31/12/2023
ব্রিটিশ এবং হিন্দু জমিদারদের অখন্ড বাংলার "সোনালি" সময়কালে দেশের শিক্ষার অবস্থা কেমন ছিল
______________________________________
১৭৫৭ সাল সালের আগের সময়ের দেশের অবস্থা কেমন ছিল সে ব্যাপারে বিস্তারিত দলিল-দস্তাবেজে সংরক্ষিত নেই। ব্রিটিশ ফিরিঙ্গিরা পলাশী জয়ের পর এসব দলিলপত্র নষ্ট করে ফেলে।
১৮৩৫ সালে টমাস ববিংটন ম্যাকলের হিসাবনুসারে বাংলা সুবাহতে প্রায় ৮০ হাজার মাদ্রাসা ছিল। এবং এই মাদ্রাসাগুলো দেশের প্রায় ৪০ ভাগ আবাদি জমির মালিক ছিল। এসব জমি ছিল লাখরোজ সম্পত্তি [লাখরোজ সম্পত্তি:
যে সম্পদের খাজনা দিতে হতো না]। মুসলমান সুলতান, সুবাহদার, এবং মুসলমান জমিদারেরা এসব জমি মাদ্রাসাগুলোকে দান করেছিলো। জমির আয় থেকেই মাদ্রাসাগুলো চলতো।
১৮৪০ সালের দিকে ইংরেজরা লাখরোজ সম্পত্তি বিলুপ্ত করে দখল নেয়, এতে মাদ্রাসাগুলো রাতারাতি পথে বসে যায়। মুসলমানেরা প্রথমে রাজ্য, সম্পদ এবং মাদ্রাসা হারিয়ে ফুঁসে ওঠে যার প্রকাশ ঘটে ১৮৫৭ সালে সিপাহি মহাবিদ্রোহে। ঢাকায় বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে শুরু করে বর্তমান শ্যামলীর রিং রোড পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে হাজার হাজার সৈনিক আর স্বাধীনতাকামীদের লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিলো। মাওলানা বুরহান উদ্দিন কাশেমীর মতে প্রায় ২ লক্ষ শহীদের মধ্যে আলেমের সংখ্যাই ছিল ৫১, ২০০ জন।
রাজ্য, মাদ্রাসা, এবং উস্তাদ: বাংলার মুসলমানেরা সবই হারিয়ে সর্বশান্ত হয়ে যায়।
অর্থনৈতিকভাবে বাংলার মুসলমানেরা কতটা বিপর্যস্ত হয়েছিল সে ব্যাপারে একটা ধারনার জন্য সর্বশেষ ঢাকার ১৮১৪ সালে চৌকিদারি ট্যাক্সের একটা হিসাব আছে। ১৮১৪ সালে ঢাকার চৌকিদারি ট্যাক্স ছিল ৩০,০০০ টাকা। ১৮৩৬ সালে এটা কমে হয় ৮০০০ টাকা। অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিবর্তনে মধ্যবিত্ত মুসলমান পরিবারগুলো ধ্বংস হয়ে যায়।
এরপরে বাকী সব সেক্টরের মত শিক্ষা ক্ষেত্রেও মুসলমানেরা অবর্ণনীয় সাম্প্রদায়িকতার শিকার হয়েছে। স্কুল-কলেজে মুসলানেরা ছিল অচ্ছুত। কারন—
১। সরস্বতী পূজা পালন ছিল বাধ্যতামূলক।
২। কুরবানি ঈদের পরে স্কুলে ঢুকতে দেওয়া হত না।
৩। বিকৃত নাম দেওয়াসহ নানা কৌশলে মুসলমানদের স্কুল থেকে দূরে রাখা হতো।
এতকিছু সহ্য করে যারা স্কুলে যেত তাদের অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। কয়েকদিন একটা ভিডিও ভাইরাল হয়, ভারতের বৃদ্ধা শিক্ষিকা এক মুসলমান ছাত্রকে ক্লাসে দাঁড় করায় এবং ক্লাসের বাকী হিন্দু ছাত্রদের বলে একে একে এসে মুসলমান ছেলেটাকে চপোটাঘাত করতে। কেউ আস্তে মারলে তাকে তিরস্কার করছিলো। একটা ঘটনা ভাইরাল হয়েছে, এমন কত ঘটনা চাপা পরেছে তার হিসাব আমরা জানি না।
হিন্দু জমিদারদের আমলেও এই ধরনের ঘটনা ছিল স্বাভাবিক। কয়েকদিন আগে একজন উনার বাবার স্কুলের অভিজ্ঞতা বলেছিলেন, ক্লাসে মাত্র ২ জন মুসলমান ছাত্র ছিল, কোরবানি ঈদের ৭ দিন পরে স্কুল খুললে মুসলমান ২ জনকে বেঞ্চে বসতে দেওয়া হত না গরুর মাংস খাওয়ার অজুহাতে। বসতে চাইলে মার খেতে হত। স্যারদের কাছে বিচার চাইতে গেলেও স্যারদের রুমে ঢুকার অনুমতি মিলত না ঐ একই অজুহতে, কারণ শিক্ষকরা প্রায় সবাই ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের।
এত কিছু সহ্য করার পরও যারা স্কুলে থাকতো এবং পরীক্ষায় অংশ নিতো, তারা পরতো আরেক বিপত্তিতে। বোর্ড পরীক্ষার খাতায় হিন্দু শিক্ষকেরা মুসলমান ছাত্র নাম দেখলেই ফেল করিয়ে দিতো।
এজন্য শেরে বাংলা এ. কে ফজলুল হক ১৯৩৮ সালে সরকারে গিয়েই পরীক্ষার খাতায় নামের বদলে রোল নম্বর লেখার প্রচলন করেন।
হিন্দু প্রধান পশ্চিম বাংলায় বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সাতটা। মুসলমান প্রধান পূর্ব বাংলায় কোন বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। মুসলমানদের নেতা খাজা সলিমুল্লাহ (র.) বহু বছর ধরে অনেক চেষ্টা করেন ঢাকায় একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে। তিনি তার নিজের জমি দান করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য। মুসলমানদের অব্যাহত চাপের মুখে ইংরেজ সরকার ঢাকায় খাজা সলিমুল্লাহ (র.) এর দান করা জমিতে বিশ্ববিদ্যালয় করতে রাজি হোন। তখন হিন্দুরা এর বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠে। কলকাতায় একের পর এক সভা সমাবেশ হতে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে। হিন্দুরা ইংরেজ সরকারের কাছে ১৬ বার স্মারকলিপি প্রদান করে ঢাবি প্রতিষ্ঠা ঠেকাতে।
যখন বুঝতে পারে ঢাবি প্রতিষ্ঠা ঠেকাতে পারবে না তখন তারা ঢাবির বাজেটের প্রায় ৭০% উঠিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণের জন্য বরাদ্দ করতে বাধ্য করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের দখল নেয়। ১৯৩৮ সালে ঢাবিতে আরবি, ইসলামিয়াত বিভাগগুলো ছাড়া মুসলমান শিক্ষক ছিলেন মাত্র তিন জন:
১। ড. মাহমুদ হোসেন— ইতিহাস।
২। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্— বাংলা।
৩। ড. মাহমুদ হাসান— ইংরেজি।
সব মিলিয়ে ব্রিটিশ এবং হিন্দু জমিদারদের ২০০ বছরে শাসনে দেশে:
১। মেডিক্যাল কলেজ হয় ১ (এক) টি।
২। বিশ্ববিদ্যালয় হয় ১ (এক) টি।
৩। ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজ ছিল ০ (শুন্য) টি।
৪। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছিল ০ (শুন্য) টি।
৫। টেক্সটাইল কলেজ ছিল ০ (শুন্য) টি।
৬। মেরিন একাডেমি ছিল ০ (শুন্য) টি।
৭। ক্যাডেট কলেজ ছিল ০ (শুন্য) টি।
১৯৪৭ সালে ভারত মাতাকে কেটে দুই টুকরো করা হয়। শুরু হয় ২৩ বছরের পাকিস্তানি উপনিবেশ। পাকিস্তানি উপনিবেশের অন্ধকার যুগে শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন ছিল তা নিয়ে পোস্টের লিংক কমেন্টে।
©Mir Salman Samil