17/08/2026
দলিল প্রমান সহ জানতে সম্পুর্ন পোস্ট পড়ুন!
রুকইয়াহ করে পারিশ্রমিক নেওয়া কি জায়েজ?
রুকইয়াহর বিনিময় বনাম “কুরআনের আয়াত বিক্রি”—বিষয়টি সহজভাবে
রুকইয়াহ শারইয়্যাহ কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। কুরআনের আয়াত ও শরয়ি দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে রোগমুক্তির জন্য দোয়া করা হয়।
তবে বর্তমানে কিছু মানুষ বলেন—
“রুকইয়াহ করে টাকা নেওয়া মানে কুরআনের আয়াত বিক্রি করে টাকা খাওয়া।”
এই কথাটি সঠিকভাবে বুঝতে হলে আগে দেখতে হবে—রুকইয়াহর জন্য টাকা নেওয়া হচ্ছে কিসের বিনিময়ে?
রাকী কুরআনের আয়াত বিক্রি করেন না। তিনি তার সময়, শ্রম, চিকিৎসাসেবা ও অভিজ্ঞতার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন।
⸻
১️⃣ “আল্লাহর আয়াত স্বল্পমূল্যে বিক্রি করো না”—এর অর্থ কী?
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
“আমার আয়াতের বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করো না।”
এই ধরনের আয়াতের অর্থ হলো—আল্লাহর নাজিল করা সত্যকে টাকা, দুনিয়াবি লাভ, সম্মান বা স্বার্থের জন্য গোপন করা, পরিবর্তন করা বা বিকৃত করা যাবে না।
অর্থাৎ কেউ যদি টাকার জন্য সত্য কথা গোপন করে, হারামকে হালাল বলে বা আল্লাহর বিধান পরিবর্তন করে—এটাই আয়াত বিক্রির অন্তর্ভুক্ত।
কিন্তু একজন রাকী যখন কুরআনের আয়াত পড়ে রোগীর চিকিৎসা করেন, তখন তিনি কোনো আয়াত বিক্রি করছেন না এবং আল্লাহর কোনো বিধানও বিক্রি করছেন না।
তাই রুকইয়াহর পারিশ্রমিককে সরাসরি “কুরআনের আয়াত বিক্রি” বলা সঠিক নয়।
⸻
২️⃣ তাহলে রুকইয়াহর জন্য টাকা নেওয়ার দলিল কী?
এর সবচেয়ে স্পষ্ট দলিল হলো আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.)-এর হাদিস।
একবার সাহাবীগণ একটি গোত্রের কাছে অবস্থান করেছিলেন। পরে সেই গোত্রের একজন প্রধান বিষাক্ত প্রাণীর দংশনে আক্রান্ত হলে সাহাবীগণ তাকে সূরা ফাতিহা পড়ে রুকইয়াহ করেন।
আল্লাহর ইচ্ছায় লোকটি সুস্থ হয়ে যায়।
এর বিনিময়ে সাহাবীগণ একপাল ছাগল পেয়েছিলেন। তারা বিষয়টি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জানালে তিনি তাদের কাজকে অনুমোদন করেন এবং বলেন:
«إِنَّ أَحَقَّ مَا أَخَذْتُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا كِتَابُ اللَّهِ»
অর্থাৎ:
“তোমরা যে জিনিসের ওপর পারিশ্রমিক গ্রহণ করো, তার মধ্যে আল্লাহর কিতাবই পারিশ্রমিক পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার।”
— সহিহ বুখারি: ৫৭৩৭
অন্য বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের বলেন:
“তোমরা ঠিকই করেছ।”
এবং তিনি তাদের সেই পারিশ্রমিক নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে বলেন।
এখানে বিষয়টি খুব পরিষ্কার—শরয়ি রুকইয়াহর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা রাসূল ﷺ-এর সামনে ঘটেছে এবং তিনি তা অনুমোদন করেছেন।
⸻
৩️⃣ রুকইয়াহর টাকা আসলে কিসের বিনিময়ে?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
রাকী কুরআনের একটি আয়াতের দাম নিচ্ছেন না।
কারণ কুরআনের আয়াত কোনো পণ্য নয় যে তার দাম নির্ধারণ করা হবে।
রাকী যে বিষয়গুলোর জন্য সময় দেন—
* রোগীর কথা শোনা
* রোগীর সমস্যা ও ইতিহাস জানা
* রুকইয়াহ করা
* দীর্ঘ সময় ব্যয় করা
* রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা
* প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া
* আমল ও দোয়া শেখানো
* পরবর্তী সেশনে ফলোআপ করা
এসব সময়, শ্রম ও সেবার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা হয়।
একজন ডাক্তার রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে ফি নেন। তিনি ওষুধের অক্ষর বিক্রি করেন না; বরং তার সময়, জ্ঞান ও চিকিৎসাসেবার বিনিময়ে ফি নেন।
রুকইয়াহর ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইভাবে বোঝা যায়।
⸻
৪️⃣ সুস্থ না হলেও কি রাকী পারিশ্রমিক নিতে পারবেন?
এখানে দুই ধরনের ব্যবস্থা হতে পারে।
প্রথমত: নির্ধারিত সেশন/সেবার পারিশ্রমিক
রোগী একটি রুকইয়াহ সেশনের জন্য নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক দিলেন।
রাকী তার নির্ধারিত সময় ব্যয় করলেন এবং রুকইয়াহ করলেন।
রোগী সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ হলো কি না—এটা আল্লাহর ইচ্ছার বিষয়।
এই ক্ষেত্রে পারিশ্রমিক সেবা, সময় ও শ্রমের বিনিময়ে।
দ্বিতীয়ত: সুস্থতার ওপর পারিশ্রমিক নির্ধারণ
কেউ বলতে পারে—
“রোগী সুস্থ হলে এত টাকা দেব।”
এ ধরনের ব্যবস্থারও ফিকহে ভিত্তি রয়েছে।
আবু সাঈদ (রা.)-এর হাদিসে সাহাবীরা রুকইয়াহ করার পর রোগী সুস্থ হলে পারিশ্রমিক গ্রহণ করেছিলেন।
ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন, রোগীর সুস্থতার ওপর চিকিৎসকের জন্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা জায়েজ।
অর্থাৎ দুই ধরনের ব্যবস্থাই ফিকহে আলোচিত ও বৈধতার ভিত্তি রাখে।
⸻
৫️⃣ বড় বড় আলেমদের মতামত কী?
রুকইয়াহর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণের বৈধতার কথা বহু আলেম বলেছেন।
◈ ইমাম নববী (রহ.)
সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, সূরা ফাতিহা ও যিকিরের মাধ্যমে রুকইয়াহ করে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েজ এবং তা হালাল।
— শরহু সহিহ মুসলিম, ১৪/১৮৮
◈ ইমাম আহমাদ (রহ.)
ইবনু কুদামাহ (রহ.) তার বক্তব্য উল্লেখ করে বলেন, রুকইয়াহর ওপর পারিশ্রমিক গ্রহণের ব্যাপারে ইমাম আহমাদ “কোনো অসুবিধা নেই” বলেছেন।
— আল-মুগনী, ৫/৪১২
◈ ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.)
তিনি রুকইয়াহর মাধ্যমে রোগমুক্তির বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণের বৈধতার কথা বলেছেন।
তিনি আরও বলেছেন:
“রুকইয়াহর ওপর পারিশ্রমিক গ্রহণে কোনো অসুবিধা নেই।”
— মাজমুউল ফাতাওয়া, ১৯/৫৯; আল-ফাতাওয়াল কুবরা, ৫/৪০৮
◈ ইবনু আব্দুল বার (রহ.)
তিনি বলেন, রুকইয়াহ বৈধ হওয়ার মধ্যেই এর বিনিময় গ্রহণের বৈধতার বিষয়টি রয়েছে। তবে কেউ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনা পারিশ্রমিকে করে, সেটিও ফযীলতের কাজ।
— আত-তামহীদ, ২/২৭০
⸻
৬️⃣ শাইখ ইবনু বায (রহ.)-এর বক্তব্য
শাইখ আব্দুল আজিজ ইবনু বায (রহ.)-কে রোগীর ওপর রুকইয়াহ করার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন:
«لا حرج في أخذ الأجرة على رقية المريض»
অর্থাৎ:
“রোগীর ওপর রুকইয়াহ করার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণে কোনো অসুবিধা নেই।”
— মাজমূ‘ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত, ৯/৪০৮
অর্থাৎ ইবনু বায (রহ.)-এর কাছেও মূলনীতি হলো—শরয়ি রুকইয়াহর বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া জায়েজ।
⸻
৭️⃣ শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ)-এর বক্তব্য
শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) রুকইয়ার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণের মূল বৈধতা স্বীকার করেছেন এবং আবু সাঈদ (রা.)-এর হাদিসকে এর দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—কেউ কি রুকইয়াহ ও হিজামাকে নিজের কাজ হিসেবে নিয়ে মানুষের চিকিৎসা করে পারিশ্রমিক নিতে পারে?
তিনি মূলত এর জায়েজ হওয়ার কথা বলেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি রুকইয়াহকে অতিরঞ্জিত বাড়াবাড়ি করা , অস্বাভাবিক পারিশ্রমিক নেওয়া এবং মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়া থেকে সতর্ক করেছেন।
এখানে তাঁর সতর্কতাটিও মনে রাখা জরুরি।
⸻
৮️⃣ শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন (রহ.)-এর বক্তব্য
শাইখ ইবনু উসাইমীন (রহ.)-কে রোগীর ওপর রুকইয়ার বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল।
তিনি বলেন:
“রোগীর ওপর রুকইয়ার বিনিময়ে পারিশ্রমিক নিতে কোনো অসুবিধা নেই।”
তিনি আবু সাঈদ (রা.)-এর হাদিসকে এর দলিল হিসেবে উল্লেখ করেন।
এরপর তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে এখানে রাকী চিকিৎসাকারীর মতো। অর্থাৎ সে অন্যের উপকার ও চিকিৎসার উদ্দেশ্যে কুরআন দিয়ে রুকইয়াহ করছে।
এটি শুধু নিজের ইবাদত হিসেবে কুরআন তিলাওয়াত করার বিনিময়ে টাকা নেওয়ার মতো বিষয় নয়।
অর্থাৎ তাঁর বক্তব্য থেকেও পরিষ্কার—রোগীর চিকিৎসার উদ্দেশ্যে শরয়ি রুকইয়া করে পারিশ্রমিক নেওয়া এবং সাধারণ কুরআন তিলাওয়াতের বিনিময়ে টাকা নেওয়া একই বিষয় নয়।
⸻
৯️⃣ তাহলে “রুকইয়াহ করে টাকা নেওয়া = কুরআন বিক্রি”—এ কথা কি বলা যাবে?
এভাবে সরাসরি বলা ঠিক নয়।
কারণ শরিয়তে প্রমাণিত রুকইয়াহর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণের স্পষ্ট দলিল রয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে রাকী যেকোনোভাবে টাকা নিতে পারবেন।
রাকীকে অবশ্যই—
✅ শরয়ি পদ্ধতিতে রুকইয়াহ করতে হবে।
✅ শিরক ও কুফর থেকে মুক্ত থাকতে হবে।
✅ রোগীকে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া যাবে না।
✅ “আমি আপনাকে সুস্থ করে দেব”—এমন দাবি করা যাবে না।
✅ অতিরিক্ত অর্থলোভী হওয়া যাবে না।
✅ রোগীর অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়া যাবে না।
✅ রুকইয়াহকে ব্যবসার নামে প্রতারণায় পরিণত করা যাবে না।
✅ নিজের পারিশ্রমিককে কুরআনের আয়াতের “মূল্য” মনে করা যাবে না।
শিফা একমাত্র আল্লাহর হাতে। রাকী কেবল একটি মাধ্যম।
⸻
🔟 তাহলে কুরআন শিক্ষা, ইমামতি ও রুকইয়াহর মধ্যে বিষয়টি কী?
একজন ব্যক্তি—
📖 কুরআন শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক নেন।
🕌 ইমামতি করে বেতন নেন।
🏫 মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করে বেতন নেন।
📚 ইসলামিক বই লিখে বই বিক্রি করেন।
🎤 দ্বীনি বক্তব্য/ওয়াজের মাধ্যমে পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন।
এসব বিষয়ে আলেমদের মধ্যে বিস্তারিত ফিকহি আলোচনা রয়েছে।
কিন্তু শরয়ি রুকইয়াহর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট—কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগেই সাহাবীগণ রুকইয়াহর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করেছেন এবং রাসূল ﷺ তা অনুমোদন করেছেন।
তাই রুকইয়াহর পারিশ্রমিককে শুধু “কুরআন বিক্রি” বলে হারাম বলা ঠিক নয়।
⸻
🌿 আসল বিষয় হলো নিয়ত ও পদ্ধতি
রুকইয়াহকে উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে নেওয়া আর টাকার লোভে কুরআনকে ব্যবসার পণ্য বানানো—এক জিনিস নয়।
একজন রাকী যদি বলেন:
“আমি রোগীকে চিকিৎসা দেব, আমার সময় ও শ্রম ব্যয় করব এবং এর বিনিময়ে ন্যায্য পারিশ্রমিক নেব। কিন্তু শিফা দেওয়ার মালিক আল্লাহ।”
তাহলে এটি এক বিষয়।
আর কেউ যদি মানুষের ভয়, অসহায়ত্ব ও অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে—
❌ নিশ্চিতভাবে জিন-জাদুর দাবি করে,
❌ অদৃশ্যের খবর জানার দাবি করে,
❌ মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়,
❌ অস্বাভাবিক টাকা দাবি করে,
❌ তাবিজ-কবজ বা শিরকি পদ্ধতি ব্যবহার করে,
তাহলে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় এবং তা থেকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।
⸻
⚖️ ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত
বিষয়টিকে এক কথায় এভাবে বলা যায়:
শরয়ি রুকইয়ার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণের মূল বৈধতা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত এবং বহু আলেম তা জায়েজ বলেছেন। তবে রুকইয়াকে প্রতারণা, অতিরঞ্জন, অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ বা মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়ার মাধ্যম বানানো যাবে না।
অর্থাৎ পারিশ্রমিক নেওয়া আর কুরআনের আয়াত বিক্রি করা এক কথা নয়।
রাকী কুরআনের আয়াতের দাম নেন না; তিনি তার সময়, শ্রম, চিকিৎসাসেবা ও সংশ্লিষ্ট কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন।