15/07/2025
পরিমাণ থেকে মানের অভিযাত্রা
--------------------
শৈশবের একটি স্মৃতি, যা আজও হৃদয়ের গভীরে সতেজতা ও মাধুর্যসহ গেঁথে আছে, তা হলো সেই মুহূর্ত যখন আমি ভিওয়ান্ডি গিয়েছিলাম। তখন ভিওয়ান্ডিতে আমাদের পাওয়ার লুমের কারখানার সারি ছিল। সর্বত্র ছিল নতুন মুখ, অজানা দৃষ্টি আর শেখার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আগত শ্রমিকরা, যারা লুম চালানোর কৌশলে নিজেদের ভাগ্য যাচাই করত। আমিও তখন এক নবীন শিক্ষার্থী, বিস্ময়ভরা চোখ আর কৌতূহলী হৃদয় নিয়ে এসব দৃশ্য অবলোকন করতাম। দেখতে দেখতেই আমার ভেতরেও এই শিল্প শেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠল। বয়সের অল্পতা আমার পথের বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারল না। আমি মনোযোগ ও দৃঢ়তার সঙ্গে অনুশীলনের সূচনা করলাম। মনে কোনো দ্বিধা ছিল না, জিহ্বায় কোনো ভয়ভীতির প্রকাশ ছিল না, এমনকি এই আশঙ্কাও ছিল না যে কোনো ভুল হয়ে যাবে বা মেশিন থেমে যাবে। আমি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে অনুশীলনের সাগরে ঝাঁপিয়ে দিলাম এবং আল্লাহর কৃপায় আমার হাতে দক্ষতার আলো ফুটে উঠল।
এর ঠিক বিপরীতে সেই শ্রমিকরা, যারা সবসময় এই আশঙ্কায় থাকত যে ভুল না হয়ে যায় বা মেশিনে কোনো ত্রুটি না আসে—তারা শেখার পথে ধীরে ধীরে চলত। এটাই সেই পার্থক্য, যা এক সাহসী, নির্ভীক ও স্থিরচেতা মানুষের সঙ্গে এক ভীতু ও দ্বিধাগ্রস্ত মানুষের মাঝে সীমারেখা তৈরি করে। অভিজ্ঞতা—যা মানের প্রথম সিঁড়ি—আসলে এই অধিক পরিমাণ অনুশীলন ও নিরবিচার চেষ্টারই ফল।
এই নীতিকে আমি ‘নদওয়াতুল উলামা’র জ্ঞানপিপাসু পরিবেশেও প্রয়োগ করেছিলাম। নদওয়ার সেই পরিবেশ, যেখানে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বলত, আর বিদ্বানরা নিজেদের আগ্রহ ও উৎসাহে সেই দীপকে আরও উজ্জ্বল করত, সেখানে আমি নিজের জন্য একটি নিয়ম স্থির করেছিলাম: প্রতিদিন একখানা উর্দু ও একখানা আরবি বই পড়ব। আমার লক্ষ্য ছিল না প্রতিটি শব্দ ও বাক্যের গভীরে গিয়ে তার অর্থ আহরণ করা, বরং আমার উদ্দেশ্য ছিল যত বেশি সম্ভব পড়া—যাতে পাঠের আনন্দ ও গতি—উভয়েরই বৃদ্ধি ঘটে।
আমি যখন এই নিয়ম অনুসরণ করতে শুরু করলাম, তখন আল্লাহর সাহায্য আমার সঙ্গে ছিল। অধিক পাঠের বরকতে শুধু পড়ার পরিধি বেড়ে গেল না, বরং উপলব্ধি ও বোধের আলোও ধীরে ধীরে আমার হৃদয় ও চিন্তায় প্রবেশ করতে লাগল। শব্দগুলো যেন আমার মুঠোয় চলে আসতে লাগল, ভাষার সৌন্দর্য আমার বোধে ধরা দিতে থাকল, এবং এমন এক সময় এলো, যখন আমার পাঠ মানের সেই উচ্চতায় পৌঁছাল, যার আমি শুরুতে আকাঙ্ক্ষা করেছিলাম। আমি প্রায়ই ভাবি, যদি আমি এই বিভ্রমে পড়ে যেতাম যে প্রতিটি শব্দের গভীরে যাব, কোনো ভুল না হয়, তবে সম্ভব ছিল যে আমি এক সপ্তাহ তো দূরের কথা, মাস পেরোলেও একটি বইও শেষ করতে পারতাম না এবং আমার জ্ঞানচর্চার গতি থেমে যেত।
লেখার ক্ষেত্রেও এই একই নীতি উদ্ভাসিত হয়। নদওয়ায় আমি উর্দু ও আরবিতে লেখার অনুশীলনকে নিজের অভ্যাস বানিয়ে নিয়েছিলাম। মনের আবেগ, জ্ঞানচিন্তা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, অনুবাদ ও প্রবন্ধ—সব কিছুই নিরবিচারে লিখতে থাকতাম। শুরুতে ভুল ছিল, বাক্যগঠনে বিশৃঙ্খলা ছিল, শব্দচয়নেও দুর্বলতা ছিল; কিন্তু আমি সাহস হারাইনি এবং অনুশীলন ত্যাগ করিনি। এই নিয়মিত চর্চার ফল ছিল—আমার লেখনীতে গতি এল, শব্দ আরও পরিষ্কার ও ঝরঝরে হতে লাগল, এবং লেখায় এক স্বাভাবিক প্রবাহ সৃষ্টি হতে থাকল। বাস্তবিকই, এই বারংবার অনুশীলন মানের সবচেয়ে দৃঢ় ভিত্তি।
নিশ্চয়ই, যে ব্যক্তি জীবনে উৎকর্ষ কামনা করে, যে নিজের শিল্প, দক্ষতা বা জ্ঞানে এমন উচ্চতায় পৌঁছাতে চায়, যেখানে দৃষ্টিগুলো আটকে যায়, হৃদয় প্রশংসা করে ওঠে এবং যুগ তার দৃষ্টান্ত দেয়, তার জন্য সবচেয়ে প্রথম এবং অটল নীতি হলো—পরিমাণে বৃদ্ধি ঘটানো। পরিমাণ মানে—অধিক অনুশীলন। আর এই অধিক অনুশীলনই শেষ পর্যন্ত মানের বাগানকে সুভাসিত করে তোলে।
আমি আমার জীবনে বহুবার এই নীতির সত্যতা প্রত্যক্ষ করেছি এবং হৃদয় ও মস্তিষ্কের গভীরে গেঁথে নিয়েছি যে, মানুষ যত বেশি কোনো কাজের পুনরাবৃত্তি করে, ততই তার মস্তিষ্ক, তার হাত, তার ভাষা এবং তার দক্ষতা আরও নিখুঁত ও পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, এবং মানের সেই শিখরে পৌঁছে যায়, যেখানে প্রতিটি রুচিশীলের দৃষ্টি গিয়ে স্থির হয়।
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে—হোক তা ভাষা, বক্তৃতা, পাঠদান কিংবা অন্য কোনো শিল্প—মানে পৌঁছাবার সবচেয়ে সরল ও পরীক্ষিত পথ হলো পরিমাণে বৃদ্ধি। যে ব্যক্তি যতই মান নিয়ে ভাবুক, যদি সে অধিক অনুশীলনের আশ্রয় না নেয়, তবে না সে মান অর্জন করতে পারবে, না সেই অভিজ্ঞতা, যার ওপর মানের পূর্ণ ভবন দাঁড়িয়ে থাকে।
পর্যবেক্ষণ জানায়, অধিকাংশ শিক্ষার্থী কিংবা তরুণ-তরুণী এমন এক আশঙ্কায় ভোগে যে, তাদের লেখায় যেন কোনো ভুল না হয়। এই ভয় ও সংশয়ের প্রভাবে তারা একটি প্রবন্ধ লেখতেই সপ্তাহের পর সপ্তাহ, এমনকি মাসের পর মাস লেগে যায়। এর পরিণামে তাদের কলমে স্বাভাবিক গতি আসে না, লেখায় প্রাণ জাগে না, আর তাদের ভাষাশৈলী নিষ্প্রাণ ও ভারী রয়ে যায়।
এর বিপরীতে, যে তরুণরা এই দ্বিধা ও সংশয় ঝেড়ে ফেলে নিরবিচারে লেখার অভ্যাস গড়ে তোলে, তারাই ভবিষ্যতে ভালো লেখক হয়ে ওঠে। তাদের লেখায় প্রাণ থাকে, ভাষায় সৌন্দর্য ফুটে ওঠে এবং ভাব প্রকাশে এক ধরনের প্রভাব তৈরি হয়।
এই নীতি শুধু লেখালেখির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার প্রভাব বিস্তৃত। একজন শিক্ষক, যতদিন না প্রতিদিন পাঠদানের চর্চা করে, তার কাছে শিক্ষাদানের জগৎ অপরিচিতই থেকে যায়। একজন বক্তা, যতক্ষণ না বারবার শ্রোতাদের সামনে দাঁড়ায়, ততক্ষণ তার অন্তরের কম্পন ও জিভের জড়তা দূর হয় না। কিন্তু যে ব্যক্তি এই সব প্রতিকূলতাকে অগ্রাহ্য করে কাজের ওপর অবিচল থাকে, একদিন সেই-ই শ্রোতাদের হৃদয়ে প্রবেশ করতে পারা এক প্রভাবশালী বক্তা হয়ে ওঠে।
একই কথা খাটে প্রতিটি কারিগর, প্রতিটি ড্রাইভার, প্রতিটি ইঞ্জিনিয়ার এবং প্রতিটি চিত্রশিল্পীর বেলায়। প্রতিটি শিল্পের উৎকর্ষ এবং প্রতিটি দক্ষতায় পূর্ণতার চাবিকাঠি হচ্ছে—বারংবার অনুশীলন ও পরিমাণে বৃদ্ধি।
মনে রাখা দরকার, মানুষ স্বভাবতই অভিজ্ঞতা থেকে শেখে। আর অভিজ্ঞতা তখনই অর্জিত হয়, যখন মানুষ কাজে বারবার নিযুক্ত হয়—অর্থাৎ পরিমাণে বৃদ্ধি করে। যে ব্যক্তি অনুশীলন করে এবং ভুলের ভয়ে ভীত হয় না, সেই-ই অভিজ্ঞতা অর্জন করে। আর সেই অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই তার মান উচ্চতর হয়। যে ব্যক্তি কেবল মান নিয়ে চিন্তিত থাকে, কিন্তু পরিমাণে বৃদ্ধি ঘটায় না, সে না পরিমাণ অর্জন করতে পারে, না মান।
প্রত্যেক শিক্ষার্থীর, প্রত্যেক শিল্পীর এবং প্রত্যেক হস্তশিল্পীর কর্তব্য হলো—নিয়মিত অনুশীলনকে নিজের অভ্যাস বানানো। শুরুতে দুর্বলতা ও ত্রুটি আসবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ত্রুটিগুলিই গুণে রূপান্তরিত হবে, সেই দুর্বলতাগুলিই পরিণত হবে দক্ষতায়। আর অবশেষে তারা মানের এমন উচ্চস্থানে পৌঁছে যাবে, যেখানে দুনিয়া তাদের দক্ষতাকে স্বীকৃতি দেবে।
পরিমাণ থেকে মান পর্যন্ত এই যাত্রা সহজ নয়, কিন্তু যে ব্যক্তি ধৈর্য, অটলতা এবং অনুশীলনের প্রদীপ হাতে এই পথে এগোয়, সে-ই সফলতার দরজায় কড়া নাড়ে। এই স্থিরতা, এই নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস এবং এই সাহসিকতাই মানুষকে সেই পর্যায়ে পৌঁছে দেয়, যেখানে তার শ্রমই হয়ে ওঠে তার পরিচয়।
--------------------
✍ মূল : ড. আকরাম নদভী, অক্সফোর্ড ইউকে।