01/09/2017
কুরবানীর পশু ও পশু যবেহ
কুরবানীর পশু
১. কুরবানীর পশু উৎসর্গ করা হবে কেবল এক আল্লাহর উদ্দেশ্যে, অন্য করো জন্য নয়, কেননা কুরবানী হচ্ছে ইবাদত। তিনি বলেন :
﴿قُلۡ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحۡيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ١٦٢ لَا شَرِيكَ لَهُۥۖ وَبِذَٰلِكَ أُمِرۡتُ وَأَنَا۠ أَوَّلُ ٱلۡمُسۡلِمِينَ ١٦٣ ﴾ [الانعام: ١٦٢، ١٦٣]
“বলুন! আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতি পালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে, তাঁর কোন শরীক নেই, আর আমি এর জন্যই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম। [সূরা আল-আন‘আম : ১৬২-১৬৩]
২. আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে কুরবানীর পশু উৎসর্গ বা যবেহ করা যাবে না, বরং এ প্রকার কাজ শির্ক। এ ব্যাপারে কঠোর শাস্তির বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«لَعَنَ اللَّهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللَّهِ»
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে পশু যবেহ করে আল্লাহ তার উপর লা‘নত করেন। [সহীহ মুসলিম]
৩. এমন পশু দ্বারা কুরবানী দিতে হবে যা শরিয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। সেগুলো হল উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা। এগুলোকে কুরআনের ভাষায় বলা হয় ‘বাহীমাতুল আন‘আম’। যেমন ইরশাদ হয়েছে :
﴿ وَلِكُلِّ أُمَّةٖ جَعَلۡنَا مَنسَكٗا لِّيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِۗ ﴾ [الحج: ٣٤]
‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি; তিনি তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরূপ যে সকল চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর উপর যেন তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করে। [সূরা আল-হাজ্জ: ৩৪]
৪. শরিয়তের দৃষ্টিতে কুরবানীর পশুর বয়সের দিকটা খেয়াল রাখা জরুরী। উট পাঁচ বছরের হতে হবে। গরু বা মহিষ দু বছরের হতে হবে। ছাগল, ভেড়া, দুম্বা হতে হবে এক বছর বয়সের। হাদীসে এসেছে, জাবের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«لَا تَذْبَحُوا إِلَّا مُسِنَّةً إِلَّا أَنْ يَعْسُرَ عَلَيْكُمْ فَتَذْبَحُوا جَذَعَةً مِنْ الضَّأْنِ»
‘তোমরা অবশ্যই মুসিন্না (নির্দিষ্ট বয়সের পশু) কুরবানী করবে। তবে তা তোমাদের জন্য দুষ্কর হলে ছয় মাসের মেষ-শাবক কুরবানী করতে পার।’ [মুসলিম- ১৯৬৩]
৫. গুণগত দিক দিয়ে উত্তম হল কুরবানীর পশু হৃষ্টপুষ্ট, অধিক গোশত সম্পন্ন, নিখুঁত, দেখতে সুন্দর হওয়া। কুরবানীর পশু যাবতীয় দোষ-ত্রুটি মুক্ত হতে হবে। যেমন হাদীসে এসেছে, বারা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত,
«قَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَيَدِي أَقْصَرُ مِنْ يَدِهِ فَقَالَ أَرْبَعٌ لَا يَجُزْنَ الْعَوْرَاءُ الْبَيِّنُ عَوَرُهَا وَالْمَرِيضَةُ الْبَيِّنُ مَرَضُهَا وَالْعَرْجَاءُ الْبَيِّنُ ظَلْعُهَا وَالْكَسِيرَةُ الَّتِي لَا تُنْقِي»
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে দাঁড়ালেন আর আমার হাত তার হাতের চেয়েও ছোট; তারপর বললেন, চার ধরনের পশু, যা দিয়ে কুরবানী জায়েয হবে না। (অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে পরিপূর্ণ হবে না) অন্ধ; যার অন্ধত্ব স্পষ্ট, রোগাক্রান্ত; যার রোগ স্পষ্ট, পঙ্গু; যার পঙ্গুত্ব স্পষ্ট এবং আহত; যার কোনো অংগ ভেংগে গেছে। নাসায়ির বর্ণনায় ‘আহত’ শব্দের স্থলে ‘পাগল’ উল্লেখ আছে। [তিরমিযি-১৫৪৬, নাসায়ি- ৪৩৭১, হাদীসটি সহীহ ]
৬. উট ও গরু-মহিষে সাত ভাগে কুরবানী দেয়া যায়। যেমন হাদীসে এসেছে, জাবের ইবন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«الْبَقَرَةُ عَنْ سَبْعَةٍ وَالْبَدَنَةُ عَنْ سَبْعَةٍ».
“‘উট ও গরু দ্বারা সাত জনের পক্ষ থেকে কুরবানী করা বৈধ।” [ইব্ন মাজাহ- ৩১৩২]
৭. মৃত ব্যক্তির পক্ষ হতে কুরবানী করা জায়েয : প্রকৃতপক্ষে কুরবানীর প্রচলন জীবিত ব্যক্তিদের জন্য। যেমন আমরা দেখি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবাগণ নিজেদের পক্ষে কুরবানী করেছেন। অনেকের ধারণা কুরবানী শুধু মৃত ব্যক্তিদের জন্য করা হবে। এ ধারণা মোটেই ঠিক নয়। তবে মৃত ব্যক্তিদের পক্ষ হতে কুরবানী করা জায়েয আছে। কুরবানী এক প্রকার সদকাহ। আর মৃত ব্যক্তির নামে যেমন সাদাকাহ করা যায় তেমনি তার পক্ষ হতে কুরবানীও দেয়া যায়।
কুরবানীর পশু যবেহ
১. কুরবানীদাতা নিজের কুরবানীর পশু নিজেই যবেহ করবেন, যদি তিনি ভালোভাবে যবেহ করতে পারেন। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে যবেহ করেছেন। আর যবেহ করা আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জনের একটি মাধ্যম। তাই প্রত্যেকের নিজের কুরবানী নিজে যবেহ করার চেষ্টা করা উচিত। ইমাম বুখারী রহ. বলেছেন : ‘আবু মুসা আশআরী রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজের মেয়েদের নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন নিজ হাতে নিজেদের কুরবানীর পশু যবেহ করেন।’ [ফাতহুল বারী ১০/২১]
২. কুরবানীর পশু যবেহ করার দায়িত্ব নিজে না পারলে অন্যকে অর্পণ করা জায়েয আছে। কেননা সহীহ মুসলিমের হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তেষট্টিটি কুরবানীর পশু নিজ হাতে যবেহ করে বাকিগুলো যবেহ করার দায়িত্ব আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে অর্পণ করেছেন। [সহীহ মুসলিম- ১২১৮]
৩. কুরবানীর পশু যবেহ করার সময় তার সাথে সুন্দর আচরণ করতে হবে, তাকে আরাম দিতে হবে। যাতে পশু কষ্ট না পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। হাদীসে এসেছে, শাদ্দাদ ইবন আউস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«ثِنْتَانِ حَفِظْتُهُمَا عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ فَإِذَا قَتَلْتُم فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذَّبْحَ وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهُ فَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهُ»
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দু’টি বিষয় আমি মুখস্থ করেছি, তিনি বলেছেন : আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সকল বিষয়ে সকলের সাথে সুন্দর ও কল্যাণকর আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব তোমরা যখন হত্যা করবে তখন সুন্দরভাবে করবে আর যখন যবেহ করবে তখনও তা সুন্দরভাবে করবে। তোমাদের একজন যেন ছুরি ধারালো করে নেয় এবং যা যবেহ করা হবে তাকে যেন প্রশান্তি দেয়। [সহীহ মুসলিম-১৯৫৫]
৪. যবেহ করার সময় তাকবীর ও বিসমিল্লাহ বলা। যেমন হাদিসে এসেছে, জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত ...
وَأُتِىَ بِكَبْشٍ فَذَبَحَهُ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- بِيَدِهِ وَقَالَ «بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ هَذَا عَنِّى وَعَمَّنْ لَمْ يُضَحِّ مِنْ أُمَّتِى»
“আর তার কাছে একটি দুম্বা আনা হল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে যবেহ করলেন এবং বললেন ‘বিসমিল্লাহ ওয়া আল্লাহু আকবার, হে আল্লাহ! এটা আমার পক্ষ থেকে এবং আমার উম্মতের মাঝে যারা কুরবানী করতে পারেনি তাদের পক্ষ থেকে।” [আবু দাউদ: ২৮১০]
অন্য হাদীসে এসেছে, আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«ضَحَّى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِكَبْشَيْنِ أَمْلَحَيْنِ أَقْرَنَيْنِ ذَبَحَهُمَا بِيَدِهِ وَسَمَّى وَكَبَّرَ وَوَضَعَ رِجْلَهُ عَلَى صِفَاحِهِمَا»
‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি শিংওয়ালা ভেড়া যবেহ করলেন, তখন বিসমিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার বললেন।’ [সহীহ বুখারী]
৫. যবেহ করার সময় যার পক্ষ থেকে কুরবানী করা হচ্ছে তার নাম উল্লেখ করে দো‘আ করা জায়েয আছে। এভাবে বলা, ‘হে আল্লাহ তুমি অমুকের পক্ষ থেকে কবুল করে নাও।’ যেমন হাদীসে এসেছে, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দুম্বা যবেহ করার সময় বললেন :
«بِسْمِ اللهِ، اَللّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنْ مُحَمَّدٍ، وَآلِ مُحَمَّدٍ، وَمِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ»
‘আল্লাহর নামে, হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ ও তার পরিবার-পরিজন এবং তার উম্মতের পক্ষ থেকে কবুল করে নিন।’ [মুসলিম- ১৯৬৭]
৬. ঈদের সালাত আদায় ও খুতবা শেষ হওয়ার পর পশু যবেহ করা। কেননা হাদীসে এসেছে, জুনদুব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«صَلَّى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ النَّحْرِ ثُمَّ خَطَبَ ثُمَّ ذَبَحَ»
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন সালাত আদায় করলেন অতঃপর খুতবা দিলেন তারপর পশু যবেহ করলেন।” [সহীহ আল-বুখারী: ৯৮৫]
কুরবানীর পশুর বয়স
নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
لاتذبحوا إلا مسنة إلا أن يعسرعليكم فتذبحوا جذعة من الضأن (رواه مسلم والنسائي وغيرهم
“তোমরা দুধের দাঁত ভেঙ্গে নতুন দাঁত উঠা (মুসিন্না) পশু ব্যতীত যবেহ কর না। তবে কষ্ট হলে ভেড়ার জাযআ তথা ছয়মাস বয়সের ভেড়া যবেহ করতে পার।” (ছহীহ মুসলিম, নাসায়ী প্রভৃতি)
অত্র হাদীছ থেকে প্রমাণিত হল যে, মুসিন্না তথা উট, গরু, ছাগলের নতুন দাত উঠা পর্যন্ত কুরবানীর জন্য উপযুক্ত হবে না। তবে কষ্টকর হলে ভেড়ার জাযআ বা ছয় মাস বয়সের বাচ্চা যবেহ করা যাবে।
• নিম্নে বয়স ভেদে কুরবানীর জন্য উপযুক্ত পশুর তালিকা দেয়া হল:
উট: পাঁচ বছর বা তদূর্ধ্ব
গরু: দুই বছর বা তদূর্ধ্ব
ছাগল: এক বছর বা তদূর্ধ্ব
ভেড়া: ছয় মাস বা তদূর্ধ্ব
উপরোক্ত হাদীছের উপর ভিত্তি করে ইমাম নাওয়াভী (রহঃ) বলেন: “অত্র হাদীসে সুস্পষ্ট যে, ভেড়া ছাড়া অন্য কোন পশুর জাযআ তথা ছয়মাসের বাচ্চা কুরবানী করা কোন অবস্থাতেই জায়েজ হবে না। কাজী ইয়াজের ভাষ্যমতে এ বপারে সমস্ত উলামা একমত। তবে আমাদের সাথীদের মধ্য হতে আবদারী প্রমুখ আওযাঈ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি উট, গরু, বকরী, ভেড়া সব কিছুর জাযআহ্ দ্বারা কুরবানী হবে বলে মন্তব্য করেছেন। ইহা আত্বা হতেও বর্ণিত। তবে ভেড়ার জাযআ সম্পর্কে আমাদের ও সমস্ত উলামাদের অভিমত এই যে, ইহা কুরবানীতে চলবে- চাই অন্য পশু পাওয়া যাক বা না যাক। তাঁরা ইবনে ওমার ও যুহরী প্রমুখ হতে বর্ণনা করেন যে, তারা বলেছেন: ভেড়ার জাযআও চলবে না। তাদের স্বপক্ষে হাদীছের বাহ্যিক অর্থ দলীল স্বরূপ নেয়া যেতে পারে।
তবে অধিকাংশ বিদ্বান বলেন: হাদীছটির নির্দেশ ভেড়ার জাযআর ক্ষেত্রে মোস্তাহাবের উপর প্রযোজ্য। অর্থাৎ উক্ত হাদীছের ব্যাখ্যা মূলক ভাষা এই হবে, তোমাদের জন্য মুস্তাহাব হল: তোমরা মুসিন্না ব্যতীত অন্য পশু দ্বারা যবেহ করবে না। তবে যদি তা না পাও তবে ভেড়ার জাযআহ যবেহ করবে। এতে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়না যে, ভেড়ার জাযআহ কুরবানী করা নিষিদ্ধ এবং কোন অবস্থায় তা জায়েজ হবেনা। তাছাড়া সমস্ত বিদ্বান এ বপারে একমত যে, উক্ত হাদীসটি ব্যহ্যিক অর্থে নয়। কেননা, অধিকাংশ বিদ্বানের মত হল, ভেড়ার জাযআহ কুরবানী করা জায়েজ চাই অন্য পশু পাক বা না পাক। আর ইবনে উমর ও যুহুরী বলেন, সর্বাবস্থায় তা না জায়েজ চাই অন্য পশু থাকুক আর না থাকুক। তাহলে নিশ্চিতভাবে এটাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, হাদীসটিতে মুসিন্না না পাওয়া গেলে ভেড়ার জাযআ দ্বারা কুরবানী করা মুস্তাহাব অর্থে ধর্তব্য হবে যেমনটি আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।” (শরহ মুসলিম ১৩/ ১১৭)
শুধু আট প্রকার পশু দ্বারা কুরবানী দেয়া বৈধ
আট প্রকার পশু দ্বারা কুরবানী সর্বসম্মতি ক্রমে জায়েজ। তা হল:
(১) ভেড়া বা দুম্বা
(২) ছাগল
(৩) গরু
(৪) উট।
এগুলোর প্রত্যেকটির নর ও মাদি। (আল আনআমঃ ১৪৪ ও ১৪)
ইবনু আব্দুল বার (রহঃ) বলেন:
والذي يضحى به بإجماع المسلمين، الأزواج الثمانية، وهى: الضأن والمعزوالإبل والبقر…. (انظر تفسير القرطبي عند تقسيره للآية: وفديناه بذبح عظيم )
মুসলিমদের ঐকমত্যে আট প্রকার পশু দ্বারা কুরবানী করা যাবে। তা হল: ভেড়া বা দুম্বা, ছাগল, উট,এবং গরু (এ গুলো নর ও মাদি)। তবে ইবনুল মুনযির বলেন, হাসান বিন ছালেহ হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: “নীল গাভী দ্বারা সাতজনের পক্ষ থেকে কুরবানী করা যাবে।” ( তাফসীর কুরতুবী, সূরা সাফ্ফাতের ১০৭ নং আয়াতের তাফসীর)
ইমাম শীরাযী বলেন: চতুষ্পদ জন্তু ছাড়া কুরবানী আদায় হবে না। আর চতুষ্পদ জন্তু হল: উট, গরু, ছাগল ও ভেড়া। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ﴾
“তারা যেন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে ঐ সমস্ত চতুষ্পদ জন্তুর উপর (যবেহ করার সময়) যা আল্লাহ তাদের কে রিজিক হিসাবে প্রদান করেছেন।” (আল আনআমঃ ১৪৪) {দ্রঃ আল মুহাযযা (৮/৩৯২)
গরুর ন্যায় মহিষের যাকাতের উপর কিয়াস করে অনেকে মহিষ দ্বারা কুরবানী জায়েজ বলেছেন। (মিরআত (২/৩৫৩-৫৪) এছাড়া হযরত আসমা (রা:) থেকে ঘোড়া কুরবানী, আবু হোরায়রা (রা:) থেকে মোরগ কুরবানী, হাসান বিন ছালেহ থেকে জংলি গাভী ও হরিণ কুরবানী ইত্যাদি কথাও বর্ণিত হয়েছে। সুবুলুস সালাম (কায়রো থেকে প্রকাশিত) ১৯৮৭, ৪/১৮৫) (যদিও বুখারী -মীরাটঃ ১৩২৮ হি: ) ৮২৮ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আসমা (রা:) এর রেওয়ায়াত ব্যতীত অন্য গুলির বর্ণনা সন্দেহ মুক্ত নয় ) কিন্তু এসবের কোনটি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নাত হিসাবে প্রমাণিত নয়। (দ্রঃ মসায়েলে কুরবানীঃ ৫)
বুখারীর আসমা বর্ণিত হাদীছে ঘোড়া দ্বারা কুরবানী কথা আসেনি বরং সাধারণ যবেহ করার কথা এসেছে। যেমনঃ
عن أسماء قالت: نحرنا فرسا على عهد رسول الله فأكلناه (رواه البخاري برقم ৫৫১০، ومسلم برقم ১৯৪২ والنسائي ৭/২২৭)
আসমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমরা রাসুলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জামানায় একটি ঘোড়া জবহ করে খেয়েছিলাম।” (বুখারী হা/ ৫৫১০, মুসলিম হা/ ১৯৪২, নাসায়ী (৭/২২৭), প্রভৃতি)
মোট কথা: আট প্রকার পশু দ্বারা কুরবানী করা বৈধ। এতে কোন মতবিরোধ নেই এবং এগুলো দ্বারা কুরবানী করা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং ছাহাবাদের থেকেও প্রমাণিত। ঐ আট প্রকার পশু হল: (১) ভেড়া বা দুম্বা (২) ছাগল (৩) গরু (৪) উট। এগুলো নর ও মাদি। অতএব কুরবানী দিতে হলে এগুলো দ্বারাই কুরবানী দেয়া উচিত।
কুরবানীর গোশত
১. কুরবানীর গোশত কুরবানীদাতা ও তার পরিবারের সদস্যরা খেতে পারবে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন :
﴿فَكُلُواْ مِنۡهَا وَأَطۡعِمُواْ ٱلۡبَآئِسَ ٱلۡفَقِيرَ ٢٨ ﴾ [الحج: ٢٨]
‘অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুঃস্থ, অভাবগ্রস্তকে আহার করাও।’ [সূরা আল-হজ্জ: ২৮]
২. উলামায়ে কিরাম বলেছেনঃ কুরবানীর গোশত তিন ভাগ করে একভাগ নিজেরা খাওয়া, এক ভাগ দরিদ্রদের দান করা ও এক ভাগ উপহার হিসেবে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের দান করা মুস্তাহাব।
৩. কুরবানীর গোশত যতদিন ইচ্ছা ততদিন সংরক্ষণ করে খাওয়া যাবে। কুরবানীর গোশত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«كُلُوا وَأَطْعِمُوا وَادَّخِرُوا»
“তোমরা নিজেরা খাও ও অন্যকে আহার করাও এবং সংরক্ষণ কর।” [সহীহ আল-বুখারী : ৫৫৬৯]
৪. কুরবানীর পশুর গোশত, চামড়া, চর্বি বা অন্য কোনো কিছু বিক্রি করা জায়েয নেই। কসাই বা অন্য কাউকে পারিশ্রমিক হিসেবে কুরবানীর গোশত দেওয়া জায়েয নয়। হাদিসে এসেছে :
«وَلَا يُعْطِيَ فِي جِزَارَتِهَا شَيْئًا»
‘আর তা প্রস্তুতকরণে তা থেকে কিছু দেওয়া হবে না।’ [বুখারী -১৭১৬] তবে দান বা উপহার হিসেবে কসাইকে কিছু দিলে তা না-জায়েয হবে না।
কুরবানীর সময়কাল
কুরবানীর শেষ সময় হচ্ছে যিলহজ মাসের তের তারিখের সূর্যাস্তের সাথে সাথে। অতএব কুরবানীর পশু যবেহ করার সময় হলো চার দিন। কুরবানী ঈদের দিন এবং ঈদের পরবর্তী তিনদিন অর্থাৎ যিলহজ মাসের দশ, এগার, বার ও তের তারিখ। এটাই উলামায়ে কেরামের নিকট সর্বোত্তম মত হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে। কারণ, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন
﴿ لِّيَشۡهَدُواْ مَنَٰفِعَ لَهُمۡ وَيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ فِيٓ أَيَّامٖ مَّعۡلُومَٰتٍ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِ﴾ [الحج: ٢٨]
‘যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদের চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিযিক হিসেবে দান করেছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে। [সূরা আল-হাজ্ব : ২৮]
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ বলেন : ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন: ‘এ আয়াতে নির্দিষ্ট দিনগুলো বলতে বুঝায়, কুরবানীর দিন ও তার পরবর্তী তিন দিন।’ [ফাতহুল বারী, ২য় খন্ড, পৃ-৫৬১] অতএব এ দিনগুলো আল্লাহ তা‘আলা কুরবানীর পশু যবেহ করার জন্য নির্ধারণ করেছেন। এ ব্যাপারে জুবাইর ইবন মুত‘ইম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
«كُلُّ أَيَّامِ التَّشْرِيقِ ذَبْحٌ» .
‘আইয়ামে তাশরীকের প্রতিদিন যবেহ করা যায়।’ [মুসনাদ আহমদ- ৪/৮২, হাদীসটি সহীহ]
আর আইয়ামে তাশরীক সম্পর্কে বলা হয়,
أيام التشريق هي اليوم الحادي عشر والثاني عشر والثالث عشر من شهر ذي الحجة
আইয়ামে তাশরীক বলতে এগার, বার ও তের যিলহাজ্জকে বুঝায়। [ فتاوى الإسلام سؤال وجواب] তবে কারো কারো মতে, কুরবানী ঈদের দিন এবং ঈদের পরবর্তী দুই দিন করা যায়।