12/09/2023
#অণুগল্প
মায়াপোলাও
--- আবু সাঈদ আহমেদ
আড়াই মাস ধরে মিজানের খুব পোলাও খেতে ইচ্ছে করছে। অর্থাভাবে খাওয়া হচ্ছেনা। ইচ্ছে করলে হোটেলে খেয়ে নিতে পারে। কিন্তু হোটেলে বসলে ছেলেমেয়ে দুটোর কথা মনে পড়ে, বৃদ্ধ মা আর শরীফার কথা মনে হয়।
টানাটানির সংসার। পাঁচজনের জন্য দুইবেলা পোলাও রান্না করতে হাজার টাকা খরচ। একবেলা তো আর খাওয়া যাবে না।
মাসের প্রথম সপ্তাহ। বিষ্যুদবার রাতে আলুভর্তা ও ডাল দিয়ে ভাত খেতে খেতে মিজান শরীফাকে বলে-
: কাইল পোলাও রাইন্দো, সকালে মুরগি আর পোলায়ের চাউল আইনা দিমু।
: এতদিন ধইরা জি আকলাইতাছে, হোটেলে পোলাও খাইলেই পারতা। খামাখা বাড়তি খরচ।
মিজানের স্বরে বিস্ময়,
: তোমাগো ছাড়া কিছু খাই? হোটেলে খাইলে গলা দিয়া পোলাও নামবো!
: এই অভ্যাসটাই ভালা লাগে না, আমগো থুইয়া একা দাওয়াত পানিতেও যাও না।
: বাদ দাও, এক কেজি খাসির গোশতো আনুম। ঝাল কইরা আলু দিয়া রাইন্দো।
: আইচ্ছা।
মিজান সাথে সাথে দ্বিমত করে,
: না না ঝাল দিও না, তোতন খোকন জি ভইরা খাইতে পারবো না।
শুক্রবার ভোর। বাড়ি ওয়ালার ডাকে ঘুম ভাঙে। তিনি বলেন, "নাতির জন্মদিন। দুপুরে সামান্য খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করছি। তোমগো দাওয়াত। না করা পারবা না।" মিজান হাসি মুখে দাওয়াত কবুল করে।
মিজান জুম্মার নামাজে যাবার আগে শরীফার হাতে এক হাজার টাকা দেয়। বাড়িওয়ালার দাওয়াতের সালামি। ছেলেমেয়ে আর মাকে নিয়ে দাওয়াতে যেতে বলে। শরীফা বিষন্ন কণ্ঠে জানতে চায়-
: তুমি যাইবা না!
: না, তুমিই কও এক হাজার টাকা সালামি দিয়া কি পাঁচটা মানুষ খাওন যায়!
: তুমি না গেলে আমিও যামু না।
: শরীফা, বাড়িওয়ালা সব ভাড়াইটার ভাড়া বাড়াইছে। আমগো বাড়ায় নাই। আমগো ভালা পায়। না যাওনটা কি ঠিক অইবো?
মিজানের যুক্তি অগ্রাহ্য করার সামর্থ্য শরীফার নাই, হতাশা গোপন না করেই জানতে চায়,
: তুমি কি খাইবা!
: আমি একশো টাকা দিয়া হোটেলে তেহারী খায়া নিমু। দাওয়াতে গেলে তো পাঁচ শো দিতে অইবো।
মিজান জুম্মার নামাজ শেষে মসজিদে বসে ভিড় কমার অপেক্ষা করে। বহুদিন পরে আজ বাচ্চারা, মা ও শরীফা পোলাও খাবে। পোলাওয়ের সাথে টিকা কাবাব, রুই মাছ ভাজা, মুরগির রোষ্ট, মাংসের রেজালা, বোরহানি আর জর্দাও আছে। এত চমৎকার আয়োজন নসিবে রাখায় সে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দুই রাকাত শোকরানা নামাজ আদায় করে।
মিজান মসজিদ থেকে বের হয়ে টং দোকানে বসে। আয়েশ করে চা'য়ে ডুবিয়ে বানরুটি খায়। মাথার ভিতরে পোলাও খাবার ইচ্ছেটা আবার জেগে ওঠে, তার চোখে সিনেমা চলছে- একটা শীতল পাটিতে প্লেটে প্লেটে সাজানো হালকা গরম সাদা পোলাও, মুরগি ভাজা, আলু দিয়ে রান্না করা মাংসের রেজালা, পেয়াজ কুচি, রসে জবজবে লেবু, কলাপাতা রঙ কাঁচা মরিচ-- সে, তোতন-খোকন, মা আর শরীফা মিলে গোল হয়ে বসে তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে। অজান্তেই তার চোখ দুটো ভিজে আসে। শুক্রবারের ছুটির ভর দুপুরে মিজানের ভেজা চোখ আরো ভিজিয়ে দিতেই যেন টং দোকানদারের চায়না মোবাইল সেটে এন্ড্রু কিশোর গেয়ে চলেন-
পূর্ণিমাতে ভাইসা গেছে নীল দরিয়া
সোনার পিনিশ বানাইছিলা যতন করিয়া
চেলচেলাইয়া চলে পিনিশ, ডুইবা গেলেই ভুস...।