14/08/2026
এবং সখী ও পাখি 💕
গতকাল আবার প্রেমের কাহিনির সান্নিধ্যে দিনটা কাটলো। এই সময়ের আমার এক অত্যন্ত প্রিয় লেখক সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা দুটি উপন্যাসিকা নিয়ে এই বই। এর মধ্যে একটি উপন্যাস আগেও একটি ওয়েবসাইটে পড়েছিলাম। গতকাল আবার পড়লাম সেই একই কাহিনি। আবার সেই পুরোনো অনুভূতি ফিরে এলো। এর পাশে অন্য কাহিনিটি মন প্রসন্ন করলো। দুটি উপন্যাসিকার বিষয় প্রেম হলেও কাহিনির অন্তিম অংশটি ভিন্ন। তাই বলা যায় দু রকমের প্রেমের কাহিনি এই বইতে পাওয়া যাবে। একটানা মাখো মাখো প্রেমের কাহিনি নয় এগুলি। এই সুন্দর বইটা নিয়ে সেইরকম পোস্ট দেখিনা। অথচ বইয়ের দুটি কাহিনি কি সুন্দর। লেখকের লেখা দীপকাকু সিরিজ ছাড়াও আরও কিছু উপন্যাস পড়েছি ও মুগ্ধ হয়েছি। মানুষের মনের জটিল সম্পর্কের সমীকরণের কথা উনি অনায়াসে ব্যক্ত করেন নিজের লেখনীর দ্বারা। তাই এরকম উপন্যাস পড়তে ভালো লাগে। পরের অনুচ্ছেদে দুটি কাহিনির বিষয় নিয়ে অল্প আলোচনা করলাম, কেউ চাইলে সেই অংশটি এড়িয়ে যেতে পারেন।
❤️ এই গল্পের প্রধান চরিত্র সুজয় ও উদিতা। সুজয় গ্রামের ছেলে, কলকাতায় এসে পিএইচডি করছে সাথে মাস্টারি করে কোচিং সেন্টারে। আর উদিতা হলো ইতিহাস অনার্সের ছাত্রী। উদিতা দেখতে খুব সুন্দরী হওয়ার কারণে পড়ানোর কিছুদিনের মধ্যে সুজয়ের ওকে ভালো লাগে। উদিতাও একইভাবে তার ভালো লাগার কথা জানায়। এদিকে সুজয় বিয়ের কথা তুললে উদিতা জানায় সে বিবাহিত। আট মাস আগে তার গোপনে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে হয়েছে তার বাবার কর্মক্ষেত্রের এক অফিসার বেদান্তের সাথে। একটা চরম বিপদের মুখে পড়ে এই নামমাত্র বিয়ে করতে হয়েছিল তখন। বেদান্ত অনাথ, তাই সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার জন্যে সে একটু সময় চেয়ে নেয় উদিতার কাছে, সাথে উদিতার সব খরচা দেয়, কিন্তু একসাথে থাকেনি এখনও দু'জনে। এদিকে উদিতা ও সুজয় একে অপরের প্রেমে পড়েছে। এভাবে দুজনের প্রেমের মাঝে বেদান্তর আবির্ভাব হয়। আইনত উদিতা বেদান্তের স্ত্রী কিন্তু উদিতা সুজয়ের প্রেমে পাগল। দুই পুরুষের জোরালো দাবী উদিতার প্রতি। কোনদিকে যাবে এই তিনজনের সম্পর্কের পরিণতি? সুজয় ও বেদান্তের মধ্যে কাকে বেছে নেবে উদিতা?
❤️ উত্তরবঙ্গের চটকপুরে ঘুরতে এসেছে ইভানা ও তার মা দিতি। ইভানা এখন মাস্টার্স করছে। কয়েক মাস আগেই ইভানার বাবা মারা গেছে। তারপর থেকে তার মা মনমরা হয়ে রয়েছে। মায়ের সেই কষ্ট লাঘব করার জন্যেই এখানে আসে দুজনে। সেখানেই একদিন ওয়াচটাওয়ারে তাদের দেখা হয়ে যায় এই সময়ের সিরিয়াল জগতের এক পরিচিত মুখ সুগত বাবুর সাথে, যিনি তার স্ত্রীর সাথে এসেছেন। কথায় কথায় ইভানা জানতে পারে এই সুগত বাবু তার মায়ের এক সময়ের পরিচিত। একই কলেজে পড়তেন দু'জন। সুগতর সাথে দেখা হওয়ার পরে ইভানার মা দিতি হারিয়ে যায় সুগত'র সাথে কাটানো অতীতের সেই দিন গুলোতে। যেখানে তাদের প্রেম এমনকি বিয়ে ঠিক হয়ে গেছিল দিতির বাবার অমতে। তারা ঠিক করেছিলো বিয়ে করবে দিতির বাড়ির কাউকে না জানিয়ে রেজিস্ট্রি করে। তাহলে সেই বিয়ে ভাঙার কারণ কী? কেনো তাদের প্রেম সফল হয় নি? পাহাড়ের রহস্যময় প্রকৃতির মাঝেই নানা প্রশ্ন এসে পড়ে ইভানার সামনে। সে কী সেই উত্তর বের করতে পারবে?
দুটি কাহিনির মধ্যে লেখক প্রেমের কিছু ভাগ দেখিয়েছেন। এর পাশে এসেছে সম্পর্কের উপরে বিশ্বাসের কথা। প্রেম করা সোজা কিন্তু তা আজীবন পালন করা সোজা নয়। প্রেমের পথে আসে নানা বাধা বিপত্তি। আর যারা সেই বাধা বিপত্তি কাটিয়ে এগিয়ে চলে তাদের প্রেম হয় সফল। প্রথম কাহিনির মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্কের মধ্যে বিশ্বাসের কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পুরো কাহিনি জুড়ে উদিতা, সুজয় ও বেদান্তের মধ্যেকার বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের বিষয়গুলি ভালো লেগেছে। লেখক নিদারুণভাবে প্রত্যেক চরিত্র, তাদের বৈশিষ্ট্য ও মধ্যেকার সম্পর্কের রসায়নগুলি দেখিয়েছেন। কাহিনি টানটান উত্তেজনাপূর্ণ, লেখকের লিখনশৈলী তারিফ করার মতোন। আর কাহিনির সমাপ্তি একেবারে আমার মনের মতোন হয়েছে। যে কারণে কাহিনিটি প্রিয় কাহিনির মধ্যে যুক্ত হয়ে গেলো। এই কাহিনিতে নারীই পবিত্র, নারীই পাপী। এবারে কেনো একথা বললাম তা জানতে গেলে উপন্যাসিকাটি পড়ে ফেলুন।
দ্বিতীয় কাহিনি পড়তে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা ও চটকপুরের প্রাকৃতিক দৃশ্যের বিবরণ খুব ভালো লেগেছে। উপন্যাসের মাধ্যমে মানসভ্রমন হয়ে যাবে ঐ জায়গার। মা ও মেয়ের সম্পর্ককে এখানে দুই বন্ধুর মতোন। সাথে এখানে বিয়ে করার আগে যে মেডিকেল টেস্ট করানো উচিত সেটাও দেখিয়েছেন লেখক, যা একান্তই প্রয়োজন। উপন্যাসের ধারাবাহিকতা খুব সুন্দর, একের পর এক ঘটনাগুলি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। শেষে ইভানার মনের দোলাচল ও সিদ্ধান্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ এই উপন্যাসের। পুরো উপন্যাসে এক অজানা পাখির ডাকে ইভানার মনে প্রেম প্রেম ভাব এসেছে। ইভানা কি সত্যি এবারে প্রেমে পড়বে? এই উপন্যাসের শেষটা অন্যরকমের হবে ভেবেছিলাম। তবে এ কথা মানতে হয় যেখানে পাঠকের ভাবনা শেষ হয় সেখান থেকেই লেখকের ভাবনা শুরু হয়। তাই শেষ অব্দি ইভানার সিদ্ধান্ত সঠিক মনে হয়। দুটি উপন্যাসিকার মধ্যেই নারীর মনের কথা প্রাধান্য পেয়েছে। দুদিক দিয়ে দু'জন নারী একেবারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমার মতে। তাই একথা অনায়াসে বলা যায় একটা ভালো বইয়ের সাথে গতকাল সময় কাটলো। বইটির পাতা ও বাঁধাই ভালো, বানান ভুল সেভাবে চোখে পড়েনি।
এই পাঠ অনুভূতি সম্পূর্ণ ভাবে আমার ব্যক্তিগত মতামত, অন্যের সাথে তা নাও মিলতে পারে 🙏
লেখা ও ছবি কৃতজ্ঞতা - সম্রাট মণ্ডল
__________________________________
এবং সখী ও পাখি 💕
সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়