10/05/2023
প্রসঙ্গ - ভারত কি মুসলমান গণহত্যার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?
ভারত খুবই দ্রুত একটা গণহত্যার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, এটা একাডেমিক গবেষণার মাধ্যমেই বলা যাচ্ছে এখন। কেরালা স্টোরিজ নামক একটা চিপ প্রোপাগান্ডা হিন্দুত্ববাদী সিনেমা রিলিজের পর পাবলিক রিয়্যাকশন দেখে মনে করা যায়, অবস্থা আসলেও খারাপ। এই সিনেমা আর লাভ জিহাদে সীমাবদ্ধ নাই, এটা বলতেছে - মুসলমানদের সাথে বন্ধু করা, সম্পর্ক রাখাও বিপজ্জনক। তারা সবাইই আসলে জংগি, জেহাদি। ট্রেইলারে বলা হইছিল ৩২ হাজার মেয়ে সিরিয়াতে গেছে; অথচ আসলে গেছে মাত্র ৩ জন। পুরা কেরালাতে মুসলমান নারী প্রায় ৪৫ লাখ! কেরালাতে বিজেপির বেইল নাই কোনো। তাই এই চেষ্টা।
২০২২ সালে জেনোসাইড ওয়াচের ফাউন্ডিং প্রেসিডেন্ট গ্রেগরি স্ট্যান্টন বলেছিলেন, “আমি রুয়ান্ডার গণহত্যা প্রেডিক্ট করেছিলাম। সামনে ভারতেও এমন কিছু হতে পারে।” এখন দেড়শ কোটি ভারতীয় অনলাইনে গায়ের জোর দেখায়ে সত্যকে ধামাচাপা দিতে চাইলেও বা সত্যকে অস্বীকার করতে চাইলেও, ভারত এখন অনেক দূরে চলে গেছে।
গণহত্যা সঙ্ঘটনের দশটি ধাপ আছে। এই দশটি ধাপ গ্রেগরি স্ট্যান্টন নির্ধারণ করেছিলেন। এই দশটা ধাপ হইল - ক্ল্যাসিফিকেশন, সিম্বলাইজেশন, ডিস্ক্রিমিনেসন, ডিহিউম্যানাইজেশন, অর্গানাইজেশন, পোলারাইজেশন, প্রিপারেশন, পারসেকিউশন, এক্সটারমিনিনেশন আর ডিনায়াল। চোখ বন্ধ করে বলা যায়, ভারত এখন সাত নাম্বার ধাপ - প্রিপারেশনে। আমি ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করি যে ভারত আট নাম্বার পর্যন্ত কীভাবে এলো।
১। ক্ল্যাসিফিকেশন - বেসিক আস ভার্সেস দেম আর্গুমেন্ট। ভারতে মুসলিমদের যে আদারিং করা হইছে, অর্থাৎ তাদের যে ভারতীয় হিন্দুদের থেকে ভিন্ন, তারা ভারতের প্রতি অনুগত না, তারা জংগি বা তারা ভারতের রামরাজ্যের প্রতি ক্ষতিকর- এটা প্রতিষতিত করা হইছে।
২। সিম্বলাইজেশন - এ ধাপটা সহজ। মুসলিম চিহ্ন বা ধর্মীয় প্রতীককে প্রতিনিয়ত ভিলিফাই করা হইতেছে। এটা কেবল সমাজে না, সবখানেই। পাঠ্যপুস্তকে মুঘলদের নাম সরায়ে ফেলা হচ্ছে। মুঘলদের ডাকাত, বর্বর হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। কোনো এক প্রাচীনকালে আদর্শ হিন্দু রাজ্য ছিল - এটা প্রচার করা হচ্ছে। মুভিতে দেখেন ভিলেনের লম্বা দাড়ি, গায়ে জোব্বা, মাথায় টুপি (অলমোস্ট সব দেশভক্তি মুভিতে এটা দেখবেন। খালি বলিউড না, তামিলেও)। ইভেন রিসেন্ট আদিপুরুষ সিনেমার ট্রেইলারে দেখেন - ভিলেন রাবণের লম্বা মুসলমান স্টাইলের দাড়ি। অথচ রাবণের হিস্ট্রিকাল কোনো চিত্রায়ণেই এইরকম লম্বা দাড়ি ছিল না। এটা নিয়ে ভারতের হিন্দুরাই প্রতিবাদ করেছে। এখানে পরিচালক ওম রাউট রামের বিপরীতে লম্বা দাড়ি রাবণকে দিয়ে কী সিম্বলাইজ করছেন সেটা বোঝা দরকার। ভারতের জায়গায় জায়গায় মুসলমান ইতিহাস সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। মুসলমানদের নিজস্ব লোকালয় বা গেটো বানায়ে থাকতে হচ্ছে নিরাপত্তার জন্য। লাভ জিহাদের ধুয়া তুলে মুসলমানদের নামে একটা ভয়ানক হেইট ক্যাম্পেইন বানানো হইছে।
৩। ডিস্ক্রিমিনেশন - ডিস্ক্রিমিনেশনে আর না যাই। ওইটার ভুরি ভুরি উদাহরণ পাবেন। এত বেশি পাবেন যে এইটা মোটামুটি স্বতঃসিদ্ধ সত্য হয়ে গেছে।
৪। ডিহিউম্যানাইজেশন - মুসলমানদের এখন ডিহিউম্যানাইজ করে ফেলা হইছে। দেখেন, ভারতে এখন মুসলমানদের নামে খালি নেগেটিভ প্রোপাগাণ্ডাই চলে। তিনটা উদাহরণ দেই। সুল্লি ডিল আর বুল্লি বাই অ্যাপ বানানো হইছিল ২০২১-২০২২ সালে; প্রথমটায় মুসলিম নারীদের অনলাইনে নিলাম করা হইছিল’ দ্বিতীয়টায় মুসলিম নারী সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের অনলাইনে নিলাম করা হইছিল। এই কাজগুলা করছিল ট্র্যাড বা কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা। আবার বলা হইছিল ২০২০ সালে তাবলীগি জামাতের মাধ্যমে কোভিড ছড়াইছে; অথচ একই ঘটনা ঘটছে কুম্ভমেলা থেকেও। ইউপিতে আতিক আহমেদ ও তার ছেলেকে পুলিশ হত্যা করে। তারপর সেখানে দেখা যায় এন্টি-মুসলিম সেন্টিমেন্টের জোয়ার। অথচ ইউপি-বিহারের সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে যার বিন্দুমাত্র আইডিয়া আছে, সে জানে ইউপি-বিহারের মত এলাকায় আপনার জাতের গ্যাংস্টার না থাকলে আপনার জাতের কপালে কেবল নির্যাতন আছে। আতিক আহমেদের বাপরা বসে আছে ইউপি-বিহারে; অথচ তারা ব্রাহ্মণ বা ঠাকুর বলে তাদের কিছু করা হইতেছে না (যোগী নিজে ঠাকুর, ঠাকুরদের বিশাল গ্যাং আছে। ২০২০ সালে ব্রাহ্মণ বিকাশ দুবেকে মেরে ফেলা হইছিল, তখনো ধ্রণা করা হইছে যে ঠাকুরদের হাত আছে। কোনোবারেই ঠাকুরদের কিছু হয় না) এইভাবে নানা ভাবে মুসলমানদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করা হইছে।
৫। অর্গানাইজেশন - আরএসএস, বজরং দল, ভিএইচপি এরা সবাই আর্মড এবং তারা রক্ত ঝরাতে প্রস্তুত। ২০২৩ সালের রাম নবমীর দিনে কলকাতায় হাঙ্গামা এটার প্রমাণ।
৬। পোলারাইজেশন - দিনরাত গোদী মিডিয়া আর হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি থেকে এন্টি-মুসলিম প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এর প্রতিবাদ করা হলে প্রতিবাদকারীদের লিবারেল, বাম বলে ট্যাগ দেয়া হচ্ছে। ভারতে মুসলিমদের সাথে সাথে বাম ও লিবারেলদেরও ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। রাহুল গান্ধী তার ভারত জোড়ো যাত্রা শেষে ভাষণে বলেছিল - আমি ভারতের এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত হেটেছি; আমি হেট দেখতে পাইনি। অথচ টিভি খুললেই আমি হেট দেখি। ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটারের কমেন্টবক্সে দেখেন, কী বীভৎস হেইট ক্যাম্পেইন।
৭। প্রিপারেশন - ভারতে এখন সব দিক থেকেই মুসলমানদের কোণঠাসা করা শেষ। কালচারাল, সোশ্যাল, রিলিজিয়াস, ইকোনোমিক সবখানেই। ভারতে এখন ওপেনলি মুসলমান ব্যবসায়ীদের থেকে কিনতে না করা হচ্ছে; মুসলমানদের নিজস্ব এলাকায় থাকতে না দিতে বলা হচ্ছে; মুসলমান শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণ হচ্ছে; মুসলমানদের হয়ে কথা বলতে পারে এমন সবাইকে আক্রমণ করা হচ্ছে; মুসলমাদের আয়োজনে না যেতে বলা হচ্ছে, মুসলমানরা হিন্দুদের উৎসবে এলে না হিন্দুরা মুসলমানদের উৎসবে গেলে তাদের আক্রমণ করা হচ্ছে। এসব কিছুর টার্গেট একটাই - মুসলমানদের প্রতিরোধের শক্তি শেষ করে দেয়া, তাদের দুর্বল করে দেয়া, হিন্দুত্ববাদের সুপ্রিমেসি প্রতিষ্ঠা করা।
এরপর শুরু হবে মুসলমানদের একজায়গায় জড়ো করে কনসেন্টেশন ক্যাম্প বানানো - এনআরসি, সিএএ এর লক্ষ্য এটাই। এরপর শুরু হয়ে যাবে গণহত্যা। শেষ ধাপে গ্ণহত্যাকে অস্বীকার করা হবে। এখন যেভাবে গুজরাটের গণহত্যাকে অস্বীকার করা হয়।
“Genocide is a process. The Holocaust did not start with the gas chambers. It started with hate speech.” এটা মাথায় রাখা লাগবে। বিজেপি আর হিন্দুত্ববাদীরা এখন অনেক দূরে চলে এসেছে হেইট স্পিচ থেকে।
✍️ সাদিক মাহবুব আলম