখতেন। মেঘ তখন প্রায় নিজের মধ্যেই হারিয়ে গিয়েছিল। তাকে একটা ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হতো। কেউ খাবার দিলে খেত, না দিলে চুপচাপ বসে থাকত। জানালার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তার কাছে দিন-রাতের কোনো পার্থক্য ছিল না। শুধু একটা প্রশ্ন বারবার তার বুকের মধ্যে কাঁটার মতো বিঁধে থাকত—আকাশ কোথায়?

অথচ সেই সময় আকাশ প্রতিদিন যার সঙ্গে কথা বলছে, যার কণ্ঠ শুনে নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে অনুভব করছে, সে আসলে মেঘ নয়—অনন্যা।

এভাবেই সময় এগিয়ে যেতে লাগল।

একদিন মেঘের মোবাইল থেকে মেঘ সেজে আকাশের সঙ্গে কথা বলছিল অনন্যা। কথার একপর্যায়ে হঠাৎ অনন্যার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল সেই কথাটা, যেটা আকাশ এতদিন ধরে মেঘের মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিল—

—আকাশ, চলো না... আমরা দেখা করি। সামনাসামনি বসে কথা বলব, কফি খাব।

কথাটা শুনে আকাশ যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিঃশ্বাস নিতেই ভুলে গেল। এতদিন যে মেয়েটা প্রতিবার দেখা করার কথা উঠলেই বলত,

‘এখন না, সময় হোক’, সেই মেঘ আজ নিজে থেকেই দেখা করতে চাইছে!

আকাশের চোখে মুহূর্তেই আনন্দের ঝিলিক ফুটে উঠল। বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘ অপেক্ষা যেন এক মুহূর্তে রঙিন হয়ে উঠল। সে আর দেরি না করে উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল,

—সত্যি? তুমি দেখা করবে? বলো, কখন দেখা করবে? কোথায় দেখা করবে?

আকাশ তখনও জানত না—যে সাক্ষাতের জন্য সে এতদিন ধরে অপেক্ষা করেছে, সেই সাক্ষাতের ডাক এসেছে তার সত্যিকারের ভালোবাসার কাছ থেকে নয়, বরং তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতারণার দরজা খুলে দেওয়া একজন মানুষের কাছ থেকে।

গল্পটা কেমন হয়েছে তা সুন্দর করে কমেন্ট করে জানাবেন,, আপনাদের চাওয়া ও আপনাদের চাহিদার উপর নির্ভর করে পরবর্তী পর্ব লিখব।
পরবর্তী পর্বের জন্য এই পেজটি ফলো করে রাখুন।
>>>>>>>>> গল্পের শহরে তুমি আমি >>>>>>>>

চলবে.......

গল্প> #জোর_করে_বিয়ে >সকল পর্ব একসাথে দেওয়া হল.. লিখক> Md Najmul Huda Sharif প্রেজেন্ট > গল্পের শহরে তুমি আমি 🚫এই গল্পট...
10/08/2026

গল্প> #জোর_করে_বিয়ে >সকল পর্ব একসাথে দেওয়া হল..
লিখক> Md Najmul Huda Sharif
প্রেজেন্ট > গল্পের শহরে তুমি আমি

🚫এই গল্পটি Raihan dairy ইউটিউব চ্যানেলকে ভয়েজ আকারে আপলোড করার কপিরাইট দেওয়া হলো অন্য কোন ইউটিউবার কপি করা হতো বিরত থাকবেন 🚫

১

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122190784490894169/?app=fbl

২

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122190883124894169/?app=fbl

৩

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122190928424894169/?app=fbl

৪

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122191006502894169/?app=fbl

৫

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122191048406894169/?app=fbl

৬

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122191117628894169/?app=fbl

৭

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122191171466894169/?app=fbl

৮

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122191245254894169/?app=fbl

৯

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122191295768894169/?app=fbl

১০

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122191368218894169/?app=fbl

১১

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122191436084894169/?app=fbl

১২

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122191538594894169/?app=fbl

শেষ পর্ব

https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122191571912894169/?app=fbl

নতুন গল্প > ার্লফ্রেন্ডের_মিথ্যা_অপবাদ।
প্রথম পর্ব দেয়া হলো দ্বিতীয় পর্ব রাতে আসবে...
এমন আরো গল্প পেতে গল্পের শহরে তুমি আমি পেজটি ফলেরা করে রাখবেন।

গল্প> #জোর_করে_বিয়ে (১ম পর্ব)
লিখক> Md Najmul Huda Sharif

🚫এই গল্পটি রায়হান ডায়েরি ইউটিউব চ্যানেলকে ভয়েস আকারে আপলোড করার কপিরাইট দেওয়া হলো অন্য কোন ইউটিউবার কপি করা হতে বিরত থাকবেন🚫

হাজার হাজার মানুষের কোলাহলে মুখরিত বিশাল রাজকীয় বিয়ের আসর।
ঝাড়বাতির ঝলমলে আলোয় আলোকিত পুরো প্রাসাদ। দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, আমলা, বিদেশি অতিথি—সবার উপস্থিতিতে যেন এক রাজকীয় উৎসবের আয়োজন।

আর সেই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে একটাই নাম—
আদ্রিয়ান মির্জা।

বাংলাদেশের ব্যবসায়িক জগতের এমন এক কিংবদন্তি, যার নাম শুনলেই বড় বড় শিল্পপতিরা হিসাব করে কথা বলে। ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদরাও তাকে অবহেলা করার সাহস পায় না।

সে শুধু একজন মানুষ নয়—
সে একটি ব্র্যান্ড।

অদ্ভুত বিষয় হলো, তার ছবি কখনও সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় বা টেলিভিশনের পর্দায় খুব একটা দেখা যায়নি। তবু তার নামটাই যথেষ্ট ছিল মানুষের মনে ভয়ের ঝড় তোলার জন্য।

তবে তার পরিচয়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অংশ ছিল তার রাগ।
ব্যবসায়িক মহলে একটি কথা প্রায় কিংবদন্তির মতো প্রচলিত—
"পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিসের তালিকা যদি কখনও তৈরি হয়, তাহলে আদ্রিয়ান মির্জার রাগ থাকবে প্রথম সারিতে।"

কারণ, সেই রাগের সামনে দাঁড়ানোর সাহস খুব কম মানুষেরই ছিল।
আজ সেই মানুষটার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন।

আজ তার বিয়ে।
যে মেয়েটিকে সে বছরের পর বছর ভালোবেসেছে, আজ সেই রাহি তার স্ত্রী হয়ে নতুন জীবনে পা রাখবে।

সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল...
কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য এক নিষ্ঠুর নাটকের চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল।

হঠাৎ করেই বিয়ের আসরে ছড়িয়ে পড়ল একটি খবর।
প্রথমে ফিসফাস...

তারপর গুঞ্জন...
আর মুহূর্তের মধ্যেই সেই গুঞ্জন দাবানলের মতো পুরো অনুষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ল।

"কনে নেই!"
"রাহি পালিয়ে গেছে!"
একটি মাত্র বাক্য যেন মুহূর্তের মধ্যে আদ্রিয়ান মির্জার সমস্ত সম্মান মাটিতে মিশিয়ে দিল।

বিশাল হলরুমে উপস্থিত হাজারো মানুষ বিস্ময়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর...
কেউ মুখ চেপে হাসল।
কেউ চোখাচোখি করে বিদ্রূপ করল।

আবার কেউ নিচু স্বরে কটাক্ষ ছুড়ে দিল।
সেই হাসির শব্দগুলো যেন ধারালো ছুরির মতো বারবার আঘাত করতে লাগল আদ্রিয়ানের আত্মসম্মানে।

ঠিক তখনই দৌড়ে এলো তার ছোট বোন মাহি।
তার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে।

কাঁপা কণ্ঠে সে বলল,
— "ভাইয়া... এই চিঠিটা... আর একটা পেনড্রাইভ পাওয়া গেছে।"

আদ্রিয়ান কোনো কথা বলল না।
শুধু ধীরে ধীরে চিঠিটা হাতে তুলে নিল।

তার আঙুলগুলো এতটাই শক্ত হয়ে ছিল যে কাগজটা প্রায় ভাঁজ হয়ে যাচ্ছিল।

চিঠিটা খুলতেই ভেসে উঠল রাহির কন্ঠে কয়েকটি লাইন—
«"মিস্টার আদ্রিয়ান মির্জা,

তোমাকে চিঠি লেখার কোনো ইচ্ছেই ছিল না। কিন্তু কেন আমি পালিয়ে গেলাম, সেটা শুধু তুমি নয়—আজ বিয়ের আসরে উপস্থিত সবাই জানুক।
তুমি তো নিজেকে খুব সাহসী ভাবো। তাহলে এই পেনড্রাইভটা বিয়ের হলের বড় স্ক্রিনে চালিয়ে দেখো।
সব উত্তর পেয়ে যাবে।"»

চারপাশ নিস্তব্ধ।
একটা নিঃশ্বাস পড়ার শব্দও যেন শোনা যাচ্ছে।
আদ্রিয়ান ধীরে ধীরে পেনড্রাইভটা স্ক্রিনে লাগানোর নির্দেশ দিল।

মুহূর্তের মধ্যেই বিশাল এলইডি স্ক্রিনে ভেসে উঠল রাহির মুখ।

তার ঠোঁটে বিদ্রূপের হাসি।
চোখে অবজ্ঞা।

তারপর সে হেসে উঠল।
— "মিস্টার আদ্রিয়ান মির্জা... এতক্ষণে নিশ্চয়ই রাগে ফেটে পড়ছো? আমাকে সামনে পেলে হয়তো মেরেই ফেলতে। তাই না?"

স্ক্রিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আদ্রিয়ানের দু'মুঠো শক্ত হয়ে গেল।
হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে।
চোয়াল শক্ত।
রাগে তার পুরো শরীর কাঁপছে।

রাহি আবার বলল,
— "ভাবছো, এত বছরের ভালোবাসা হঠাৎ কেন শেষ হয়ে গেল?"

সে এক মুহূর্ত থেমে তাচ্ছিল্যের হাসি দিল।
— "তোমার মতো বদরাগী মানুষের সঙ্গে প্রেম করা যায়... কিন্তু সংসার করা যায় না। প্রতিদিন আতঙ্কে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু অনেক ভালো।"

তারপর আরও নির্মম কণ্ঠে বলল,
— "আমি আমার সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষ আহানের হাত ধরে লন্ডনে চলে যাচ্ছি। এই ভিডিও যখন দেখবে, তখন আমি অনেক দূরে। আমাকে খুঁজে কোনো লাভ হবে না।"

শেষে ঠোঁটে বিজয়ীর হাসি ফুটিয়ে বলল,
— "গুডবাই... মিস্টার আদ্রিয়ান মির্জা।"

ভিডিওটা শেষ হয়ে গেল।
স্ক্রিন অন্ধকার হয়ে গেল।
কিন্তু আদ্রিয়ানের পৃথিবী যেন তারও আগে অন্ধকারে ডুবে গেছে।

চারপাশে আবার শুরু হলো ফিসফাস...

— "দেখেছো? শুধু টাকা থাকলেই হয় না, মানুষের মন জিততে হয়।"
— "এমন রাগী মানুষকে কে বিয়ে করবে?"
— "ও মানুষ না... একটা চলন্ত আগ্নেয়গিরি!"
— "মেয়েটা ঠিক কাজই করেছে।"

প্রতিটি বাক্য যেন আগুন হয়ে ঝরে পড়ছিল আদ্রিয়ানের বুকের ভেতর।

সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার চোখ দুটো তখন রক্তের মতো লাল।

চোখে আর কোনো কষ্ট নেই...
কোনো কান্না নেই...
শুধু এক অদ্ভুত, ভয়ংকর নীরবতা।

সেই নীরবতাই জানিয়ে দিচ্ছিল—
আজ শুধু একটি বিয়ে ভাঙেনি...
আজ জন্ম নিয়েছে এমন এক ঝড়, যার তাণ্ডবে অনেক মানুষের জীবন চিরতরে বদলে যাবে...

আদ্রিয়ানের কানে একের পর এক বিদ্রূপের তীর এসে বিঁধছিল।

একজন মধ্যবয়স্ক লোক ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— "মেয়েটা একদম ঠিকই করেছে। প্রতিদিন এমন আতঙ্কের মধ্যে বেঁচে থাকার চেয়ে মরেও শান্তি আছে। আদ্রিয়ান মির্জার রাগ তো ক্ষুধার্ত বাঘের চেয়েও ভয়ংকর!"

সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন ভদ্রমহিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— "বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী হলেই কী হয়? একটা মেয়ের মনই তো জয় করতে পারল না। হয়তো মেয়েটা তার রাগের কাছে হার মেনে পালিয়ে গেছে।"

আরেকজন নিচু স্বরে হেসে উঠল,
— "টাকা দিয়ে সাম্রাজ্য কেনা যায়, কিন্তু একটা মানুষের ভালোবাসা কেনা যায় না।"

কথাগুলো বাতাসে ভেসে আসছিল।
প্রতিটি শব্দ যেন উত্তপ্ত সীসার মতো গলে গলে ঢুকে যাচ্ছিল আদ্রিয়ান মির্জার বুকে।

যে মানুষটার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় দেশের নামকরা ব্যবসায়ীদেরও কণ্ঠ শুকিয়ে যেত...
যার দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পর্যন্ত অনেকের ছিল না...

আজ সেই মানুষটার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে সবাই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে।
বিদ্রূপ করছে।
কটাক্ষ করছে।

তার জীবনের সবচেয়ে বড় অপমানের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে হাজার হাজার মানুষ।

হঠাৎ...
"চুপ!"
এক বিকট গর্জনে কেঁপে উঠল পুরো বিয়ের আসর।

সেটা কোনো মানুষের চিৎকার ছিল না...
মনে হচ্ছিল বহুদিনের ক্ষুধার্ত কোনো রয়েল বেঙ্গল টাইগার তার শিকার হারিয়ে হিংস্র গর্জন ছেড়ে দিয়েছে।

ঝাড়বাতিগুলো পর্যন্ত কেঁপে উঠল।
অনেক অতিথির হাত থেকে পানির গ্লাস পড়ে ভেঙে গেল।
কারও মুখ শুকিয়ে কাঠ।
কারও বুক কেঁপে উঠল আতঙ্কে।
অনেকেই অজান্তেই দু-তিন কদম পিছিয়ে গেল।

সবার মনে একই প্রশ্ন—
"আজ কি আদ্রিয়ান মির্জা রক্ত ঝরাবে?"

কিন্তু আদ্রিয়ানের মাথায় তখন আর কোনো চিন্তা কাজ করছিল না।

রাহি...
যে মেয়েটা একসময় তাকে একনজর দেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করত...
যে মেয়েটা তার অসংখ্য রাগ, অপমান, এমনকি চড়-থাপ্পড়ও মুখ বুজে সহ্য করেছে...

যে কখনও তার হাত ছেড়ে যায়নি...
সেই রাহিই আজ সবার সামনে তাকে এভাবে অপমান করল!

কেন?
এটাই কি তার প্রতিশোধ?
নাকি এতদিন ধরে জমে থাকা সমস্ত অভিমানের বিস্ফোরণ?

হঠাৎ আদ্রিয়ান রক্তলাল চোখে চারদিকে তাকিয়ে বজ্রকণ্ঠে বলে উঠল,
— "এই বিয়ে হবে... আজই হবে... এই মুহূর্তেই হবে!"

তার কথায় চারপাশ আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
এবার সামনে এগিয়ে এলেন তার বাবা—

আজান মির্জা।
চোখেমুখে রাগ, অপমান আর অসহায়তার ছাপ।

তিনি ছেলের সামনে দাঁড়িয়ে ভারী কণ্ঠে বললেন,

— "তোর মাথা ঠিক আছে, আদ্রিয়ান? এমনিতেই মেয়েটা আমাদের সম্মান মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। তুই কেমন মেয়েকে ভালোবেসেছিলি? যেসব মানুষ এতদিন তোর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস পেত না, আজ তারাই তোর সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে। এর চেয়ে বড় অপমান আর কী হতে পারে?"

আদ্রিয়ান কোনো জবাব দিল না।
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে বলল,

— "বাবা... চাচার মেয়ে অথৈ আমাকে ভালোবাসে। কয়েকবার নিজের মুখে বলেছে,অথৈ আমাকে কয়েকবার প্রপোজ করেছে। যদি রাহি আমাকে ছেড়ে যেতে পারে, তাহলে আজ আমি অথৈকেই বিয়ে করব। এই বিয়ে ভাঙবে না।"

কথাটা শুনে আজান মির্জা বিস্ময়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন নিজের ছোট ভাই রায়হান মির্জার মেয়ে—

অথৈর দিকে।

পরিবারের সম্মান রক্ষার শেষ আশাটুকু নিয়ে তিনি ভাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।

ভারী গলায় বললেন,
— "রায়হান... আদ্রিয়ান যা বলছে, সেটা কি সত্যি? তোর মেয়ে যদি রাজি থাকে... তাহলে আজই ওদের বিয়ে দিয়ে দিই। অন্তত পরিবারের সম্মানটা বাঁচুক।"

কিন্তু কথাটা শেষ হওয়ার আগেই বজ্রপাতের মতো চিৎকার করে উঠল অথৈ।

— "না!"

তার কণ্ঠে এমন দৃঢ়তা ছিল যে পুরো হলরুম আবার স্তব্ধ হয়ে গেল।
অথৈ সোজা আজান মির্জার দিকে তাকিয়ে বলল,

— "বড় বাবা, আপনি যদি বলেন, আমি এই মুহূর্তে একজন সাধারণ চাকরিজীবীকে বিয়ে করব, অথবা এই বাড়ির দারোয়ান কে বিয়ে করবো। কিন্তু আপনার ছেলেকে বিয়ে করার কথা বললে... আমি তার আগেই নিজের জীবন শেষ করে দেব!"

মুহূর্তের মধ্যে যেন সময় থেমে গেল।
আজান মির্জার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

মনে হচ্ছিল কেউ সবার সামনে তাকে চড় মেরে বসেছে।
আদ্রিয়ান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার বুকের ভেতরটা যেন কেউ ছিঁড়ে ফেলছে।
চারপাশে উপস্থিত অতিথিদের চোখ বিস্ফোরিত।

এক সেকেন্ড...
দুই সেকেন্ড...
তারপরই—
পুরো হলরুমে ছড়িয়ে পড়ল চাপা হাসি।

সেই হাসি ধীরে ধীরে অট্টহাসিতে রূপ নিল।
কেউ মুখ চেপে হাসছে।
কেউ মোবাইল বের করে ভিডিও করতে চাইছে।

কেউ আবার বন্ধুদের কানে কানে বলছে,
— "একজন তো পালিয়েছে, এবার নিজের চাচাতো বোনও না করে দিল!"

— "এত বড় ব্যবসায়ী! অথচ একটা মেয়েও বিয়ে করতে রাজি না!"

— "টাকার পাহাড় বানিয়েছে, কিন্তু একটা হৃদয় জয় করতে পারেনি!"

অথৈ এবার আরেক ধাপ এগিয়ে এল।
তার চোখে কোনো ভয় নেই।
সে স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,

— "বড় বাবা, আপনার ছেলে স্বাভাবিক মানুষ নয়। সে একজন সাইকোর মতো। তার সঙ্গে প্রেম করে মানুষকে দেখানো যায়, কারণ সব মেয়েই চায় তার প্রেমিক সুদর্শন হোক, প্রতিষ্ঠিত হোক। কিন্তু স্বামী হিসেবে? কোনো মেয়ে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করতে চাইবে না।"

প্রতিটি শব্দ যেন ধারালো ছুরির ফলার মতো আদ্রিয়ানের আত্মসম্মানকে কেটে কেটে রক্তাক্ত করে দিচ্ছিল।
মনে হচ্ছিল কেউ তার বুক চিরে কলিজার ভেতর বিষমাখা ছুরি ঢুকিয়ে দিয়েছে।

এত বড় অপমান...
এত বড় লাঞ্ছনা...
তার জীবনে কখনও আসেনি।

অন্যদিকে আজান মির্জা লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

দেশের প্রভাবশালী মন্ত্রী...
বিখ্যাত শিল্পপতি...
বিদেশি অতিথি...
আত্মীয়-স্বজন...
সবাইয়ের সামনে মির্জা পরিবারের সম্মান মুহূর্তের মধ্যে ধুলোয় মিশে গেছে।

মাথা তুলে কারও চোখের দিকে তাকানোর শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছেন তিনি।

এদিকে একে একে অতিথিরা হল ছেড়ে বেরিয়ে যেতে লাগল।
কিন্তু যাওয়ার সময়ও বিদ্রূপ থামল না।

একজন নামকরা ব্যবসায়ী হাসতে হাসতে বলল,

— "ব্যবসায় বড় হওয়াই সবকিছু নয়, মির্জা সাহেব। মানুষের মন জয় করাটাই আসল সফলতা।"

আরেকজন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
— "সব মেয়ে টাকার জন্য প্রেম করে—এই ধারণা ভুল। টাকা দেখে কাছে আসে অনেকেই, কিন্তু সম্মান না থাকলে কেউ সারাজীবন পাশে থাকে না।"

একজন মন্ত্রী গাড়িতে উঠতে উঠতে ব্যঙ্গের হাসি দিয়ে বললেন,
— "যে নিজের রাগকে জয় করতে পারে না, সে পৃথিবীর সব ব্যবসা জিতলেও জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কটা হারিয়েই ফেলে।"

আরেকজন শিল্পপতি হেসে বলল,
— "হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েও আজ একজন সাধারণ মানুষের চেয়েও বেশি অসহায় দেখাচ্ছে আদ্রিয়ান মির্জাকে।"

এক আত্মীয় তো বলেই ফেলে।
কি অবস্থা দেখো আদ্রিয়ান মির্জার মূল্য একটা দারোয়ানের সাথে, তার চাচাতো বোন দারোয়ানকে বিয়ে করবে কিন্তু আদ্রিয়ান মীরজা কে বিয়ে করবে না।

চারদিকে শুধু হাসি...
বিদ্রূপ...
কটাক্ষ...
আর সেই হাজারো কণ্ঠের মাঝখানে আদ্রিয়ান মির্জা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল।

তার দু'চোখ রক্তবর্ণ।
মুষ্টিবদ্ধ হাত থেকে টপটপ করে রক্ত ঝরছে।
কারণ নিজের নখের আঘাতে কখন যে হাতের তালু ছিঁড়ে ফেলেছে, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।

শুধু তার বুকের ভেতর একটাই আগুন জ্বলছিল—
এই অপমানের হিসাব... সে একদিন অবশ্যই নেবে।

বিয়ের আসর তখন প্রায় ফাঁকা।
হাজার হাজার মানুষের ভিড়ের জায়গায় এখন হাতে গোনা কয়েকজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন দাঁড়িয়ে আছে।

কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেও অপমানের আগুন যেন আরও তীব্র হয়ে উঠছিল।
ঠিক তখনই অথৈ আবারও বিকট চিৎকারে নীরবতা ভেঙে দিল।
তার চোখে ঘৃণা, ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি।

সে আঙুল তুলে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,

— "আদ্রিয়ান ভাইয়া, সত্যিটা আজ সবাই জেনে যাক। আমি আমার বান্ধবীদের সঙ্গে বাজি ধরে তোমার সঙ্গে প্রেম করার অভিনয় করেছিলাম। কিন্তু মরে গেলেও তোমাকে বিয়ে করব না!"

কথাটা শুনে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।

অথৈ থামল না।
সে আরও কঠিন কণ্ঠে বলল,

— "তুমি যদি মির্জা পরিবারের ছেলে না হতে, যদি তোমার বাবার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা না থাকত, যদি দামি গাড়ি আর ক্ষমতা না থাকত—তাহলে কোনো মেয়েই তোমার দিকে ফিরে তাকাত না। সবাই তোমার টাকা আর পরিচয়ের জন্য তোমার পাশে ছিল। কিন্তু স্বামী হিসেবে? তোমাকে কেউ কোনোদিন মেনে নেবে না!"

প্রতিটি শব্দ যেন আদ্রিয়ানের আত্মসম্মানের ওপর নির্মম হাতুড়ির আঘাত হয়ে পড়ছিল।

হঠাৎ সে বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠল,
— "চুপ! একদম চুপ! আর একটা কথাও বলবি না। নয়তো..."

তার চোখে তখন রক্তিম আগুন।
— "আমি তোর জিভ ছিঁড়ে ফেলব!"

কিন্তু অথৈ ভয় পেল না।
বরং এক পা সামনে এগিয়ে এসে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

— "তুমি চাইলে আমাকে মারতে পারো। রক্তাক্তও করতে পারো। মানুষকে মারধর করা তো তোমার প্রতিদিনের অভ্যাস। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—তোমাকে কোনো মেয়ে বিয়ে করবে না। তুমি সারাজীবন একাই থাকবে।"

আর সহ্য করতে পারল না আদ্রিয়ান।
তার ভেতরে জমে থাকা রাগ মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হলো।
সে নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল।

মুহূর্তের মধ্যে এগিয়ে গিয়ে সজোরে একটি চড় বসিয়ে দিল অথৈর গালে।

তারপর আরেকটি।
প্রচণ্ড আঘাতে অথৈ কয়েক হাত দূরে ছিটকে পড়ে গেল।

মেঝেতে পড়তেই তার ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরিয়ে এল।
চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।

"অথৈ!"

চিৎকার করে দৌড়ে গেল তার মা।
রায়হান মির্জাও ছুটে এলেন মেয়ের দিকে।

অন্যদিকে...

এই দৃশ্য দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না আজান মির্জা।
তিনি ঝড়ের বেগে ছেলের সামনে এসে—
ঠাস!
ঠাস!
পরপর দুটি চড় বসিয়ে দিলেন আদ্রিয়ানের গালে।

সেই শব্দে যেন পুরো হলরুম আবার কেঁপে উঠল।
আজান মির্জা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,

— "কেন মারলি ওকে? কী ভুল বলেছে ও?"
কি ভুল বলেছে অথৈ। তুই একবার চিন্তা করে দেখ সে দারোয়ানকে বিয়ে করতে রাজি আছে কিন্তু তোকে না দুটাকার মূল্য নেই তোর।
— "ছোটবেলা থেকেই তোর এই ভয়ংকর রাগের জন্য আত্মীয়-স্বজন কেউ তোর কাছে আসতে চাইত না। যাকে এত ভালোবাসলি, সেই মেয়েই আজ আমাদের মান-সম্মান মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে পালিয়ে গেলো।

তিনি থামলেন।
তারপর বুকের ওপর হাত রেখে বললেন,

— "মানুষ তোকে আদ্রিয়ান মির্জা নামে চেনে কেন জানিস? কারণ তোর নামের পাশে আমার নাম আছে। আমি আজান মির্জা। তুই আমার ব্যবসাকে আরও বড় করেছিস, এটা সত্যি। কিন্তু সেই ব্যবসা আমার। সেই পরিচয় আমার। একদিন যদি সব ছেড়ে বেরিয়ে যাস, দেখবি—তোর এই অহংকারের দাম কেউ দেবে না।"

কথাগুলো ছুরির মতো বিঁধল আদ্রিয়ানের হৃদয়ে।

সে কষ্ট আর রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠল,

— "বাবা, আমি কোনোদিন তোমার ব্যবসায় আসতে চাইনি। আমার স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হব। তুমিই আমাকে জোর করে এই ব্যবসায় বসিয়েছ!"

আজান মির্জা তিক্ত হেসে মাথা নাড়লেন।

— "হ্যাঁ... সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। এমন একজন মানুষকে ব্যবসার দায়িত্ব দিয়েছি, যে নিজের রাগটাকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আজ মনে হচ্ছে, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাপ—তোর মতো একজন ছেলের বাবা হওয়া।"

কথাটা শুনেই কেঁপে উঠলেন আদ্রিয়ানের মা, আইশা মির্জা।
তিনি চোখ ভেজা কণ্ঠে এগিয়ে এসে বললেন,

— "আপনি কী বলছেন? ও আমাদের ছেলে। নিজের সন্তানের সম্পর্কে এমন কথা বলতে আপনার একটুও কষ্ট হচ্ছে না?"

আজান মির্জা ঘুরে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
তার কণ্ঠে তখনও আগুন।

— "চুপ! একদম চুপ! এমন কুলাঙ্গার সন্তানকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দিয়েছ বলেই আজ এই দিন দেখতে হচ্ছে। মা-ছেলে মিলে আর কোনো নাটক করবে না!"

এই কথাটাই যেন আদ্রিয়ানের সহ্যের শেষ সীমা ভেঙে দিল।
সে রাগে বাবার দিকে এক পা এগিয়ে গেল।

ঠিক তখনই রায়হান মির্জা সামনে এসে তাকে শক্ত ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন।
কঠিন চোখে তাকিয়ে বললেন,

— "তোর রাগ আছে, সেটা জানতাম। কিন্তু তুই যে এত বড় বেয়াদব, আজ সেটা দেখলাম।"

আদ্রিয়ান দাঁত চেপে বলল,
— "মিস্টার রায়হান মির্জা... এটা আমার আর আমার বাবার ব্যাপার। আপনি মাঝখানে নাক গলাবেন না।"

কথাটা শেষ হতেই...
ঠাস!
ঠাস!
ঠাস!
আজান মির্জার হাত আবার ছেলের গালে উঠল।
প্রতিটি চড়ে যেন বছরের পর বছর জমে থাকা ক্ষোভ বেরিয়ে আসছিল।

তিনি গর্জে উঠলেন,
— "ও আমার ভাই! আমার পরিবারের একজন সদস্য! সে নাক গলাবে না তো কে গলাবে?"

তারপর কাঁপা অথচ কঠোর কণ্ঠে জীবনের সবচেয়ে নির্মম সিদ্ধান্ত শুনিয়ে দিলেন,

— "শুনে রাখ, আদ্রিয়ান মির্জা। এই মুহূর্ত থেকে তোর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তুই এখনই এই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যা। তোর মতো বদরাগী, অবাধ্য ছেলেকে আমি আর আমার পরিবারের সদস্য বলে মানি না। আজ থেকেই তুই এই বাড়ির জন্য মৃত।"

বাক্যগুলো শেষ হতেই পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আইশা মির্জা স্তব্ধ হয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

অথৈ ঠোঁটের রক্ত মুছতে মুছতে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
রায়হান মির্জা গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন।

আর আদ্রিয়ান...
সে একদৃষ্টিতে নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার চোখে তখন আর শুধু রাগ নয়—
ভেঙে যাওয়া আত্মসম্মান, বিশ্বাসঘাতকতার যন্ত্রণা, আর এমন এক প্রতিজ্ঞার আগুন জ্বলছিল, যার পরিণতি হয়তো এই পরিবারের কেউই তখনও কল্পনা করতে পারেনি।

আইশা মির্জা আর সহ্য করতে পারলেন না।
তিনি ছেলের দিকে এক পা এগিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন।

কিন্তু তার আগেই আজান মির্জা হাত তুলে স্ত্রীকে থামিয়ে দিলেন।

গভীর, কঠোর কণ্ঠে বললেন,
— "আয়েশা, একটাও কথা বলবে না। আজ ওকে বুঝতে দাও—বাবা ছাড়া সে কতটা অসহায়। আমার নাম, আমার টাকা, আমার বাড়ি, আমার গাড়ি—এসব ছাড়া বাইরের পৃথিবীতে ওর দুই টাকারও মূল্য নেই। আজ ও নিজের চোখেই সেটা দেখুক। শেষ পর্যন্ত ওকেই আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে।"

কথাগুলো যেন আগুন হয়ে ঝরে পড়ল আদ্রিয়ানের বুকে।
তার বুক দ্রুত উঠানামা করছে।
চোখের রক্তিম আভা আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে।

রাগ, অপমান আর কষ্টে তার পুরো শরীর কাঁপছে।
অনেকক্ষণ নিজের আবেগকে আটকে রাখার চেষ্টা করল সে।

তারপর হঠাৎ বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠল,
— "মিস্টার আজান মির্জা!"

হলরুম আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
— "আপনার রক্ত আমার শরীরে বইছে, তাই আপনার জেদ যদি থাকতে পারে, আমারও আছে। আজ থেকে এই মির্জা পরিবারের সঙ্গে আমার সব সম্পর্ক শেষ। আমি আমার পরিচয় নিজেই তৈরি করব। যত কষ্টই হোক, জীবনে কোনোদিন আপনার কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতব না,তাতে আপনার মির্জা ট্যাগ টাও ফেলে দিয়ে গেলাম।

এক মুহূর্তও আর দাঁড়াল না আদ্রিয়ান।
ধীরে ধীরে নিজের গায়ের রাজকীয় শেরওয়ানিটা খুলে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিল।
মনে হচ্ছিল, শুধু পোশাক নয়—সে তার অতীত, অহংকার আর পারিবারিক পরিচয়ও মাটিতে ফেলে রেখে যাচ্ছে।

দ্রুত নিজের ঘরে ঢুকে একটি ছোট ব্যাগে শুধু শিক্ষাজীবনের সার্টিফিকেট আর প্রয়োজনীয় কয়েকটি কাগজপত্র নিল।

আর কিছু নয়।
না কোনো দামি ঘড়ি।
না কোনো অলংকার।
না পরিবারের একটি টাকাও।
শেষবারের মতো চারদিকে তাকিয়ে নীরবে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল সে।

রাত তখন গভীর।
আদ্রিয়ান খালি পায়ে হাঁটছে।
শহরের রাস্তায় যাদের সঙ্গেই দেখা হচ্ছে, সবাই যেন মোবাইলের পর্দায় দেখা সেই খবরের সঙ্গে তার মুখ মিলিয়ে দেখছে।

কেউ ফিসফিস করছে।
কেউ চাপা হাসছে।
কেউ আবার আঙুল তুলে দেখিয়ে বলছে,

— "ওই তো... টিভিতে দেখানো সেই আদ্রিয়ান মির্জা!"
— "যার প্রেমিকা বিয়ের দিন পালিয়ে গেছে!"
— "নিজের চাচাতো বোনও যাকে বিয়ে করতে রাজি হয়নি!"

প্রতিটি কথা তার আত্মসম্মানকে আরও রক্তাক্ত করে তুলছিল।
রাত পেরোতেই পুরো দেশ জেনে গেল মির্জা পরিবারের সেই অপমানের ঘটনা।

সব টেলিভিশন চ্যানেলে একটাই খবর।
"ব্রেকিং নিউজ!"

"দেশের প্রভাবশালী শিল্পপতি আদ্রিয়ান মির্জার বিয়ে ভেঙে গেল। কনে বিয়ের দিন প্রেমিকের সঙ্গে বিদেশে পালিয়ে গেছেন, তার আপন চাচাতো বোন দারোয়ানকে বিয়ে করতে রাজি কিন্তু আরদিয়ান মির্জা কে নয়।

আরেকটি চ্যানেল বলছে,
"একদিনে দুই নারীর প্রত্যাখ্যান! প্রথমে প্রেমিকা পালিয়ে গেলেন, পরে চাচাতো বোনও বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানালেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে এই ঘটনা।"

খবরগুলো মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ নানা মন্তব্য করতে লাগল।

কারও সহানুভূতি...
কারও বিদ্রূপ...
কারও নির্মম হাসি।
অপমানের ভার আর সহ্য করতে পারল না আদ্রিয়ান।

সে একটি ছোট্ট সেলুনে ঢুকে পড়ল।
আয়নার সামনে বসে ধীর কণ্ঠে বলল,

— "চুল ছোট করে দিন... দাড়িটাও কেটে দিন।"

কয়েক মিনিট পর আয়নায় ভেসে উঠল সম্পূর্ণ নতুন এক মানুষ।
যে মুখটাকে দেশের কোটি মানুষ চিনত, সেটাই যেন অনেকটাই বদলে গেছে।

সেলুন থেকে বেরিয়ে সে সোজা রেলস্টেশনের দিকে হাঁটতে লাগল।
প্ল্যাটফর্মের এক কোণে বসে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল।

ভেতরে কিছু নগদ টাকা।
আর একটি ক্রেডিট কার্ড।
সে অনেকক্ষণ কার্ডটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে সেটি আবার মানিব্যাগে রেখে দিল।

মনে মনে বলল,
"এই কার্ডে হয়তো কোটি কোটি টাকা আছে... কিন্তু আজ থেকে আমি নিজের পরিচয়ে বাঁচতে চাই। যদি সত্যিই নিজের যোগ্যতা থাকে, তাহলে সেই যোগ্যতাতেই বাঁচব।"

কিছুক্ষণ পর চট্টগ্রামগামী ট্রেন প্ল্যাটফর্মে এসে থামল।
আদ্রিয়ান নীরবে উঠে একটি জানালার পাশের আসনে বসে পড়ল।

ট্রেন চলতে শুরু করল।
জানালার বাইরে রাতের অন্ধকার ছুটে যাচ্ছে।
আর ভেতরে আদ্রিয়ানের মনে একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

"সত্যিই কি সবাই শুধু আমার বাবার নাম আর টাকার জন্য আমার পাশে ছিল?"
"আমাকে কি কেউ কোনোদিন সত্যিকারের মানুষ হিসেবে ভালোবাসেনি?"
"আমি কি সত্যিই এতটাই ভয়ংকর?"আর অথৈ দারোয়ানকে বিয়ে করতে রাজি আমাকে নয় আমি কি এতই অযোগ্য।

একসময় সে চোখ বন্ধ করল।
তারপর নিজের মনকেই কথা দিল,

"আমি প্রমাণ করব—মানুষ শুধু পরিচয় দিয়ে বড় হয় না। নিজের চরিত্র, নিজের যোগ্যতা আর নিজের আচরণ দিয়েও বড় হওয়া যায়। আর যদি পৃথিবীতে সত্যিকারের ভালোবাসা থেকে থাকে, তাহলে একদিন আমি সেটাও খুঁজে পাব।"

অন্যদিকে...

চট্টগ্রামের অন্যতম অভিজাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
ধনী ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানদের কাছে এটি যেন ক্ষমতার আরেকটি মঞ্চ।

বাবার অর্থ আর রাজনৈতিক প্রভাবের জোরে অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে ভাবত।
মধ্যবিত্ত পরিবারের কোনো ছেলে বা মেয়ে সেখানে পড়তে এলে তাদের জীবন প্রায় দুর্বিষহ করে তোলা হতো।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি—
খাইরুন্নেসা কথা।

অসাধারণ সৌন্দর্য, তীক্ষ্ণ ব্যক্তিত্ব আর বেপরোয়া স্বভাবের জন্য পুরো ক্যাম্পাসে সে ছিল পরিচিত।
তবে খুব কম মানুষই জানত, তার পরিবার চট্টগ্রামের অন্যতম প্রভাবশালী পরিবার।

তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল রাসেল—একজন ক্ষমতাধর সংসদ সদস্যের ছেলে।
তাদের প্রভাব এতটাই ছিল যে কোনো শিক্ষক যদি তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই শিক্ষক বেশিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকে থাকতে পারতেন না।
কেউ বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করতেন...
কেউ আবার ভয়ে নিজেই চাকরি ছেড়ে চলে যেতেন,প্রভা সিটি সকল শিক্ষক অতিষ্ঠ কথা ও রাসেল সাথে তার সকল বন্ধুদের কারণে।

ঠিক সেই সময়...
দীর্ঘ রাতের যাত্রা শেষে চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে এসে থামল ট্রেন।

ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মে পা রাখল আদ্রিয়ান।
চারদিকে অপরিচিত শহর।
অপরিচিত মানুষ।

সে গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
নিজের মনেই বলল,

"এই শহরে আমাকে কেউ চেনে না। এখান থেকেই শুরু হবে আমার নতুন জীবন। কিন্তু কোথায় থাকব? কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করব? আর এই নতুন পথ আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে?"

অজান্তেই সে এগিয়ে চলল এমন এক ভাগ্যের দিকে, যেখানে তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন অপেক্ষা করছিল।
ওটা কেমন হয়েছে কমেন্ট করে জানাবেন, আপনাদের ভালো লাগলে পরবর্তী পর্ব এগিয়ে নিব।
পরবর্তী পর্বের জন্য এই পেজটি ফলো করে রাখুন।
>>>>>> গল্পের শহরে তুমি আমি >>>>>>

চলবে......

Address

Sector-10, Uttara
Dhaka
1230

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Bangla Story Link World posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Bangla Story Link World:

Shortcuts

Share

Category