14/04/2024
ট্রাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর নাম আমরা হয়ত অনেকেই শুনে থাকবো। ইতিহাসে খুব প্রসিদ্ধ টাইগ্রিস নদী। এই নদীর একেবারে উত্তর প্রান্তে অবস্থিত সিরিয়ার একটি বিখ্যাত শহর আর রাকাহ। খলিফা হারুন অর রশিদের শাসন আমলের একটি ঘটনা এই শহরকে আবর্তন করে ঘটেছিল।
এক সময় সেখান থেকে খলিফা হারুন অর রশিদের রাজ দরবারে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি এসেছিল ছিল। চিঠির বিষয়বস্তু ছিল, এই শহরের প্রথান বিচারপতি ১ মাস যাবৎ গুরুত্বর অসুস্থ। তাই বিচার কার্য প্রায় স্মিত হয়ে গেছে। এ ব্যপারে খুব তাড়াতাড়ি সমাধানের ব্যবস্থা নিতে মহামান্য খলিফা কে অনুরোধ করা হলো। খলিফার হাতে চিঠিটা পৌঁছামাত্র বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন। চিন্তা করলেন বিষয়টি তো খুবই জরুরী। খলিফা সিদ্ধান্ত নিলেন নতুন বিচারপতি নিয়োগের জন্য। সবকিছু ঠিকঠাক করে নতুন বিচারপতি নিয়োগের ব্যবস্থা নিলেন খলিফা। তারপর একটি ফেরত চিঠি পাঠালেন আর রাকাহ শহরে। চিঠিতে লেখা ছিল, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই শহরে একজন নতুন বিচারক আসছেন। আশা করা যায়, বিচার ব্যবস্থা স্বাভাবিক স্বাভাবিক হয়ে আসবে। প্রজাদের বিচারের জন্য আর কষ্ট করতে পেতে হবে না।
যেই কথা সেই কাজ। ঠিক এক সপ্তাহের মধ্যেই শহরে নতুন বিচারক এসে কাজে যোগ দিলেন। বিচার কাজ যথারীতি শুরু হয়ে গেল। শুরুতেই শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকেরা একজন অশীতিপর বৃদ্ধাকে আদালতে নিয়ে এলো। জানা যায়, আর রাকাহ শহরের একটি খাবার হোটেল থেকে বৃদ্ধ মহিলা কিছু রুটি আর এক বোতল মধু চুরি করতে গিয়ে হাতে নাতে ধরা পড়ে যায়। শুধু ওই বৃদ্ধ মহিলা নয়, রাজ্যের সব নাগরিক খুব ভালো করে জানতেন, খলিফা হারুন অর রশিদের রাজ্যে চুরি করা কত বড় অপরাধ। যত সৎ লোকই হোক না কেন, চুরির দায়ে আইনগতভাবে অপরাধের হাত কাটা যাবে অথবা জেল জরিমানা হবে। এটাই ছিল রাষ্ট্রীয় আইন ব্যবস্থা। এটা জেনেও মহিলা চুরি করেছে।
বিচারক মহিলার জবানবন্দি গ্রহণ করলেন, বললেন; আপনি কি চুরি করেছেন? মহিলা উত্তর দিলেন; জ্বি, আমি চুরি করেছি। অতপর, বিচারপতি জিজ্ঞেস করলেন; আপনি কি জানেন চুরি করা কত বড় অপরাধ ও অন্যায়। মহিলা উত্তর দিলেন; জ্বি, আমি জানি চুরি করা অনেক বড় অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য পাপ। বিচারপতি আবার জিজ্ঞেস করলেন; আপনি কি জানেন, এই অপরাধের জন্য আপনার কি পরিমাণ শাস্তি হতে পারে? বৃদ্ধা উত্তর দিলেন জ্বি, আমি জানি চুরির দায়ে আমার কি হতে পারে, আর্থিক দণ্ড হতে পারে, জেল হতে পারে, এমনকি আমার হাত কাটা যেতে পারে।
বিচারপতি আবার জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে এসব জেনে শুনেও আপনি কেন চুরি করেছেন? মহিলা অবলীলায় উত্তর দিলেন; মহামান্য আমি গত সাতদিন ধরে কিছুই খাইনি, পুরোপুরি অভুক্ত। শুধু আমি নই, আমার সাথে আমার দুই এতিম নাতিও না খেয়ে আছে। তাদের পেটে কোন দানাপানি নেই। তাই পেটের ক্ষুদার যন্ত্রণা সইতে না পেরে বাধ্য হয়ে আমি চুরি করেছি। আসলে আমি কোন চোর নই। আমার আর কোন উপায় ছিল না বিধায় চুরির মত জঘণ্য কাজ করেছি।
বিচারক বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে বললেন; আগামীকাল নগর প্রধান, খাদ্য গুদাম প্রধান, শরিয়া প্রধান, পুলিশ বাহিনীর প্রধানসহ সমাজহিতৈষী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে আদালতে উপস্থিত থাকতে বলা হলো। সবার সামনে যথাসময়ে বিচারের রায় দেয়া হবে।
বিচারকের নির্দেশ পেয়ে পরদিন সকালে সবাই আদালতে উপস্থিত হলো। রায় শুনার জন্য সবাই উদগ্রীব হয়ে রয়েছেন। বিচারক রীতি অনুযায়ী পিনপতন নিরাপত্তার মধ্যে রায় ঘোষণা করলেন। ঘোষণা হল, চুরির অপরাধ প্রমাণ হওয়ায় মোট ৫০ টি চাবুক ১০০ দিনার রৌপ্য মুদ্রা জরিমানা আর অনাদায়ে এক বছরের কারাদণ্ড ধার্য করা হলো।
চুরি করা বৃদ্ধা কোনো প্রতারণা ও মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে অকপটে সত্য স্বীকার করেছিলেন। সত্যের শিখাই উদ্ভাসিত হওয়ায়, তার জন্য হাত কাটার মত কঠিন শাস্তির রায় মওকুফ হলো কিন্তু ৫০টি চাবুক মারার নির্দেশ দেওয়া হলো।
বিচারপ্রতি রায় দেওয়ার পর সেন্ট্রিকে ডেকে পাঠালেন এবং তাকে চাবুক আনতে নির্দেশ দিলেন। বিচারপতির আসন থেকে তিনি নিচে নেমে এলেন। অতঃপর বৃদ্ধ মহিলার পাশে এসে দাঁড়ালেন। সেন্ট্রিকে বললেন; যে শহরে একজন ক্ষুধাতুর বৃদ্ধ মহিলা সাত দিন অনশনে থেকে ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর হয়ে খাবারের দোকান থেকে খাবার চুরি করতে বাধ্য হয়, সেখানে সবচেয়ে বড় অপরাধী সে দেশের খলিফা বা সে দেশের শাসনকর্তা। বিচারক বললেন; খলিফার প্রতিনিধি হয়ে যেহেতু আমি বিচার করতে এসেছি তাই এর সম্পূর্ণ দায়ভার আমার ওপর বর্তায়। আমি ক্ষমা প্রার্থী। আমার ব্যর্থতায় এর জন্য প্রধানত দায়ী।
তাই বিচারের রায়ে দেয়া ৫০টি চাবুকের ২০টি আগে আমার হাতে মারা হোক। আর এটাই আদালতের নির্দেশ। আদেশ যেন সঠিকভাবে পালন করা হয়। বিচারক হিসাবে চাবুক মারতে আমার উপর যেন বিন্দুমাত্র করুণা প্রদর্শন বা দয়া না দেখানো হয়।
বিচারক নির্দ্ধিধায় নিজের হাত দুটি প্রসারিত করে দিলেন। দুহাতে পরপর ২০টি চাবুক মারা হলো। চাবুকের কঠিন আঘাতে বিচারকের হাত থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হতে লাগলো। অনন্যোপায় হয়ে বিচরক পকেট থেকে একটি রুমাল বের করলেন। বিচারকের এ অবস্থা দেখে কষ্ট সহ্য করতে না পেরে একজন সেই রুমাল দিয়ে বিচারকের হাতে ব্যান্ডেজ করার জন্য উদ্যত হলে, বিচারক তাকে বারণ করলেন। এরপর বিচারক বললেন, যে শহরে নগর প্রধান, খাদ্য গুদাম প্রধানসহ অন্যান্য সমাজহিতৈষী একজন অভাবগ্রস্ত মহিলার ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতে পারে না, তারাও এই চুরির জন্য সমানভাবে অপরাধী। তাই বাকি ৩০টি চাবুকের আঘাত সমানভাবে তাদেরকে মারা হোক। এভাবে একে একে সবাইকে সমানভাবে ৩০টি চাবুক মারা হলো। তারপর বিচারক নিজ পকেট থেকে বের করা রুমালের উপর ৫০ টি রোপ্যমুদ্রা রাখলেন।
তারপর উপস্থিত সবাইকে ডেকে বললেন; যে সমাজ একজন বয়স্ক অশীতিপর বৃদ্ধ মহিলাকে ক্ষুধার তাড়নায় চোর বানিয়ে দেয়, যে ঘরে পিতৃ-মাতৃহীন এতিম শিশু দিনের পর দিন উপবাস থাকে, সে সমাজে বসবাসকারী সব নাগরিক অপরাধী। সুতারাং এখানে যারা উপস্থিত আছেন সবাইকে ১০ দিনার করে রৌপ্য মুদ্রা জরিমানা করা হলো। জরিমানা অর্থের পরিমাণ হল ৫০০ দিনার। এই ৫০০ দিনার রৌপ্য মুদ্রা থেকে ১০০ রোপ্য মুদ্রা জরিমানা বাবদ রেখে দেওয়া হল। বাকি ৪০০ মুদ্রা থেকে ২০টি চুরি হয়ে যাওয়া দোকানের মালিককে দেয়া হলো। আর বাকি ৩৮০ টি মুদ্রা বৃদ্ধ মহিলাকে দেওয়া হলো।
বৃদ্ধ মহিলাকে বিচারক বললেন, এগুলো আপনার ভরণপোষণের জন্য দেওয়া হলো। এতিম শিশুদের নিয়ে আপনি সংসার চালাবেন। আর আগামী মাসে আপনি বাগদাদে খলিফা হারুন অর রশিদের রাজ দরবারে আসবেন।
বিচারকের কথামতো ঠিক এক মাস পর বৃদ্ধ মহিলা খলিফার রাজদরবারে গিয়ে হাজির হলেন। দেখলেন, খলিফার আসনে বসা লোকটিকে যেন খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। তারপর ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে খলিফার আসনের দিকে গেলেন। খুব কাছে গিয়ে মহিলা বুঝতে পারলেন, লোকটি অন্য কেউ নন, তিনি তো সেদিনের সেই বিচারক যিনি তার চুরির অভিযোগে বিচারের রায় দিয়েছিলেন।
খলিফা খিলাফতে আসন থেকে নেমে এসে বললেন, আপনাকে আর আপনার এতিম দুই নাতিকে উপোস রাখার জন্য সেদিন বিচারক হিসেবে আমি খলিফা নিজেই ক্ষমা চেয়েছিলাম। আমি নিজেই খলিফা হিসেবে সেদিন বিচারকের ভুমিকা পালন করেছিলাম।
আজ রাজদরবারে ডেকে এনেছি প্রজা অধিকার সমুন্নত করতে না পারা একজন অধম খলিফাকে ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য। আপনি ক্ষমা করে দেবেন এটাই আমার প্রত্যাশা। আমি একজন মুসলিম শাসক, আর আপনি আমার রাজ্যের একজন নাগরিক আপনি আমাকে ক্ষমা মার্জনা করুন মা।