14/12/2023
অটোতে বসে আছি। আমার পাশে এক মধ্যবয়স্ক হুজুর বসে আছেন। কিছুদূর অটো যাওয়ার পরে একটি গার্মেন্টসের সামনে থেকে একজন পোশাক শ্রমিক উঠলেন অটোতে। তার হাতে দুইটা ডিম। হুজুর ওই ভদ্রলোকে জিজ্ঞেস করলেন,
“ডিম কত নিলো ভাই?”
“কিনি নাই। অফিস থেকে টিফিনে সিদ্ধ ডিম দেয়। বাসায় পোলা মাইয়া আছে ওদের জন্য নিয়া যাইতেছি।”
“ওহ্। বাসা কোথায় আপনার?”
“এইতো সামনেই।”
“আর গ্রামের বাড়ি কোথায়?”
“রংপুর।”
“কয় বছর ধরে চাকরি করেন?”
“৫/৬ বছর।”
হুজুর এইবার একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন.
“জিনিস-পত্রের যে দাম। শুধু চাকরি করে লাভ নাই ভাই। এর পাশাপাশি অন্যকিছু করার চেষ্টা করেন।”
“অন্য কী করবো?”
“আপনি চাইলে প্রডাক্ট সেল করতে পারেন। আমি এক্সিলেন্ট কম্পানিতে কাজ করি। চৌরাস্তায় আমাদের অফিস। আপনি চাইলে ছুটির দিনে কাজ করতে পারবেন। আপনার সাপ্তাহিক ছুটি কবে?”
হুজুরের কাজের অফার দেওয়ার কথা শুনে অটোর সামনে ড্রাইভারের সিটের পাশে বসা লোকটাও কৌতূহলী দৃষ্টিতে পিছন দিকে তাকিয়ে হুজুরের কথা শুনছেন।
“শুক্রবার।”
“আপনি চাইলে প্রতি সপ্তাহের ছুটির দিনটাকে কাজে লাগাইয়া অনেক টাকা ইনকাম করতে পারবেন। আমি কিন্তু মাদ্রাসায় পড়াই। মাদ্রাসায় পড়ানোর পাশাপাশি ১০ বছর ধরে এই কাজ করতেছি।”
ইতোমধ্যে পোশাক শ্রমিকটির গন্তব্যে এসে পড়েছে অটো। তিনি অটো থামাতে বললেন। হুজুর তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আমার নাম্বারটা রাখেন। শুক্রবারে আমাদের অফিসে আইসেন।”
একে অপরের নাম এবং নম্বর বিনিময় করার পরে ভদ্রলোক চলে গেলেন। অটো আবার চলতে শুরু করলো।
এতক্ষণ আমি চুপচাপ বসে বসে তাদের কথোপকথন শুনছিলাম। এবার হুজুরকে জিজ্ঞেস করলাম,
“কিসের কাজ করেন আপনি?”
তিনি বললেন,
“এক্সিলেন্টে।”
“সেটা তো বুঝছি। মানে কাজটা বা কী ধরনের প্রডাক্ট সেল করেন আপনারা?”
“সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত যা যা লাগে সবই আছে আমাদের কাছে।”
“বাহ্। ভালো।”
হুজুর এবার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,
“আপনার বাসা কোথায়?”
“সামনেই।”
“সামনে কোথায়?”
“বাইপাসের একটু আগে।”
“কী করেন আপনি?”
“স্টুডেন্ট।”
“কিসে পড়েন?”
“অনার্স থার্ড ইয়ারে।”
“এর পাশাপাশি কিছু করেন না?”
“ফ্রিল্যান্সিং করি।”
“এতে কি চলে যায়?”
“হ্যাঁ।”
“ব্যাংক ব্যালেন্স কিছু করতে পেরেছেন?”
“এখনো পারি নাই। তবে আমি আশাবাদী একদিন সব হবে।”
“পরিবারের সাথে থাকেন?”
“হ্যাঁ।”
“বাবা কী করেন?”
“জব করে।”
“বাবাকে কবে কাজ থেকে মুক্তি দিতে পারবেন?”
আমি বুঝতে পারছি, আমার কোনো একটা দুর্বল পয়েন্ট ধরে হুজুর আমাকে জব অফার করবেন। আমি বললাম,
“জানি না। আল্লাহ্ জানে।”
“ফ্রিল্যান্সিং এর পাশাপাশি আরো কিছু করলে জীবনটা সহজ হয়ে যাবে না?”
“তা ঠিক। কিন্তু সময় নাই।”
“কী এমন কাজ করেন যে সময় নাই! সপ্তাহে একদিন সময় বের করতে পারবেন না?”
“না।”
“ফ্রিল্যান্সিং করে কি আপনার জীবন কাটবে? ফ্রিল্যান্সিং এ বেশির ভাগ মানুষই সফল হতে পারে না। এর পাশাপাশি আপনার যদি এক্সট্রা ইনকাম থাকে ভালো না?”
“হ্যাঁ ভালো। কিন্তু একসাথে দশ কাজ করতে গেলে দেখা যাবে কোনো কাজই ঠিক মতো হবে না। আপনি তো দশ বছর ধরে এই কাজ করেন। এই কাজ করে আপনি কী কী করেছেন শুনি একটু?”
আমার উত্তরগুলো তার মন মতো না হওয়াতে হুজুর যেন কিছুটা বিরক্ত হলেন আমার উপরে। বললেন,
“এত কথার তো দরকার নাই। একদিন আসেন আমাদের অফিসে। ভালো লাগলে করবেন, না লাগলে নাই। আমার নাম্বারটা রাখেন।”
“নাম্বার লাগবে না। চৌরাস্তা না আপনাদের অফিস? সময় কইরা যামুনে একদিন।”
“শুধু গেলে তো হবে না। ফোন দিয়ে যেতে হবে।”
“এটা তাইলে কেমন অফিস যে আগে থেকে ফোন দিয়ে যেতে হবে!”
হুজুর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
“বেশি বোঝা লোকজন, জীবনে উন্নতি করতে পারে না। বয়স তো কম হয় নাই, অনেক দেখছি।”
আমি বললাম,
“কিছু মনে কইরেন না হুজুর। কম বোঝা লোকজন নিজে তো বাঁশ খায়-ই, সাথে আরো দশজনরে নিয়া বাঁশ খায়। আপনি যে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং করতেছেন, এটা কিন্তু আমি প্রথমেই বুঝছি। আর আপনাদের কম্পানি যে MLM কম্পানি এটাও আমি জানি। সবই ডেসটিনি, SPC এর ভিন্নরূপ। সবাইরে সব বুঝ দিতে আইসেন না।”
হুজুর কিছুটা ব্যর্থ সৈনিকের মতো বলল,
“মানুষের ভালো চাইতে নাই।”
আমি আমার গন্তব্যে এসে নেমে গেলাম। অটো আবার আগের মতো ছুটে গেল আমাকে অতিক্রম করে। মনে মনে বললাম, যেই দেশে লাখ লাখ বেকার চাকরি পায় না, সেখানে অপরিচিত কেউ যদি সেধে সেধে চাকরির অফার করে তাহলে অবশ্যই বুঝতে হবে যে এখানে কোনো না কোনো ঝামেলা আছে।
#সত্য_ঘটনা
সেধে সেধে জব অফার
©অংকুর রায় অনিক