20/08/2024
ছাত্রনেতাদের ধারণা ছিলো মুজিব মারা গেছেন। তাদের ধারণা ছিলো গ্রেফতারের পর অবশ্যই পাকিস্তান সেনাবাহিনী মুজিবকে হত্যা করবে।
এই অবস্থায় তারা তাজউদ্দীন আহমেদকে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে রাজি ছিলো না। তাদের হিসাব ছিলো পরিস্কার: শেখ মুজিব এর রক্তের কোন আত্মীয়ই এক মাত্র এই পদ পেতে পারে।
এই ছাত্র নেতাদের মাঝে অন্যতম ছিলেন: শেখ মণি, তোফায়েল আহমেদ, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক...প্রমুখ।
তারা শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর কাছে হাজির হলো। সাথে নিয়ে গেলো রব সেরনিয়াবত এর একটা চিঠি এবং শেখ কামালকে। তারা ইন্দিরা গান্ধীকে বুঝাতে সক্ষম হলো...যদি তাজউদ্দীনই প্রবাসী সরকারের নেতৃত্বে থাকে...তাহলে ভারতের স্বার্থ রক্ষা হবে না। এমনকি এমন ও সম্ভবনা আছে... দিনের শেষে বাংলাদেশ একটা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হয়ে যাবে।
ভারত তখন নকশালবাদীদের ক্ষত কাটিয়ে উঠছে। তাই বাংলাদেশ নকশাল রাষ্ট্র হয়ে যাবে...এটা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলো না।
তারা দাবি করলেন ঢালাও ভাবে সবাইকে যুদ্ধের ট্রেনিং না দিয়ে শুধু মাত্র মুজিব ভক্তদেরকে ট্রেনিং দেওয়ার জন্য।
সে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুটমেন্টের সময় খুব একটা বাছ-বিছার ছিলো না। তাই একটা সম্ভবনা ছিলো প্রচুর বাম মতাদর্শে বিশ্বাসী লোকজন সশস্র ট্রেনিং নিচ্ছে।
এটা ভারতের জন্য ভয়ের বিষয় ছিলো।
তো ভারত নিশ্চিত করতে চাচ্ছিলো...এমন একটা বাহিনী তৈরি করা হবে...যারা দেশের ভেতরে ভারত বিরোধী যেকোন মতবাদ বা বামদের মোকাবেলা করবে।
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা "র" এর হাতে এই বাহিনীর যাত্রা শুরু হয়।
এই বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেন জেনারেল উবান।
___________
তাজউদ্দীন এবং মুজিব এর মাঝে সম্পর্কের অবনতি আগে থেকেই ঘটছিলো। এই সম্পর্কের অবনতি চুড়ান্ত আকার ধারণ করে ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালে। ইয়াহিয়ার গোপনে পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করার খবর জানার পর আওয়ামী লীগ নেতাদের মাঝে পরবর্তী করণীয় নিয়ে দুশ্চিন্তা শুরু হয়।
এই অবস্থায় তাজউদ্দীন একটা লিখিত মেসেজ নিয়ে মুজিব এর ৩২ নাম্বার এর বাসায় হাজির হন।
মেসেজ এর বিষয়বস্ত ছিলো:
"পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের উপর অতর্কিত আক্রমণ করেছে..........আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। " (সংক্ষিপ্ত)
মুজিব নিরবে নোট টা পড়লেন...কিন্ত কোন মন্তব্য করলেন না।
- মুজিব ভাই, আপনাকে ঘোষণাটা দিতেই হবে। আপনি ঘোষণাটা দেন। আমরা এটা কপি করে চারদিকে ছড়িয়ে দিব।
- নাহ। এইটা ওরা আমার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করবে।
রাগে-ক্ষোভে-বিস্ময়ে তাজউদ্দীন নির্বাক হয়ে গেলেন। তাজউদ্দীন যখন তীব্র ক্ষোভে বের হয়ে যাচ্ছিলেন.. তখন তার দেখা হয়ে যায় আওয়ামী লীগের সেই সময়ের প্রচার সম্পাদক - আব্দুল মোমেন এর সাথে।
- আরে তাজউদ্দিন ভাই...কই যান..
তাজউদ্দিন পুরো ঘটনা খুলে বলার পর বললেন
- উনি এই সামান্য ঝুঁকি নিতে রাজি হচ্ছেন না...অথচ আমরা....
যুদ্ধের পরেও মুজিব-তাজউদ্দিন এর সম্পর্ক স্বাভাবিক হয় নি। খন্দকার মুশতাক মুক্তযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমেরিকান এম্বেসির সাথে যোগাযোগ ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন।
কিন্ত দেশ স্বাধীন হবার পর তিনি খন্দকার মুশতাককেই কাছে টেনে নেন।
তাজউদ্দিন আহমেদ একা হয়ে যান।
এই একা মানুষটা পুরো ৯ টা মাস কি অস্বাভাবিক সংগ্রাম করে দেশটা স্বাধীন করার অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছিলো। দেশ স্বাধীন হবার পরেও মানুষটা একাই রয়ে গেলেন। তার আক্ষেপ ছিলো
- মুজিব ভাই কখনো জানতেও চাইলো না...কিভাবে কি হলো!
মুজিব কি হীনমন্নতায় ভুগছিলেন? তিনি কি ভয় পাচ্ছিলেন....তাজউদ্দিনের কাছে তিনি স্লান হয়ে যাবেন?
__________
২০ এপ্রিল, ১৯৭১।
মেজর জেনারেল উবান এর জন্য একটা অদ্ভুত দিন।পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কয়েকজন আর্মি অফিসার পালিয়ে ভারতে চলে এসেছে। উদ্দেশ্য বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে যোগ দেওয়া। গত চারদিন ধরে তাদের দিন-রাত জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুরো ব্যাপারটাই দেখা শোনা করছেন উবান। তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হবার পর ভারতীয়দের এর পক্ষ থেকে তাদেরকে ডিব্রিফ করা হয়। এই ডিব্রিফ করেন মেজর সুরাজ সিং যিনি ইনসারজেন্সি এবং কাউন্টার ইনসারজেন্সিতে স্পেশালিস্ট ছিলেন। এই ব্রিফিং এ কয়েকটা বিষয় ক্লিয়ার করা হয়:
১। স্বাধীনতা সংগ্রাম অবশ্যই আওয়ামী লীগের অধীনেই পরিচালিত হতে হবে।
২। আওয়ামী লীগ সরকার দুইটা সম্ভাব্য জায়গা থেকে প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে পারে: মিলিটারি অথবা নক্সাল (বাম মতবাদে বিশ্বাসী) যারা মুক্তিবাহিনীতে।প্রবেশ করে ট্রেনিং নিচ্ছে।
তো এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় ভারত ১০০০০০ লাখ সদস্যের একটা বিশেষ বাহিনী গড়ে তুলতে যাচ্ছে...যার সদস্য হিসেবে শুধু মাত্র আওয়ামী লীগ কর্মীরাই থাকবে।
এটা সেই সেনা সদস্যদের জন্য খুবই আশ্চর্য জনক একটা ব্যাপার ছিলো। জাস্ট রাজনৈতিক ভাবে ভিন্ন ম মতাবলম্বী হবার কারণে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেওয়া মানুষদের মাঝে এই ভেদাভেদ তারা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না।
__________
এই সেনা কর্মকর্তারাই যখন জেনারেল ওসমানির সাথে কলকাতায় দেখা করেন... তখন তারা একটা ভিন্ন গল্প শুনতে পান।
জেনারেল ওসমানির প্লান ছিলো একই সাথে গেরিলা যুদ্ধ এবং নিয়মিত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ৬০,০০০-৮০,০০০ সদস্য বিশিষ্ট মুক্তিবাহিনী ২০০০০-২৫০০০ সদস্যের নিয়মিত বাহিনী। জেনারেল ওসমানির হিসাব ছিলো দীর্ঘ মেয়াদি গেরিলা যুদ্ধে দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে।
পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা সেই সেনা কর্মকর্তারা বুঝতে পারলো জেনারেল ওসমানি ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা "র" এর পরিকল্পনা সম্পর্কে জানে না।
তারা যখন জেনারেল ওসমানিকে "র" এর "মুজিব বাহিনী"র পরিকল্পনা সম্পর্কে জানালো..তখন ওসমানী সাথে সাথে তা তাজউদ্দিনকে জানান।
তাজউদ্দিন সাথে সাথে ভারতীয় কতৃপক্ষের সাথে দেখা করেন। তিনি দাবি করেন- এই মুজিব বাহিনীকে তার কমান্ডে দিতে হবে।
কিন্ত ভারতীয় কতৃপক্ষ সেটা মেনে নেয়নি।
যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত মুজিব বাহিনী ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা " র" এর অধীনেই ছিলো।
__________
"র" শুধু মুজিব বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলো না। তারা মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নিতেও আগ্রহী ছিলো। এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তারা তাজউদ্দীন এবং জেনারেল ওসমানীর মাঝে ভুল বুঝাবুঝি তৈরি করতে সক্ষম হোন। যার প্রেক্ষিতে জেনারেল ওসমানি পদত্যাগ করেন।
পদত্যাগ এর আগে জেনারেল ওসমানি মন্তব্য করেন:
- মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে দিল্লীতে নেবার জন্য যুদ্ধ করছে না। তারা স্বাধীনতার জন্যই যুদ্ধ করছে।
__________
৮ জুলাই, ১৯৭১... মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারদের নিয়ে এক সম্মেলন আহব্বান করা হয়। সেই সম্মেলনে তাজউদ্দীন দাবি করেন
- কমান্ডারদের অনাস্থার কারণে জেনারেল ওসমানী পদত্যাগ করেছেন।
এই ঘোষণায় সেক্টর কমান্ডাররা হতবাক হয়ে যান। পরবর্তীতে তারা পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা সেনা কর্মকর্তাদের কাছে পুরো ঘটনা জানতে পারেন। জিয়া, খালেদ, তাহের, বাশার প্রত্যেকে এই ঘটনায় ক্ষিপ্ত হন।
মেজর জিয়া এসময় তাজউদ্দীনকে জানান: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি আপনাকে এটা নিশ্চিত করতে চাই...মুক্তিবাহিনীর প্রত্যেকটা সদস্যের জেনারেল ওসমানির উপর পূর্ণ আস্থা আছে।এই অবস্থায় তাকে পদচ্যুত করলে বেশির ভাগ মুক্তিযোদ্ধাই তা মেনে নিবে না।"
সেক্টর কমান্ডার শফিউল্লাহ অবশ্য দাবি করেছেন মেজর জিয়াই ওসমানির উপর অনাস্থা জানিয়েছিলেন। এবং খালেদ মোশাররফ ওসমানিকে সমর্থন জানিয়েছিলেন।
আমার আগের পোস্ট পড়ে থাকলে আপনি বুঝতে পারবেন...কেন শফিউল্লাহ এর বক্তব্য খুব একটা গ্রহণযোগ্য না।
যাই হোক...সম্মেলিত আপত্তির মুখে অবশেষে জেনারেল ওসমানি আবার ফিরে আসেন।
এটাই শেষ না।
নভেম্বরের শুরুতে ভারতীয় সেনাবাহিনী আবার মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নেবার চেষ্টা করে। কিন্ত জেনারেল ওসমানির কারণে তা করতে ব্যার্থ হয়।
___________
পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা এই সেনা সদস্যরা পরবর্তীতে মেজর জিয়া, খালেদ মোশাররফ, মঞ্জুর, তাহের, জিয়াউদ্দীন, জলিল, শাহাবুদ্দীন এর মতো প্রমুখ মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে এই ষড়যন্ত্রের কথা শেয়ার করেন।
এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা সেনাকর্মকর্তারা এই বিষয়ে একমত হোন যে ভারতীয় আধিপত্য রুখতে নিজেদের মাঝে যোগাযোগ রাখা জরুরি। আর এই যোগাযোগ থেকেই গড়ে উঠে সেনা বাহিনীর মাঝে প্রথম গুপ্ত সংগঠন - "সেনা পরিষদ"
সেই পালিয়ে আসা সেনা কর্মকর্তারা ছিলেন ডালিম, মতিউর এবং নূর।
মুজিব হত্যা এবং পরবর্তী ঘটনা প্রবাহে এই "সেনা পরিষদ" এবং সেক্টর কমান্ডারদের প্রত্যেকে প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ ভাবে জড়িত ছিলেন।
মুজিব হত্যার বীজ বোনা হয়েছিলো ১৯৭১ সালেই। ভারতীয় আধিপত্য বাদে আতংকিত এর "সেনা পরিষদ" ই মুজিব হ মত্যার মূল কারিগর।
____________
২১শে সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩ দিল্লীর মার্কিন দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে এক বিশেষ তারবার্তা পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়:
"বাংলাদেশ ভারতের " হানিমুন" সমাপ্তির দিকে।"
সারা দেশে ক্রমবর্ধমান ভারত বিরোধী জনমতকে বুঝাতে এই মেসেজ ব্যবহৃত হয়েছিলো।
____________
জেনারেল ওসমানি পরবর্তীতে জানিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা এবং তিনি কেন আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি... তা সবাইকে জানিয়ে তিনি একটা বই লিখবেন।
কিন্ত সেই বই লিখার আগেই তিনি মারা যান।
_____________
ইতিহাস আপনি কখনো এক রৈখিক ভাবে দেখলে বুঝবেন না। ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে হবে নানা দিক থেকে।
যে সিরাজুল আলম খান মুজিব এর জন্য তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলো...সেই সিরাজুল আলম খান কেন জাসদ ও গণ বাহিনী বানিয়ে মুজিবের বিরুদ্ধে দাঁড়ালো তা আপনি বুঝবেন না।
মুজিব হত্যার পর কেন প্রায় সব সেক্টর কমান্ডার চুপ ছিলো আপনি বুঝবেন না।
মুজিবের পারিবারিক বন্ধু মেজর ডালিম কেন মুজিবের হত্যায় যুক্ত হলো..আপনি বুঝবেন না।
মুজিবের অপমানের প্রতিবাদ করে কোর্ট মার্শালের মুখে পরা মেজর নূর কেন মুজিব হত্যায় জড়িত হলো আপনি বুঝবেন না।
১৯৭১ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত আমাদের ইতিহাস অদ্ভুত বৈচিত্র্যময়। নানান রকম চরিত্র। নানান রকম গল্প।
এটা নিয়ে একটা মহাকাব্য লিখা সম্ভব।
(১৯৭১-১৯৮১ পর্যন্ত সময়কাল নিয়ে আমার প্রজেক্ট: "যে কথা কেউ বলে না" এর ড্রাফট থেকে)
সূত্র:
B.Z Khashru এর The Bangladesh Military Coup
Phantoms of Chittagong: The "Fifth Army" in Bangladesh- Sujan Singh Uban
নেতা ও পিতা - শারমিন আহমেদ
#যে_কথা_কেউ_বলেনা
#শব্দ_জট
#মুজিব_নামা
-M Hassan