23/08/2026
গল্প> #আমার_গল্পে_তুমি ( পালিয়ে বিয়ে) সকল পর্ব একসাথে।
লিখক> Md Najmul Huda Sharif
🚫এই গল্পটা Raihan dairy ইউটিউব চ্যানেলকে voice আকারে আপলোড করার কপিরাইট দেওয়া হলো অন্য কোন ইউটিউবার কপি করা হতে বিরত থাকবেন 🚫
১
https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192001584894169/?app=fbl
২
https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192033696894169/?app=fbl
৩
https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192120060894169/?app=fbl
৪
https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192146844894169/?app=fbl
৫
https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192214932894169/?app=fbl
৬
https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192265818894169/?app=fbl
৭
https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192330918894169/?app=fbl
৮
https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192387246894169/?app=fbl
৯
https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192453876894169/?app=fbl
শেষ পর্ব
https://www.facebook.com/61576825076939/posts/122192501330894169/?app=fbl
এমন আরো গল্প পেতে এই পেজটি ফলো করে রাখুন
>>>>>>>> গল্পের শহরে তুমি আমি >>>>>>
গল্প> #আমার_গল্পে_তুমি ( পালিয়ে বিয়ে) ১ম পর্ব
লিখক> Md Najmul Huda Sharif
🚫এই গল্পটা Raihan dairy ইউটিউব চ্যানেলকে voice আকারে আপলোড করার কপিরাইট দেওয়া হলো অন্য কোন ইউটিউবার কপি করা হতে বিরত থাকবেন🚫
( গল্পটা ২০১০ থেকে ২০১৩ ঘটনা চিন্তা করে লিখা)
অনন্যা তখন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার চোখেমুখে একটুও মায়া নেই। যেন এই বাড়িতে, এই মানুষটির সঙ্গে কাটানো গত দুই বছরের কোনো স্মৃতিই তার মনে আর অবশিষ্ট নেই।
আকাশ বারবার তাকে আটকানোর চেষ্টা করছে। একসময় অসহায় হয়ে অনন্যার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। দু’হাত জোড় করে কাঁপা কণ্ঠে বলতে লাগল,
—প্লিজ অনন্যা... আমাকে ছেড়ে যেও না। এই দুনিয়ায় তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই। তোমাকে ভালোবেসে আমি সব হারিয়েছি। মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন—সবাইকে ছেড়ে দিয়েছি। এমনকি আমার বাবা-মাও আমাকে ত্যাজ্য করেছে। এই মুহূর্তে তুমি যদি আমাকে ছেড়ে চলে যাও, আমি কোথায় যাব? কার কাছে যাব?
আকাশের চোখ বেয়ে তখন অঝোরে পানি পড়ছে। তার কণ্ঠে ছিল এমন এক অসহায়ত্ব, যা দেখে পাথরের হৃদয়ও হয়তো গলে যেত।
কিন্তু অনন্যার চোখে তার জন্য কোনো মায়া জন্মাল না।
হঠাৎ অনন্যা বাবা প্রচণ্ড রাগে আকাশকে লাথি মেরে সরিয়ে দিল।
আকাশ ভারসাম্য হারিয়ে কয়েক হাত দূরে ছিটকে পড়ল। মেঝেতে পড়ে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল সে।
সেই মুহূর্তে অনন্যার বাবা মাহাবুব সাহেব কঠিন গলায় বলে উঠলেন,
—আমার মেয়ে তোকে একটু আগেই ডিভোর্স দিয়েছে। এখনো কোন অধিকারে তুই আমার মেয়েকে আটকাচ্ছিস?
আকাশ ধীরে ধীরে উঠে বসে চারপাশে তাকাল।
তার চোখ গিয়ে থামল অনন্যার বাবা, মা আর ছোট বোনের মুখে।
কয়েক মুহূর্ত তাদের দিকে নির্বাক তাকিয়ে রইল সে।
মনের ভেতর তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
এই মানুষগুলোর সব দায়িত্ব তো আমি নিয়েছিলাম!
দুই বছর ধরে এই পরিবারটা তার ওপর নির্ভর করে বেঁচেছে। তাদের খাওয়া-পরা থেকে শুরু করে সংসারের প্রয়োজনীয় সবকিছু সে নিজের দায়িত্ব মনে করে পূরণ করেছে। অথচ আজ তাকে বুকের ওপর লাথি মারার আগে একজন মানুষও একবার ভাবল না—এই মানুষটা তাদের জন্য কতটা করেছে!
তবু ভালোবাসা বড় অদ্ভুত জিনিস।
এত অপমানের পরও আকাশের হৃদয় অনন্যার কাছেই ছুটে গেল।
সে আবার উঠে দাঁড়িয়ে অনন্যার কাছে গিয়ে তার পা জড়িয়ে ধরল।
—প্লিজ অনন্যা... আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তোমাকে ভালোবেসেই তো বিয়ে করেছি। আমাদের যে সমস্যা হয়েছে, আমরা চাইলে একটা বাচ্চা দত্তক নিতে পারি। শুধু তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না।
অনন্যার মুখ মুহূর্তেই বিকৃত হয়ে উঠল বিরক্তিতে।
পরের মুহূর্তেই সে প্রচণ্ড জোরে আকাশের বুক বরাবর লাথি মারল।
লাথিটা শুধু আকাশের বুকে লাগেনি—
মনে হলো, সরাসরি তার অন্তরে গিয়ে আঘাত করেছে।
আকাশ স্থির হয়ে গেল।
চোখ বড় বড় করে অনন্যার দিকে তাকিয়ে রইল সে।
নিজের ভালোবাসার মানুষটি সত্যিই তাকে এভাবে লাথি মারতে পারে—এটা যেন কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।
অনন্যা এবার চিৎকার করে বলল,
—আমি কি পাগল যে তোর মতো একটা হিজলার সঙ্গে সারাজীবন সংসার করব? যে আমাকে কখনো সন্তানের সুখ দিতে পারবে না, আমাকে মা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে না,আর আমি কি পাগল হয়েছি যে অন্য সন্তানকে নিজের সন্তানের মত লালন পালন করব।
কথাগুলো আকাশের কানে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে যেন চারপাশের সমস্ত শব্দ থেমে গেল।
তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল।
এতদিন যে মানুষটাকে নিজের পৃথিবী ভেবেছিল, সেই মানুষটির মুখ থেকেই আজ এমন কথা শুনতে হচ্ছে!
আকাশের ঠোঁট কাঁপতে লাগল। চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারল না।
কাঁদতে কাঁদতে সে অনন্যার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তোমার পায়ে পড়ি অনন্যা... তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না। তুমি চলে গেলে আমি কোথায় দাঁড়াব, আমি জানি না। তুমি আমার সবকিছু...তুমি চলে গেলে অনন্যা আমি মরে যাবো।
অনন্যার মা এবার তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন,
—তুই থাকলে কি আর না থাকলে, তাতে আমাদের কী? আমার মেয়ের রূপে-গুণে কোনো কমতি নেই। তোর চেয়ে হাজার গুণ ভালো পরিবারের ছেলের সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে দেব। তুই তো...একটা হিজলা।
তিনি থেমে গিয়ে অপমানজনক শব্দটি উচ্চারণ করলেন।
ঘরের এক কোণে অনন্যার ছোট বোন দাঁড়িয়ে ছিল। পুরো ঘটনাটা সে নীরবে মোবাইল ফোনে ভিডিও করছিল। কারও প্রতি তার কোনো মায়া নেই, বরং আকাশের অপমান যেন তার কাছে বিনোদনের বিষয়।
অনন্যা ঠোঁটে বিদ্রূপের হাসি ফুটিয়ে বলল,
—তুমি যদি আমাকে ছাড়া বাঁচতেই না পারো, তাহলে আগে নিজের জীবনটা নিয়ে ভাবো। আমার পেছনে পড়ে থেকে কোনো লাভ নেই। আমি তোমার সঙ্গে আর এক মুহূর্তও থাকতে চাই না,তাছাড়া তোমার মত পুরুষকে কেউ বিয়ে করবে না, তার চেয়ে তুমি মরে যাও এটাই ভালো তোমার জন্য, আরেকটা কথা তোমার অফিসের বস মানে আরিয়ান আহমেদ এর সাথে দুদিন পর আমার বিয়ে।
কথাগুলো বলে সে আবারও আকাশকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
তারপর পেছনে ফিরে তাকাল না।
অনন্যার মা আর বোনও তাকে অনুসরণ করে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
আর ঘরের মাঝখানে পড়ে রইল আকাশ,শেষের কথাটা রীতিমতো তির হয়ে গেতে যাই আকাশের বুকে, আকাশ তখন একটা কথাই মনে পড়ে, তার বন্ধু রাসেল বলেছিল আমার অফিসের বস আরিয়ানের সাথে অনন্যার একটা সম্পর্ক চলছে যেটাকে আমরা পরকীয়া বলি।
একটা মানুষ—
যে কয়েক মুহূর্ত আগেও তার ভালোবাসার মানুষটাকে ধরে রাখার জন্য কাকুতিমিনতি করছিল।
এখন সে একা।
ভীষণ একা।
কিছুক্ষণ পর আকাশ ধীরে ধীরে মাথা তুলে বন্ধ দরজার দিকে তাকাল। চোখ থেকে তখনো পানি ঝরছে।
কাঁপা কণ্ঠে নিজেকেই বলল,
—অনন্যা... যেদিন তুমি সত্যিটা জানবে, সেদিন জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা বুঝতে পারবে। আজ তুমি চলে যাচ্ছ... কিন্তু একদিন তুমি আবার ফিরে আসতে চাইবে। একদিন তুমি আমাকে ভালোবেসে পাগল হয়েছিলে। আজ তোমার সেই ভালোবাসা কোথায় হারিয়ে গেল?
সে চোখ বন্ধ করল।
তারপর নিজের মনেই প্রশ্ন করল,
—তুমি কি সত্যিই কোনোদিন আমাকে ভালোবেসেছিলে, অনন্যা?
রাত পেরিয়ে ধীরে ধীরে সকাল হয়ে গেল।
কিন্তু আকাশের জীবনে যেন রাতটাই রয়ে গেল।
সারারাত সে ঘুমাতে পারেনি। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল অনন্যার মুখ। সেই মানুষটার মুখ, যার জন্য সে নিজের পরিবার পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছিল।
দুই বছর ধরে অনন্যার পুরো পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল সে।
তাদের খাবার, পোশাক, সংসারের খরচ—যা কিছু তার সামর্থ্যের মধ্যে ছিল, সবকিছুই পূরণ করার চেষ্টা করেছে। এমনকি অনন্যার বাবা-মাকেও নিজের বাবা-মায়ের মতো সম্মান দিয়েছে।
কিন্তু বিনিময়ে কী পেল?
একটু সম্মানও নয়।
একটু কৃতজ্ঞতাও নয়।
শুধু অপমান।
শুধু অবহেলা।
শুধু ভালোবাসার নামে এক গভীর প্রতারণা।
আকাশের বুকটা ভারী হয়ে উঠল।
ঠিক তখনই তার বাবার পুরোনো কথাগুলো মনে পড়ল।
বাবা কতবার তাকে সতর্ক করেছিলেন—
‘এই মেয়ে আর তার পরিবার ভালো নয়। একদিন তোকে ধোঁকা দেবে। তখন বুঝবি, তুই কী হারিয়েছিস।’
তখন আকাশ বাবার কথা শোনেনি।
ভালোবাসার নেশায় অন্ধ হয়ে ভেবেছিল, পৃথিবীর সবাই ভুল হতে পারে, কিন্তু অনন্যা কখনো তাকে ঠকাতে পারে না।
আজ সেই বিশ্বাসটাই তার সামনে ভেঙে চুরমার হয়ে পড়ে আছে।
আকাশ চোখ মুছে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার জীবনে প্রথমবারের মতো মনে হলো—
ভালোবাসার জন্য মানুষ সবকিছু হারাতে পারে, কিন্তু যে মানুষটির জন্য সব হারায়, সেই মানুষটিই যদি একদিন তাকে অস্বীকার করে, তখন হারানোর যন্ত্রণাটা কতটা গভীর হয়—তা শুধু সেই মানুষটিই জানে।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে আকাশ ধীর পায়ে রাস্তায় হাঁটছিল। কোথায় যাবে, কী করবে—কিছুই জানে না সে। শুধু জানে, যে বাড়িটাকে এতদিন নিজের পৃথিবী ভেবেছিল, সেই বাড়িটাই আজ তার কাছে অপরিচিত হয়ে গেছে। অনন্যার মুখ, তার কথাগুলো, বুকের ওপর এসে পড়া সেই লাথি—সবকিছু বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।
এমন সময় হঠাৎ কয়েকজন হিজড়ার দল এসে তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল। তাদের মধ্যে একজন আকাশের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে উঠল,—
আরে! এটাই তো সেই ছেলে, ফেসবুকে যার ভিডিও দেখেছি। আজ থেকে আমাদের নতুন সঙ্গী হতে চলেছে!
কথাগুলো আকাশের মাথার ওপর দিয়ে গেল। সে অবাক হয়ে তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুই বুঝতে পারছিল না—কেন তারা তাকে ঘিরে ধরেছে, কীসের ভিডিও দেখেছে, আর কেনই বা তাকে তাদের নতুন সঙ্গী বলছে। আকাশ তাদের পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলে একজন আবার বলে উঠল,—
আরে, চলে যাচ্ছিস কেন? তোকে তো আবার আমাদের কাছেই ফিরে আসতে হবে। গতকাল তোর বউ তোকে ছেড়ে গেছে না? ফেসবুকে তো এখন পুরো দেশই দেখে ফেলেছে!
কথাটা শুনতেই আকাশের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। মনে হলো, তার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেছে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু সে কোনো উত্তর দিল না। দ্রুত সেখান থেকে সরে গেল।
কিছুদূর যাওয়ার পর আকাশ হঠাৎ আশপাশের মানুষগুলোর দিকে তাকাল। অদ্ভুত ব্যাপার—প্রায় সবাই যেন তাকে দেখছে। কেউ আড়চোখে তাকিয়ে হাসছে, কেউ আবার সরাসরি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে। আকাশের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ে তার বান্ধবীকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,—
এই ছেলেটাই নাকি! দেখ তো, কত হ্যান্ডসাম, দেখতে কত সুন্দর একটা ছেলে! অথচ শুনছি, ও নাকি...হিজলা কথাটা শেষ না করেই মেয়েটা হেসে ফেলল।
আকাশের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। আরও কিছুদূর এগোতেই কয়েকজন ছেলে আর বয়স্ক মানুষ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। আকাশকে দেখেই তাদের একজন বলে উঠল,—
আরে, এই ছেলেটাই তো! দেখতে এত সুন্দর, দেখলে তো বোঝাই যায় না সে হিজলা!
অন্যজনও মুচকি হেসে বলল, —
ফেসবুকে যা দেখেছি, এখন তো সবই জানা।
আকাশ দ্রুত পা বাড়াল। কিন্তু যেদিকেই যাচ্ছে, সেদিকেই মানুষের চোখ যেন তার পিছু নিচ্ছে। কেউ হাসছে, কেউ ফিসফিস করছে, কেউ আবার প্রকাশ্যেই কটাক্ষ করছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার বেঁচে থাকা জীবনটাই যেন মানুষের হাসি-তামাশার বিষয় হয়ে গেছে। যে পৃথিবীতে এতদিন সে মাথা উঁচু করে হেঁটেছে, সেই পৃথিবীটাই আজ তার কাছে এক অসহ্য কারাগারের মতো মনে হচ্ছে।
আকাশ একটা নিরিবিলি জায়গা খুঁজছিল। এমন একটা জায়গা, যেখানে গিয়ে অন্তত কয়েক মুহূর্তের জন্য মানুষের চোখের আড়ালে দাঁড়াতে পারবে, নিজের ভেঙে পড়া মনটাকে সামলাতে পারবে। ঠিক তখনই আঠারো-উনিশ বছরের একটা ছেলে সামনে এসে দাঁড়াল। ছেলেটা কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,—
আচ্ছা ভাইয়া, একটা কথা জিজ্ঞেস করব? আপনি কি সত্যিই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ? জানি না কেন, আপনাকে দেখে তো আমার তেমন মনে হয় না।
আকাশ বিরক্ত হয়ে তাকাল তার দিকে। সারাদিনের অপমান, লজ্জা আর অসহায়তা যেন এবার তার কণ্ঠে জমে উঠল। সে বলল,—
তোমাকে এসব কে বলেছে? সকাল থেকে সবাই এসব কথা কেন বলছে?
ছেলেটা অবাক হয়ে বলল,
—কেন ভাইয়া, আপনি জানেন না? আপনি তো ভাইরাল! এই দেখেন, আপনার বউ গতকাল একটা ভিডিও করে ছেড়ে দিয়েছে ১২ ঘন্টার মধ্যে ৫মিলিয়ন ভিউ। আপনাকে ছেড়ে যাওয়ার সময় কী হয়েছে, সব বলেছে।
ছেলেটা নিজের মোবাইলটা আকাশের হাতে তুলে দিল। আকাশ কাঁপা হাতে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। ভিডিও চালু হতেই তার চোখ স্থির হয়ে গেল। সেখানে দেখা যাচ্ছে—গতকাল রাতে সে অনন্যার পা ধরে কাঁদছে, হাত জোড় করে তাকে চলে যেতে নিষেধ করছে, বারবার নিজের ভালোবাসার কথা বলছে।
আর ভিডিওর শেষে অনন্যা ও তার মা বলছে,
আকাশ হিজলা সেজন্যই আমার মেয়ের সাথে তার ডিভোর্স করি আজকে আমরা চলে যাচ্ছি।
যার মাধ্যমে আকাশের ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়টাকে সবার সামনে এনে তাকে অপমান করা হয়েছে। ভিডিওটা শেষ হওয়ার আগেই আকাশের হাত কাঁপতে শুরু করল। তার মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো। এখন আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না—মানুষ তাকে দেখে কেন হাসছে, কেন রাস্তায় সবাই তাকে চিনে ফেলছে, কেন হিজড়াদের দল তাকে ঘিরে ধরে তাদের সঙ্গে যাওয়ার কথা বলছিল। অনন্যা শুধু তাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যায়নি; নিজের পরিবারের সম্মান বাঁচানোর জন্য তার সম্মানটাকেও পুরো সমাজের সামনে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে।
ঠিক তখনই আকাশের পকেটে থাকা মোবাইলটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে লেখা—বাবা।
আকাশ কয়েক সেকেন্ড ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কাঁপা হাতে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বাবার কঠিন কণ্ঠ ভেসে এল,—
তোকে তো আমরা আগেই ত্যাজ্য করেছি। আল্লাহর দোহাই লাগে, তুই আর আমাদের বাড়ির আশেপাশে আসবি না। কাউকে বলবি না যে তুই আমাদের ছেলে। মানুষ যদি জানতে পারে তুই আমাদের সন্তান, তাহলে আমাদের মান-সম্মান শেষ হয়ে যাবে।
বাবার মুখে এমন কথা শুনে আকাশের পৃথিবীটা যেন মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকার হয়ে গেল। যে বাবা-মায়ের কাছে একদিন ফিরে যাওয়ার আশায় বুক বেঁধেছিল, আজ সেই বাবাই তাকে নিজের সন্তান হিসেবে পরিচয় দিতে নিষেধ করছেন। ফোনটা কানে ধরা অবস্থাতেই আকাশ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল, পুরো পৃথিবীটা যেন তার মাথার ওপর ভেঙে পড়েছে। নিজের মান-সম্মান, ভালোবাসা, পরিবার—সবকিছু একসঙ্গে মাটিতে মিশে গেছে। তখন তার বুঝতে বাকি রইল না, অনন্যা ও তার পরিবার সমাজের সামনে নিজেদের সম্মানটুকু বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে তার সম্মানটাকেই বলি দিয়েছে।
আকাশ ফোনটা নামিয়ে ধীরে ধীরে সামনের দিকে হাঁটতে লাগল। মাথার ভেতর তখন একের পর এক অন্ধকার চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। জীবনের প্রতি সমস্ত আশা যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ঠিক সেই সময় হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল বহু বছর আগের একটা দিন। এমন একটা সময়, যখন তার জীবন এতটা কঠিন ছিল না; যখন ভালোবাসা মানে ছিল একটা ছোট্ট বাটন ফোন, কয়েকটা এসএমএস আর ফোনের ওপাশ থেকে প্রিয় মানুষের কণ্ঠ শোনা। অতীতের সেই স্মৃতি ধীরে ধীরে তার মনকে টেনে নিয়ে গেল অনেক দূরে।
চলুন, অতীত থেকে একটু ঘুরে আসি।
সাল ২০১০। তখনকার ভালোবাসায় আজকের মতো এত আড়ম্বর ছিল না। ভালোবাসা লুকিয়ে থাকত মোবাইলের ছোট্ট ইনবক্সে। একটা ‘হ্যালো’, একটা ‘কেমন আছো?’ কিংবা গভীর রাতে আসা একটা ছোট্ট এসএমএস—এসবের মধ্যেই মানুষ খুঁজে নিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দ। প্রিয় মানুষের কণ্ঠ একবার শুনতে পেলেই মনটা জুড়িয়ে যেত। দিনটা ছিল ২০১০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি—ভালোবাসা দিবস। আকাশের সব বন্ধুরা সেদিন তাদের গার্লফ্রেন্ড নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে বেরিয়েছিল। কেউ রেস্টুরেন্টে, কেউ পার্কে, কেউ আবার শুধু পাশাপাশি হাঁটতেই বেরিয়েছে। কিন্তু আকাশ যেতে পারেনি। কারণ তার কোনো গার্লফ্রেন্ড ছিল না। তাই বাড়িতে বসে সেদিন তার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে ছিল।
ঠিক তখনই হঠাৎ তার ফোনটা বেজে উঠল। অচেনা একটা নম্বর। আকাশ অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফোনটা রিসিভ করল। ওপাশ থেকে ভেসে এল এক মেয়ের সুমধুর কণ্ঠ, —
হ্যালো... ইসরাত? আমি মেঘ বলছি। তুমি কোথায়? আমি তো এখনো দাঁড়িয়ে আছি।
কণ্ঠটা শুনে আকাশ কয়েক মুহূর্ত থমকে গেল। তারপর নিজেকে সামলে বলল,—
সরি, আমি ইসরাত নই। আমার নাম আকাশ। আপনি ভুল নম্বরে ফোন করেছেন।
কথাটা বলেই সে ফোন কেটে দিল। এমনিতেই তার মনটা খারাপ ছিল, তার ওপর আবার রং নম্বরের ফোন—বিষয়টা তার কাছে বিরক্তিকরই লাগল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সেই একই নম্বর থেকে আবার ফোন এল। ওপাশে আবারও সেই মিষ্টি কণ্ঠ। আকাশ আবারও বলল, —আপনি ভুল নম্বরে ফোন করেছেন।
তারপর ফোন কেটে দিল। এভাবে তিন-চারবার ফোন আসার পর আকাশের বিরক্তি বাড়তে লাগল। তার মনে হলো, নিশ্চয়ই তার বন্ধুরা কোনো মেয়েকে দিয়ে তাকে ফোন করিয়ে জ্বালাচ্ছে। তাই ষষ্ঠবার ফোন আসতেই সে রাগের মাথায় মেয়েটাকে যা নয় তা বলে বকাঝকা করে ফেলল, কথাবার্তার মাঝেও খারাপ ব্যবহার করল।
বিকেলের দিকে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে আকাশ রাসেল, কাদের আর মুন্নাকে জিজ্ঞেস করল—
তোরা কি কোনো মেয়েকে দিয়ে আমাকে ফোন করাচ্ছিস?
রাসেল অবাক হয়ে বলল,—
আরে না দোস্ত! এমনিতেই আমরা জানি তোর কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই। তাই বলে অন্য মেয়েকে দিয়ে ফোন করিয়ে তোকে জ্বালাব নাকি?
কাদের আর মুন্নাও একই কথা বলল। আকাশ চুপ হয়ে গেল। তার বুকের ভেতর হঠাৎ অপরাধবোধ জেগে উঠল। মেয়েটাকে সে অযথাই গালিগালাজ করেছে, খারাপ ব্যবহার করেছে। কিছুক্ষণ পর আর নিজেকে সামলাতে না পেরে সেই নম্বরে আকাশ নিজেই ফোন করল। ফোন রিসিভ হতেই সে বলল,—
আসলে আমি ভেবেছিলাম আমার বন্ধুরা আমার সঙ্গে কোনো মেয়েকে দিয়ে ফাজলামি করছে। তাই আপনার সঙ্গে এমন খারাপ ব্যবহার করেছি।
মেয়েটা শান্ত কণ্ঠে বলল,—
সরি বলার দরকার নেই। আমি কিছু মনে করিনি। আসলে আমি আজ ঢাকায় এসেছি। আমার এক বান্ধবীর নম্বরে ফোন করতে গিয়ে বারবার ভুল করে আপনার নম্বরে ফোন চলে যাচ্ছে। আমি এখনো ঢাকা রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি।
আকাশ অবাক হয়ে বলল,—
এখন তো রাত দশটা বাজে! আপনি এখনো সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন? যাবেন কোথায়?
মেয়েটা একটু ভয় মেশানো কণ্ঠে বলল —
আসলে আমি একা গাড়িতে উঠতে ভয় পাচ্ছি। আমার বান্ধবী আসবে বলেছিল। শুনেছি তারা ধানমন্ডি দশে থাকে, ৬ নম্বর রোড, ১৭ নম্বর বাসা।
আকাশ কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে বলল,—
আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি একটা সিএনজি নিন। ড্রাইভারকে আমার সঙ্গে কথা বলতে দিন।
মেয়েটা একজন সিএনজি ড্রাইভারের হাতে ফোনটা দিলে আকাশ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,—
আমি ধানমন্ডি থানার পক্ষ থেকে বলছি। এটা আমার বাসার মেহমান। উনাকে সুন্দর করে ধানমন্ডি ১০ নম্বর, ৬ নম্বর রোড, ১৭ নম্বর বাসায় পৌঁছে দেবেন। কোনো এদিক-ওদিক যেন না হয়।
আকাশের কথাগুলো শুনে সিএনজি ড্রাইভারের মুখের রং পাল্টে গেল। তার চোখেমুখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল। সে দ্রুত ফোনটা মেয়েটার হাতে দিয়ে বলল, —আপা, উনি পুলিশ বলেছে। আপনি ঠিকানা বলেন, আমি আপনাকে ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিচ্ছি।
সেদিন সেই সিএনজি চালক মেয়েটাকে ঠিকমতো তার গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছিল। আর সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল ছোট্ট একটা বাটন ফোনের মাধ্যমে আকাশের জীবনের নতুন এক সম্পর্ক। কখনো এসএমএস, কখনো ফোনে কথা—ধীরে ধীরে অচেনা দুটো মানুষ একে অপরের খুব কাছের হয়ে উঠতে লাগল। আর সেই মেয়েটির নাম ছিল—সায়রা তাবাসসুম মেঘ
কথা বলতে বলতে একদিন আকাশ হঠাৎ মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করল,—
আচ্ছা, এতদিন ধরে তোমার সঙ্গে কথা বলছি, অথচ তোমার নামটাই তো জানা হলো না! আমার নাম কিন্তু আকাশ।
ওপাশ থেকে মেয়েটা মুচকি হেসে বলল,—
আমার নাম মেঘ।
সেই একটি নাম যেন আকাশের জীবনে আলাদা এক অর্থ নিয়ে এলো। সেদিন থেকেই শুরু হলো দুজনের সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়। মুখে কেউ ভালোবাসার কথা বলেনি, কেউ কাউকে ‘ভালোবাসি’ বলেনি, অথচ অদৃশ্য এক টানে দুজনেই ধীরে ধীরে একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে পড়ল, যেন একজনকে ছাড়া অন্যজনের দিনটাই অসম্পূর্ণ।
আকাশ যদি কোনোদিন মেঘের সঙ্গে কথা বলতে না পারত, অদ্ভুত এক অস্থিরতা তাকে ঘিরে ধরত। বারবার ফোনের দিকে তাকাত, মেঘ কেন ফোন করছে না সেই চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠত।
আর মেঘের অবস্থাও ছিল আরও করুণ। আকাশের সঙ্গে কথা না হলে সে ভার্সিটিতে যেত না, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করত না। কখনো চুপচাপ বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে কাঁদত। নিজের অজান্তেই মেঘ বুঝতে শুরু করেছিল—সে আকাশকে ভালোবেসে ফেলেছে। শুধু ভালোবাসা নয়, মানুষটা যেন তার রক্তের সঙ্গে, নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশে গেছে। আকাশকে ছাড়া একটা দিন কাটানোর চিন্তাই তার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল।
বিষয়টা বেশিদিন মেঘের হোস্টেলের ভেতর গোপন থাকল না। কান থেকে কানে ছড়িয়ে পড়ল অদ্ভুত সেই প্রেমের গল্প—
মেঘ নাকি এমন একজন ছেলেকে ভালোবেসে ফেলেছে, যাকে সে জীবনে একবারও চোখে দেখেনি। আর ছেলেটাও নাকি তাকে না দেখে ভালোবেসে ফেলেছে।
ধীরে ধীরে ব্যাপারটা হোস্টেলের সবার কাছে এক ধরনের কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠল। মেঘ তখন ১১২ নম্বর রুমে থাকত, আর একই হোস্টেলের ২১৪ নম্বর রুমে থাকত অনন্যা।
মেঘ আর অনন্যা একে অপরকে চিনত না, কিন্তু মেঘের সেই অদেখা ভালোবাসার গল্প অনন্যার কানেও পৌঁছে গেল। এমন অদ্ভুত সম্পর্কের কথা শুনে অনন্যার মনে কৌতূহল জন্ম নিল। মেঘের ভালোবাসা এত গভীর, অথচ সে ছেলেটাকে কোনোদিন চোখেই দেখেনি—কেমন সেই ছেলে? এমন একজন মানুষকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে অনন্যার মনেও জেগে উঠল।
অন্যদিকে আকাশ প্রায়ই মেঘকে বলত,—
চলো না মেঘ, আমরা একদিন দেখা করি। সামনাসামনি বসে একটু কফি খাব। তোমার হাতটা ধরে তোমার সঙ্গে কথা বলব।
কথাগুলো শুনলেই মেঘের বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন যেন ছুটতে শুরু করত। ফোনে আকাশের কণ্ঠ শুনেই যেখানে তার হার্টবিট এত দ্রুত বেড়ে যায়, সেখানে মানুষটার সামনে বসলে কী হবে—ভাবতেই তার শরীর কেঁপে উঠত।
মেঘ মনে মনে সে ভাবত,
‘ফোনে কথা বললেই যদি বুকের ভেতর এমন ঝড় ওঠে, সামনে বসলে তো হয়তো হার্ট অ্যাটাকই হয়ে যাবে!’
তাই প্রতিবার আকাশ দেখা করার কথা বললে মেঘ লাজুক কণ্ঠে শুধু বলত, —
এখন না... সময় হোক, তখন দেখা করব।
কিন্তু মেঘ জানত না, তার এই অপেক্ষার আড়ালেই কেউ একজন নিঃশব্দে তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতার দরজা খুলে ফেলেছে।
একদিন মেঘ তার বাটন মোবাইলটা চার্জে লাগিয়ে হোস্টেলের রুমের বাইরে একটু হাঁটতে বেরিয়েছিল। সেই সুযোগটাকেই কাজে লাগাল অনন্যা। কৌশলে মেঘের মোবাইলটা চুরি করে নিল সে। মেঘ কিছুই বুঝতে পারল না। আর আকাশও জানল না যে ওপাশে যার সঙ্গে সে কথা বলছে, সে আর মেঘ রইলো না, অন্য আরেকজন অনণ্যা।
সেদিন থেকে আকাশ কথা বলতে শুরু করল অনন্যার সঙ্গে—মেঘ ভেবে।
প্রথমদিকে সবকিছু স্বাভাবিকই মনে হচ্ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে আকাশের মনে সন্দেহ জন্মাতে লাগল। মেঘের কথা বলার ধরন, কিছু কিছু উত্তর—কোথাও যেন একটা অদৃশ্য অমিল।
একদিন আকাশ সরাসরি বিষয়টা তুলতেই অনন্যা খুব কৌশলে কথাটা ঘুরিয়ে দিল। তখন বলল,
গলায় সমস্যা হয়েছে,
কখনো বলল অপারেশন হয়েছে, তাই কণ্ঠস্বর কিছুটা বদলে গেছে। ভালোবাসায় অন্ধ আকাশও শেষ পর্যন্ত সেই কথাগুলো বিশ্বাস করে নিল।
অন্যদিকে সত্যিকারের মেঘ তখন মোবাইল হারিয়ে সম্পূর্ণ অসহায়। আকাশের সঙ্গে হঠাৎ সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সে যেন ভেতর থেকে ভেঙে পড়ল। তারপর দিন কেটে গেল, সপ্তাহ কেটে গেল—কিন্তু আকাশের কোন প্রকার যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বা আকাশ হত তার ঠিকানা চিনে না। প্রতিদিন অপেক্ষা করতে করতে একসময় মেঘের মনটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সে পড়াশোনা বন্ধ করে দিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। তার বাবা-মা অবশেষে তাকে বাড়িতে নিয়ে এলেন।
মেঘের সৎ মা ছিল। নিজের সন্তান না থাকায় বাইরে থেকে মেঘকে নিজের সন্তানের মতোই দেখানোর চেষ্টা করলেও তার মনের গভীরে মেঘের প্রতি এক ধরনের হিংসা লুকিয়ে ছিল।
মেয়েটার ভেঙে পড়া অবস্থাটাকেও তিনি মমতা দিয়ে নয়, বিরক্তি আর অবহেলার চোখে দেখতেন। মেঘ তখন প্রায় নিজের মধ্যেই হারিয়ে গিয়েছিল। তাকে একটা ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হতো। কেউ খাবার দিলে খেত, না দিলে চুপচাপ বসে থাকত। জানালার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তার কাছে দিন-রাতের কোনো পার্থক্য ছিল না। শুধু একটা প্রশ্ন বারবার তার বুকের মধ্যে কাঁটার মতো বিঁধে থাকত—আকাশ কোথায়?
অথচ সেই সময় আকাশ প্রতিদিন যার সঙ্গে কথা বলছে, যার কণ্ঠ শুনে নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে অনুভব করছে, সে আসলে মেঘ নয়—অনন্যা।
এভাবেই সময় এগিয়ে যেতে লাগল।
একদিন মেঘের মোবাইল থেকে মেঘ সেজে আকাশের সঙ্গে কথা বলছিল অনন্যা। কথার একপর্যায়ে হঠাৎ অনন্যার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল সেই কথাটা, যেটা আকাশ এতদিন ধরে মেঘের মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিল—
—আকাশ, চলো না... আমরা দেখা করি। সামনাসামনি বসে কথা বলব, কফি খাব।
কথাটা শুনে আকাশ যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিঃশ্বাস নিতেই ভুলে গেল। এতদিন যে মেয়েটা প্রতিবার দেখা করার কথা উঠলেই বলত,
‘এখন না, সময় হোক’, সেই মেঘ আজ নিজে থেকেই দেখা করতে চাইছে!
আকাশের চোখে মুহূর্তেই আনন্দের ঝিলিক ফুটে উঠল। বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘ অপেক্ষা যেন এক মুহূর্তে রঙিন হয়ে উঠল। সে আর দেরি না করে উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল,
—সত্যি? তুমি দেখা করবে? বলো, কখন দেখা করবে? কোথায় দেখা করবে?
আকাশ তখনও জানত না—যে সাক্ষাতের জন্য সে এতদিন ধরে অপেক্ষা করেছে, সেই সাক্ষাতের ডাক এসেছে তার সত্যিকারের ভালোবাসার কাছ থেকে নয়, বরং তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতারণার দরজা খুলে দেওয়া একজন মানুষের কাছ থেকে।
গল্পটা কেমন হয়েছে তা সুন্দর করে কমেন্ট করে জানাবেন,, আপনাদের চাওয়া ও আপনাদের চাহিদার উপর নির্ভর করে পরবর্তী পর্ব লিখব।
পরবর্তী পর্বের জন্য এই পেজটি ফলো করে রাখুন।
>>>>>>>>> গল্পের শহরে তুমি আমি >>>>>>>>
চলবে.......