08/09/2026
“ওরা ছাগল-ভেড়া নিয়ে ফিরুক, তোমরা কি রাসূল ﷺ-কে নিয়ে ফিরতে খুশি নও?”
হুনাইনের পর গনীমত বণ্টন নিয়ে আনসারদের মনে কষ্ট তৈরি হলে রাসূল ﷺ তাঁদের একান্তে ডেকে এমন এক কথা বললেন যে, তাঁদের দাড়ি চোখের পানিতে ভিজে গেল।
যে মানুষটার সবচেয়ে কঠিন সময়ে আপনি পাশে ছিলেন, সুদিন আসার পর যদি মনে হয়, তাঁর কাছে সেই আগের জায়গাটা আগের মত নেই, তখন কেমন লাগবে বলুন তো?
এই কষ্ট কি চেনেন আপনি?
প্রিয় মানুষের কাছে নিজের জায়গাটা হারিয়ে ফেলার ভয় কতখানি কষ্টের, তা আমরা অনেকেই জানি। হুনাইনের পর আনসার সাহাবিদের ঘটনাটি পড়লে আমার এই অনুভূতির কথাই মনে পড়ে।
আর তাঁদের অভিমান ভাঙাতে আমাদের প্রিয় রাসূল ﷺ যা বলেছিলেন, আহা বুকটা কেমন করে সেই কথাগুলো মনে করেই!
আসুন আসুন দেরি না করে বিস্তারিত গল্প শুনি...
মক্কা বিজয়ের পর হুনাইনের যুদ্ধ হয়েছে। মুসলিমরা অনেক গনীমত লাভ করেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ সেই সম্পদ থেকে কুরাইশ ও অন্য কিছু গোত্রের লোকদের বড় বড় অনুদান দিচ্ছিলেন। কাউকে কাউকে তিনি একশ করে উটও দিলেন! ১০০ উট মানে বিরাট ব্যপার !
আর আনসাররা এই গনিমত থেকে কিছু পেলেন না।
তাঁদের কারও কারও মনে স্বাভাবিকভাবেই কষ্ট তৈরি হলো। এই আনসার সাহাবী তাঁদের জান, মাল দিয়ে ভালোবেসে রসূল ﷺ কে মদিনায় protection দিয়ে নিয়ে এসেছেন, আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য হাতে হাত রেখে কাজ করেছেন। তাহলে তাঁদের স্বীকৃতি কোথায়?
কয়েকজন তরুণ বলেও ফেললেন, রাসূল ﷺ কুরাইশকে দিচ্ছেন, আর তাঁদের ছেড়ে দিচ্ছে, অথচ তাঁদের তরবারি থেকে এখনো যুদ্ধের রক্ত ঝরছে!
কথাগুলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে পৌঁছাল। তিনি আনসারদের সবাইকে ডেকে একটি চামড়ার তাঁবুতে একত্র করলেন। তাঁদের সঙ্গে অন্য কাউকে ডাকলেন না। তারপর জানতে চাইলেন, তাঁদের সম্পর্কে তাঁর কাছে কী কথা পৌঁছেছে। আনসারদের জ্ঞানী ব্যক্তিরা জানালেন, নেতৃস্থানীয়রা এসব বলেননি; কয়েকজন অল্পবয়সী এমন কথা বলেছেন। [সহিহ আল-বুখারি ৪৩৩১]
একটু খেয়াল করুন তো!
মানুষগুলো তাঁকেই ভুল বুঝেছেন। অথচ তিনিই তাঁদের ডেকে কথা বলছেন। তাঁদের মুখ থেকেই শুনছেন কী হয়েছে।
কেউ আমাকে ভুল বুঝলে আমি কি এভাবে তার সঙ্গে বসি? নাকি আরও দশজনকে বলে বেড়াই, সে আমাকে নিয়ে কী বলেছে?
রাসূল ﷺ আনসারদের আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। তাঁরা পথভ্রষ্ট ছিলেন, আল্লাহ তাঁদের হিদায়াত দিয়েছেন। তাঁরা বিভক্ত ছিলেন, আল্লাহ তাঁদের এক করেছেন। তাঁরা অভাবী ছিলেন, আল্লাহ তাঁদের অভাব দূর করেছেন।
আনসাররা বললেন, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগ্রহই অধিক।”
কিন্তু এরপর রাসূল ﷺ নিজেই তাঁদের অবদানের কথা তুলে ধরলেন। তাঁরা চাইলে বলতে পারতেন, তাঁকে যখন মিথ্যাবাদী বলা হয়েছিল, তাঁরা তাঁর সত্যতা মেনেছেন; তিনি সাহায্যহীন অবস্থায় এসেছিলেন, তাঁরা সাহায্য করেছেন; বিতাড়িত হয়ে এসেছিলেন, তাঁরা আশ্রয় দিয়েছেন; অভাবী হয়ে এসেছিলেন, তাঁরা সহযোগিতা করেছেন। তিনি জানালেন, এসব বললে তাঁরা সত্যই বলতেন। [মুসনাদ আহমাদ ১১৭৩০]
সুবহানআল্লাহ!
যাঁকে নিয়ে তাঁদের মনে অভিমান জমেছে, তিনি নিজেই তাঁদের ত্যাগের কথা স্বীকার করছেন! তাঁদের সেই কঠিন দিনের পাশে থাকার কথা তাঁর মনে আছে!
আমরা তো ঝগড়ার সময় শুধু মনে করিয়ে দিই, “তোমার জন্য আমি কী করিনি!”
অথচ অপর মানুষটা আমার জন্য কী করেছে, সেটাও তো অভিমানের মাঝে মুখে স্বীকার করা যায়। এভাবেই তো মান অভিমানে ফুল ফোটে। আমাদের প্রিয় নবী ﷺ তা করে দেখিয়েছেন।
এরপর তিনি বণ্টনের কারণ বুঝিয়ে দিলেন। যাঁদের তিনি দিচ্ছেন, তাঁরা সদ্য কুফর ছেড়ে এসেছেন। তাঁদের অন্তরকে ইসলামের প্রতি অনুরাগী করতেই এই দান যেন তারা ইসলামকে আরও দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে। আর আনসারদের তিনি তাঁদের ইসলামের ওপর আস্থা রেখে ছেড়ে দিয়েছেন।
তারপর বললেন সেই বিখ্যাত কথাটি।
“তোমরা কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, লোকেরা ছাগল-ভেড়া আর উট নিয়ে ফিরে যাবে, আর তোমরা তোমাদের নবীকে নিয়ে নিজেদের ঘরে ফিরবে?”
সুবহানআল্লাহ! আল্লাহু আকবার!
একবার ভাবুন তো!
অন্যরা ফিরবে উট আর ছাগল-ভেড়া নিয়ে। আর আনসারদের সঙ্গে ফিরবেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ!
যে মানুষটাকে তাঁরা এত ভালোবাসেন, তিনি তাঁদের সঙ্গেই ফিরবেন!
রাসূল ﷺ আরও জানালেন, মানুষ যদি এক উপত্যকা বা গিরিপথ দিয়ে যায়, আর আনসাররা অন্য পথ দিয়ে যান, তিনি আনসারদের পথেই যাবেন।
তারপর তাঁদের জন্য দুআ করলেন, “হে আল্লাহ! আনসারদের প্রতি রহম করুন। আনসারদের সন্তানদের প্রতি এবং তাঁদের সন্তানদের সন্তানদের প্রতিও রহম করুন।”
আনসাররা কেঁদে ফেললেন। এতই কাঁদলেন এতই কাঁদলেন যে তাঁদের দাড়ি চোখের পানিতে ভিজে গেল!
তাঁরা বললেন, “আমাদের ভাগ ও প্রাপ্তি হিসেবে আল্লাহর রাসূলকে পেয়েই আমরা সন্তুষ্ট।” [মুসনাদ আহমাদ ১১৭৩০]
আহা, আমার প্রিয় রাসূলুল্লাহ ﷺ!
আপনি মানুষকে কতই না আপন করে নিতে জানতেন! শত মান অভিমান, ভালোবাসার সমীকরণ আপনার কাছে এসেই সহজ হয়ে যেত!
এই ঘটনা পড়লে নিজের ঘরের কথাও মনে পড়ে। আমাদের কাছের মানুষগুলো কতবার একটু আশ্বাস চায়! অথচ আমরা তাদের কথার সঙ্গে তর্ক করতে করতেই কবরে পৌঁছে যাই।
সন্তান বলে, “তুমি শুধু ছোট ভাইটাকেই আদর করো!”
আমরা সঙ্গে সঙ্গে বলে দিই, “এত হিংসা করো কেন? তোমার মাঝে কৃতজ্ঞতা নাই!”
কিন্তু একটু কাছে বসিয়ে জিজ্ঞেস করি কখনো, “বাবা, তোমার কেন এমন মনে হচ্ছে?” হয়তো সে কয়েক দিন ধরে মায়ের সঙ্গে একা একটু সময়ই পাচ্ছে না। হয়তো তার গল্পগুলো বারবার মাঝপথে থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। হয়তো তার স্কুলে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা গুলো শোনার কেউ নেই।
স্ত্রী বলেন, “সবার জন্য তোমার সময় আছে, শুধু আমার জন্য নেই।”
স্বামী তখন সংসারের জন্য কত পরিশ্রম করেন, তার হিসাব দিতে শুরু করেন। পরিশ্রমগুলো সত্যি। তবু পাশে বসে স্ত্রীর কথাটুকু শোনাও তো প্রয়োজন। তিনি ঠিক কোন জায়গায় একা বোধ করছেন, এইটুক শোনাই তো ভালোবাসারই অংশ। এতেই তো সমাধান হয়ে যায়।
কেউ কষ্ট পেলেই আমার সিদ্ধান্ত ভুল হয়ে যায় না। কিন্তু আমার সিদ্ধান্ত সঠিক হলেও তার মান অভিমান শোনা যায়। কারণটা বুঝিয়ে বলা যায়। তার জীবনে আমার উপস্থিতিটুকু আরও যত্নের করা যায়। যে আমার জন্য ভালো যা যা করেছে, সেগুলোর জন্য ধন্যবাদ বলা যায়।
রাসূল ﷺ-এর এই ঘটনা থেকে আমি এই শিক্ষাটাও পাই। মানুষকে বোঝাতে হলে তার সঙ্গে বসতে হয়। তার কথাও শুনতে হয়। আর সে আমার কাছে কতখানি আপন, সেটা তাকে জানাতে হয়।
আমরা যারা দ্বীনের কথা বলি, মানুষের কাছে দাওয়াহ পৌঁছাতে চাই, আমাদেরও তো এই যত্নটুকু শেখা প্রয়োজন। কেউ মনে কষ্ট নিয়ে এলে সঙ্গে সঙ্গে তার ঈমানের দুর্বলতা ধরতে বসি কেন? এত জাজ করলে কীভাবে হবে? আগে একটু শুনি। তারপর প্রয়োজনীয় কথাটা ভালোভাবে বলি।
আর ভালোবাসার আশ্বাস যেন আমাদের আচরণেও থাকে। সন্তানের জন্য সময় রাখা, জীবনসঙ্গীর কথা মন দিয়ে শোনা, বন্ধুর খোঁজ নেওয়া। শুধু বাজারের ব্যাগ হাতে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে দিলে মানুষ আবারও একা বোধ করতে পারে।
হয়তো ভাল দুইটা কথা বলতে আমাদের খুব বেশি কিছু ছাড়তে হবে না।
শুধু একটু অহংকার। এটা ছাড়লেই হবে।
আমরা যে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উম্মত, প্রিয় পাঠক!
সেই পরিচয়টাই আমাদের আপন মানুষগুলোও একটু অনুভব করুক।
_______________________
রসূলের ﷺ গল্প শুনি ৫
শারিন সফি অদ্রিতা
১৪৪৮, রবিউল আউয়াল
হাদিস সূত্র: মূল ঘটনা সহিহ আল-বুখারি ৪৩৩০ ও ৪৩৩১।
আনসারদের অবদানের বিস্তারিত উল্লেখ, দুআ ও দাড়ি ভিজে যাওয়ার বর্ণনা মুসনাদ আহমাদ ১১৭৩০-এ এসেছে। শুআইব আল-আরনাউত এর সনদকে [হাসান বলেছেন] একই ঘটনার একাধিক বর্ণনা মিলিয়ে এখানে লেখা হয়েছে। হাদিসের বক্তব্যগুলো বাংলায় অর্থানুসারে উপস্থাপিত।