09/08/2026
একটা সময় প্রায়ই খবরে দেখতাম, গ্রামের কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে গরুর মাংস কম দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিশাল মারামারি হয়েছে। কখনো ৮ জন নিহত, ১৬ জন আহতের মতো ঘটনাও দেখেছি।
তখন সত্যিই ভাবতাম, সামান্য কিছু গরুর মাংসের জন্য একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে কীভাবে মেরে ফেলতে পারে?
ব্যবসা শুরু করার পর অবশ্য মানুষের আচরণের অনেক কিছুই নতুন করে বুঝতে শিখেছি।
কারণ Fragcy-এর মাধ্যমে এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে প্রতিদিন যোগাযোগ হয়। আর এই যোগাযোগের মধ্যে ভালো অভিজ্ঞতার পাশাপাশি এমন কিছু অভিজ্ঞতাও হয়, যেগুলো সত্যিই অবাক করে।
আমাদের কখনো ভুল হয় না এমন দাবি আমরা করি না।
আমরা মানুষ। ভুল আমাদেরও হয়।
কোনো ভুল হলে সেটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি না। যতটা সম্ভব সমাধান করার চেষ্টা করি। অনেক সময় আমাদের পক্ষ থেকে ভুল হলে আমরা নিজেরাই সরি বলি এবং কাস্টমারকে কীভাবে সমস্যাটা সমাধান করে দিতে পারি, সেটা নিয়ে কথা বলি।
কিন্তু কিছু ঘটনা আছে, যেখানে সমস্যার চেয়ে মানুষের আচরণটাই বেশি অবাক করে।
বেশ কিছুদিন আগে একজন সম্মানিত ইন্টার্ন ডাক্তার আমাদের কাছে অর্ডার করেছিলেন। তার আগের কুরিয়ার রেকর্ডে বেশ কয়েকটি ক্যানসেল রিপোর্ট থাকায় আমরা এবার শুধু ডেলিভারি চার্জটা অগ্রিম চেয়েছিলাম।
ব্যস, এতেই তিনি ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে আমাদের অপমান করা শুরু করলেন। নিজের বড়ত্ব বোঝানোর জন্য তার ব্যক্তিগত বিশাল পারফিউম কালেকশনের ছবি আমাদের ইনবক্সে পাঠালেন।
তবে ছবিটা আমার কাছে বেশি পারফেক্ট মনে হওয়ায় গুগল লেন্স দিয়ে যখন সার্চ করি, তখন দেখি তিনি ছবিটা Pinterest থেকে ডাউনলোড করে দিয়েছিলেন।
এরপর সেই ছবির সঙ্গে আমাদের “দুই টাকার দোকানদার” বলেও অপমান করলেন।
প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো ফেক আইডি থেকে কেউ এসব করছে।
পরে প্রোফাইল ভিজিট করে দেখলাম, না, আইডিটা ফেক নয়। তিনি সত্যিই একজন ইন্টার্ন ডাক্তার।
এই ঘটনা কোনোভাবেই ডাক্তারদের নিয়ে মন্তব্য নয়। আমাদের শত শত ডাক্তার কাস্টমার আছেন, এবং তাদের সঙ্গে আমাদের অভিজ্ঞতা বরাবরই খুব ভালো। এই ধরনের আচরণের অভিজ্ঞতা আমরা শুধু এই একজনের কাছেই পেয়েছি।
আরেকটা ঘটনা আরও অন্যরকম।
একজন গ্রামের মেম্বার আমাদের কাছে অর্ডার কনফার্মেশনের পরে আলাদা করে একটি ফ্রি স্যাম্পল চেয়েছিলেন।
সেদিন মডারেটর অসুস্থ ছিল। এজন্য সে একটু কাজের প্রতি অমনোযোগী ছিল। একসঙ্গে অনেকজন কাস্টমার একই সঙ্গে টেক্সট করায় মডারেটর খেয়াল করতে পারেননি যে তিনি পরবর্তীতে ফ্রি স্যাম্পল চেয়েছিলেন।
তবে আমাদের যেহেতু ফ্রি স্যাম্পলের কোনো অপশন নেই, মডারেটরের উচিত ছিল সেসময় তৎক্ষণাৎ বলা যে, আমাদের ফ্রি স্যাম্পলের অপশন না থাকলেও খুবই অ্যাফোর্ডেবল প্রাইসে ২ মিলি টেস্টার রয়েছে।
এটা আমাদের ভুল ছিল।
অর্ডার রিসিভের পরে যখন তিনি আমাদের কে কমপ্লেইন জানান তখন আমরা সরি বলেছি। বলেছি, পরবর্তী অর্ডারে অবশ্যই স্যাম্পলটি দিয়ে দেব। এমনকি দরকার হলে পরেরবার ফ্রি দেওয়ার কথাও বলেছি।
তবে তিনি সমাধানে আসতে নারাজ।
তিনি অহংকার করে বললেন, তিনি অনলাইন থেকে প্রচুর কেনাকাটা করেন। ডেলিভারি ম্যান তাদের বাসায় এত বেশি যাতায়াত করে যে মাঝেমধ্যে তিনি বাসায় না থাকলে ডেলিভারি ম্যান তার পকেটের টাকা দিয়ে তাকে পার্সেল দিয়ে দেয়। আর বলে, “আপনার টাকা পরে দিয়েন।”
তিনি একটা আতরই ২৪ বারের বেশি কিনেছেন।
অথচ তার নাম্বার প্লেস করে অর্ডার হিস্টোরি রেকর্ড দেখলাম, তিনি সর্বমোট ১৫ বার অনলাইন থেকে কেনাকাটা করেছেন।
ব্যাপারটা এমন হয়নি যে তিনি কোনো কিছু টাকা দিয়ে কিনেছেন কিন্তু আমরা সেটা না দিয়ে তার টাকা মেরে দিয়েছি।
বরং তিনি যা যা অর্ডার করেছেন, তার সবই পেয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি একটা ফ্রি স্যাম্পল চেয়েছিলেন প্রথমবারের কাস্টমার হিসেবে, তবে কমিউনিকেশন গ্যাপের কারণে আমাদের যে ফ্রি সেম্পল অপশন নেই সেটা আমরা জানাতে পারি নি।
এই কারণে তিনি আমাদেরকে কল করে ১৫ মিনিট ৩৬ সেকেন্ড ধরে রাগারাগি করেছেন।
যদিও আমরা বলেছি, এবার আমরা পাঠাতে ভুলে গিয়েছি। আমরা ইনশাআল্লাহ পরেরবার পাঠিয়ে দিব, যদি কিছু অর্ডার করেন।
তবুও তিনি মানতে নারাজ। কারণ তিনি অনেক বড় কাস্টমার এবং তিনি আমাদের বলছেন যে,
“আমার মতো কাস্টমার যে আপনি পেয়েছেন, এটা আপনাদের সৌভাগ্য। আপনার জায়গায় আমি থাকলে এমন কাস্টমার পেলে মাথায় তুলে রাখতাম। আমি সব সময় নতুন নতুন আতর ব্যবহার করি এবং আমি এক আতর দুইবার ব্যবহার করি না।”
অথচ তিনি একটু আগে নিজেই বলেছিলেন তিনি একটি আতরই ২৪ বার কিনেছেন।
আসলে কিছু মানুষ যখন রেগে যায়, তারা নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করতে এমন কিছু কথা বলে যার কোন ভিত্তি থাকেনা এবং এতে তার সম্মানই নষ্ট হয়।
যেমন কিছুদিন আগে ইংলিশ মিডিয়ামের একজন মডেল অহংকার করে বলেছিলেন তার গাড়ি এতই বড় যে মিরপুরের রাস্তা দিয়ে তার গাড়ি ঢুকে না। অথচ মিরপুরের রাস্তা ঢাকার মধ্যে অন্যতম প্রশস্ত রাস্তা গুলোর একটি।
কাস্টমার হওয়া অবশ্যই সম্মানের।
কিন্তু কাস্টমার হওয়ার কারণে কাউকে অসম্মান করার লাইসেন্স পাওয়া যায় না।
আপনি আমাদের কাছ থেকে ১,০০০ টাকার পণ্য কিনুন কিংবা ১০,০০০ টাকার, আমাদের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি সম্মানেন কোনো পার্থক্য থাকবে না।
কেউ বেশি অংকের কেনাকাটা করলেই আমরা তাকে আলাদা কোনো বিশেষ সুবিধা দিই না। একইভাবে, কেউ অল্প পরিমাণে কেনাকাটা করলেও তাকে ছোট কাস্টমার হিসেবে দেখি না।
আমরা প্রত্যেক কাস্টমারের সঙ্গে একই আন্তরিকতা, সম্মান এবং গুরুত্ব দিয়ে আচরণ করি। কারণ আমাদের কাছে একজন কাস্টমারের মূল্য তার অর্ডারের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না।
তবে আপনি আমাদের কীভাবে মনে থাকবেন, সেটা অনেকটাই আপনার ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে।
কিছু কাস্টমার আছেন, কোনো সমস্যা হলে খুব সহজভাবে বলেন,
“ভাই, একটা সমস্যা হয়েছে, একটু দেখবেন?”
আমরা সমস্যাটা দেখি, ভুল হলে সরি বলি এবং সমাধান করার চেষ্টা করি।
আবার এমন কাস্টমারও আছেন, যারা মনে করেন ১,০০০ বা ২,০০০ টাকা খরচ করেই তারা এমন একটা অবস্থানে চলে গেছেন, যেখানে ব্যবসায়ীর সঙ্গে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই কথা বলা যায়।
একটু ভুল হলেই অপমান, হুমকি, নিজের টাকা-পয়সা বা পরিচয় জাহির করা শুরু হয়।
কিন্তু মজার ব্যাপার কী জানেন?
আমাদের সবচেয়ে বড় এবং পুরোনো কাস্টমারদের অনেকেই এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
এমন অনেক কাস্টমার আছেন, যারা গত ২-৩ বছর ধরে আমাদের কাছ থেকে নিয়মিত কিনছেন। অনেক সময় একসঙ্গে ৫-১০ হাজার টাকারও অর্ডার করেন।
কিন্তু তাদের কোনো সমস্যা হলে কথাটা হয় খুব সাধারণ,
“ভাই, একটু সমস্যা হয়েছে। দেখবেন?”
এখানে তিনি নিজের সম্মান কমান নি বরং আমাদের কাছে তার সম্মান বেড়ে যায়।
তারা সমস্যাটা বলছেন, আমরা সমাধান করছি।
সম্ভবত নিজের অবস্থান বোঝানোর জন্য অন্য কাউকে ছোট করার প্রয়োজন তাদের হয় না বলেই।
মানুষের অবস্থান আসলে সে কত টাকা খরচ করে, কী পদে আছে, কোথায় পড়েছে কিংবা কী পরিচয় দেয়, সেটা দিয়ে বোঝা যায় না।
মানুষকে বোঝা যায় তার ব্যবহারে।
আপনি অনেক টাকা খরচ করতে পারেন। বড় কোনো পদে থাকতে পারেন। অনেক বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারেন।
কিন্তু একজন ডেলিভারি ম্যান, কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধি, ছোট ব্যবসায়ী কিংবা অনলাইনে কাজ করা একজন উদ্যোক্তাকে অপমান করলে আপনার অবস্থান একটুও বড় হয় না।
শুধু আপনার ব্যবহারটা অন্যদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়।
কেউ আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে, শুধু একজন কাস্টমারকে ধরে রাখার জন্য আমরা মরিয়া হয়ে যাই না।
এর কারণ খুব simple: আমাদের ব্যবসা কোনো একজন কাস্টমারের ওপর নির্ভরশীল নয়। একইভাবে, Fragcy টিমের কারও আয়ের একমাত্র উৎসও এই ব্যবসা নয়। তাই কোনো কাস্টমারকে ধরে রাখার জন্য আমাদের নিজেদের সম্মান, নীতি বা কাজের পরিবেশের সঙ্গে আপস করার প্রয়োজন নেই।
মূলত এই কারণেই, গত এক বছর ধরে ব্যবসায় লোকসান হলেও আমরা Fragcy বন্ধ করে দিইনি। লাভের জন্য নয়, বরং প্যাশন, ভালো লাগা এবং মানুষের জন্য একটি ভালো সার্ভিস ধরে রাখার ইচ্ছা থেকেই আমরা এখনও এটি চালিয়ে যাচ্ছি।
আমরা এমন কাস্টমার চাই, যারা আমাদের পণ্য নিয়ে প্রশ্ন করবেন, সমস্যা হলে জানাবেন, ভুল হলে ধরিয়ে দেবেন। আমাদের সার্ভিসে কোথাও সমস্যা থাকলে সেটা বলবেন।
আমরা সেটাকে স্বাভাবিকভাবেই নেব।
কারণ অভিযোগ করা কাস্টমারের অধিকার।
কিন্তু কাউকে অপমান করা কোনো কাস্টমারের অধিকার নয়।
আমাদেরও ভুল হবে। আপনার অর্ডারে কোনো ভুল হলে অবশ্যই আমাদের জানাবেন। আমরা ভুল স্বীকার করতে দ্বিধা করি না, এবং সম্ভব হলে সমাধানও করব।
শুধু একটা পার্থক্য মনে রাখা দরকার।
সমাধান চাওয়া আর কাউকে অপমান করা এক জিনিস নয়।
আমরা কাস্টমারকে সম্মান করি। কারণ আমাদের ব্যবসার পেছনে কাস্টমারদের আস্থা এবং সহযোগিতা রয়েছে।
আর সেই সম্মানটা আমরা দুদিক থেকেই দেখতে চাই।
আপনি আমাদের সম্মান করবেন, আমরাও আপনাকে সম্মান করব।
শেষ পর্যন্ত মানুষকে তার টাকা দিয়ে নয়, তার ব্যবহার দিয়েই মনে থাকে।