18/03/2022
রামাদানের খুব বেশি দেরি নেই। দরজায় কড়া নেড়ে যেনো বলছে, আসছি তাকওয়া অর্জনের ট্রেনিং দিতে। অথচ রামাদানের কয়েকদিন আগেই শুরু হয়ে যায় 'শব ই বরাত' নিয়ে বাড়াবাড়ি আর ছাড়াছাড়ির মারামারি!
অথচ এই সময়টা ছিলো রামাদানের প্রস্তুতি নেয়ার। ইসলাম ভারসাম্যতার দ্বীন এবং এর সকল শিক্ষাই প্রান্তিকতা মুক্ত সহজ পথের দিক নির্দেশ করে। শবে বরাতের ব্যপারে সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান হলোঃ এই রাতের ফযীলত বিভিন্ন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। সম্মিলিত কোন রূপ না দিয়ে এবং এই রাত উদযাপনের বিশেষ কোন পন্থা উদ্ভাবন না করে বেশি ইবাদত করাও নির্ভরযোগ্য রেওয়াত দ্বারা প্রমাণিত। এই রাতকে অন্য সব সাধারণ রাতের মতো মনে করা এবং এই রাতের ফযীলতের ব্যাপারে যত হাদীস এসেছে, তার সবগুলোকে মওযু বা যয়ীফ মনে করাও ভুল। অনুরূপভাবে এই রাতকে শবে কদরের মত বা তার চেয়েও অধিক ফযীলতপূর্ণ মনে করাও ভিত্তিহীন ধারণা।
অনির্ভরযোগ্য বিভিন্ন বই-পুস্তকে এই রাত্রির সালাতের যেসব নির্দিষ্ট নিয়ম - কানুন লেখা আছে অর্থাৎ এত রাকআত হতে হবে, প্রতি রাকআতে নির্দিষ্ট সূরা এতবার পড়তে হবে - এগুলো ভিত্তিহীন। এগুলো মানুষের বানানো মনগড়া পদ্ধতি। বরং এই রাতে আমলের সঠিক পদ্ধতি হলো, নফল সালাতের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী দুই রাকআত করে যত রাকআত সম্ভব হয় পড়তে থাকা। কুরআনুল কারীম তিলাওয়াত করা, দরূদ শরীফ পাঠ পড়া, ইস্তিগফার করা, নিজের ও সকলের জন্য দুআ করা এবং কিছুটা ঘুমের প্রয়োজন হলে ঘুমানো। এমন যেনো না হয় যে, সারা রাতের দীর্ঘ ইবাদতের ক্লান্তিতে ফজরের নামায জামাআতের সাথে পড়ার জন্য উঠা গেলো না! বরং এর চেয়ে সারা রাত ঘুমিয়ে থাকাই তাঁর জন্য ভালো ছিলো...
তবে যে এই রাতের সুযোগকে আমলের জন্য কাজে লাগাতে চায় তাঁর জন্য ঘুমানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এই রাতের নফল আমলসমূহ হবে সম্পূর্ন একাকী। মহান রবের সাথে একান্তভাবে মিলিত হওয়ার জন্যই এই রাত। নিজের সকল গুণাহের কথা অকপটে স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে নেয়ার জন্য একাকিত্বের চেয়ে সহজ কোনো পথ নেই। দুফোঁটা চোখের জল যদি রবের দরবারে কবুল হয়ে যায়, তবে সেই বান্দার জন্য আর কি চাই? তাই নফল আমলের জন্য দলে দলে মসজিদে এসে সমবেত হওয়ার চেয়ে ঘরের এক কোণে নিজেকে রবের কাছে সপে দিয়ে অনুতপ্ত হওয়া। অথচ এই রাতকে আমরা আড্ডার জন্য নির্ধারিত করে কত বড় ভুল করি ভাবুন তো!
তবে কোন আহবান ও ঘোষণা ছাড়া এমনিই কিছু লোক যদি মসজিদে এসে যায়, তবে সকলের জন্য আবশ্যক হলো, প্রত্যেকে নিজ নিজ আমলে মশগুল থাকবে, একে অন্যের আমলের ব্যাঘাত সৃষ্টির কারণ হবে না। এক সময় মসজিদগুলো তো ছিলো আমলের জন্য, আর আজ চাকচিক্যতায় জর্জরিত! অথচ আমল শূন্য।
হালুয়া রুটি এই রাতে খাওয়া হারাম না, আবার রুসম বানিয়ে হালুয়া রুটি খাওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়াও বুদ্ধিমানের কাজ না। এই রাতে হালুয়া রুটি বানাতে বানাতে আমাদের মা বোনেরা এতটাই কষ্ট করেন যে, নফল ইবাদতের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হোন বা নফল ইবাদত করেন তীব্র কষ্ট নিয়ে। এই দিন বরং তাদেরকে সকল কাজ থেকে বিরত রেখে ইবাদতের সুযোগ করে দিন৷ হালুয়া রুটি না হয় আরেকদিন বন্টন করলেন গরীব দুঃখিদের মাঝে, অসহায় প্রতিবেশীদের ঘরে। অনেক স্থানে বিভিন্ন পশুপাখি সদৃশ বড় বড় রুটি তৈরি করার ধুম পড়ে যায়! আল্লাহ পাক এসকল ভুল ও গুণাহের কাজ থেকে হেফাজত করুন।
শাবানের গোটা মাসে রোযা রাখার কথা বহু হাদীসে পাওয়া যায়। অর্থাৎ ১ শাবান থেকে ২৭ শাবান পর্যন্ত রোযা রাখার যথেষ্ট ফযীলত রয়েছে। শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোযা রাখার কথা সহীহ হাদীসে এসেছে। লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হচ্ছে যে, শাবানের এই ১৫ তারিখটি তো ‘আইয়ামে বীয’ এর অন্তর্ভূক্ত। আর নবীজী প্রতি চন্দ্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে আইয়ামে বীয এর রোযা রাখতেন। তাই ১৫ শাবানকে বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে বরং শব ই বরাতের পরদিন আইয়ামে বীয এর রোজা রাখা যেতে পারে। সেফ জোনে আমল করাই সবচেয়ে বেস্ট।
এমন পবিত্র এক রজনীতে পটকাবাজি করা অনেক বড় গুণাহের কারণ। এসব বোমাবাজির সাথে বিধর্মীদের কালচারের মিল পাওয়া যায়। পটকা-বোমাবাজি করার কারণে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের কষ্টের কারণ হয়, অনেক স্থানে আগুণ লাগার মত ভয়াবহ দূর্ঘটনা ঘটে।
আল্লাহ পাক আমাদের ক্ষমা করুন। সুযোগকে কাজে লাগানোর তৌফিক দিন। দ্বীনের বিভিন্ন ইখতেলাফি বিষয়ে মধ্যমপন্থা অবলম্বনের প্রতি ঝোঁক বাড়িয়ে দেন, আমিন।