07/10/2023
"তোমার মতো ২৫ বছর বয়সী বুড়ি কে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয় প্রিয়া।
আমি এখন তোমার চেয়ে সুন্দরী মেয়ে ডিজার্ভ করি।তাই আমায় ভুলে গিয়ে তুমি তোমার বাবা-মার পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করে নাও।আমিও তাই করছি।ফ্যামিলি থেকে যে মেয়েকে আমার জন্য ঠিক করা হয়েছে সে তোমার চেয়েও অনেক সুন্দর।আর আমি তাকেই বিয়ে করতে চাই।মেয়েটার বয়স আঠারো।আমার তার সাথে যায়,তোমার সাথে নয়"।
রাহুল এক নাগাড়ে প্রিয়াকে কথা গুলো বললো।প্রিয়া ভাবতে পারছে না রাহুল কখনো ওকে এভাবে কথা বলবে।মুহুর্তে প্রিয়ার চোখ ভিজে গেলো।প্রিয়া চোখ মুছে বলল,
->তাহলে এই চার বছরের ভালোবাসা কি মিথ্যা ছিলো?
->হুম ছিলো।আর সত্যি বলতে তুমি আমায় কখনো ভালোবাসো নি।যদি ভালোবাসতে তাহলে আমার আবদার এতদিন ঠিক পূরণ করতে।কিন্তু আজ পর্যন্ত তুমি তোমার হাত ধরা ব্যতিত আর কিছু করতে দাওনি।
->ও আচ্ছা এই আবদার পূরণ করিনি বলে আমি তোমায় কখনো ভালোবাসি নি তাই তো?
->হুম তাই।
->আরে বেঈমান তোর জন্য আমি কি না করেছি,যখন যে টাকা চেয়েছিস তাই দিয়েছি।তোর পরিবার যখন অভাবে পড়েছিলো তখন আমি তোদের পাশে দাড়িয়েছি শুধু তোকে ভালোবাসি বলে,তোর জন্য কত বিয়ে ভেঙ্গেছি,আমার সব বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক শেষ করেছি তুই এসব পছন্দ করিস না বলে আর আজ বলছিস আমি তোকে ভালোবাসি না।সরকারি চাকরি পেয়ে খুব অহংকার হয়েছে তোর মনে তাই না?তুই তোর অহংকার নিয়ে থাক।আজ তোর আসল রুপ আমি দেখতে পেলাম।
->ধুর যাও তো।তোমায় আর দেখতে ইচ্ছা করছে না।আর যে টাকা দিয়েছো না সব দিয়ে দিবো।
->ভাগ্যিস আবেগে পড়ে নিজেকে দান করিনি তাহলে আজ শূন্যে হাতে ফিরে যেতে হতো।
->এত কথা ভালো লাগছে না।আমার কাজ আছে।আর হ্যাঁ আজকের পর থেকে আমায় যেন আর ডিস্টার্ব না করা হয়।
এই বলে রাহুল চলে যেতে লাগলো।প্রিয়া রাহুলের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো।বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।
প্রিয়া আর রাহুলের সম্পর্কের বয়স চার বছর।রাহুল প্রিয়ার চেয়ে বছর পাঁচেকের বড়।প্রিয়া উচ্চবিত্ত ফ্যামিলির মেয়ে।দেখতে বেশ সুন্দর।ফর্সা গায়ের রং।দেহের গঠন মিডিয়াম।বেশি মোটাও না আবার বেশি পাতলাও না।প্রিয়া হাসলে গাল ফুলে উঠে।রাহুল নাকি এই হাসি দেখেই প্রিয়ার প্রেমে পড়েছিলো।
রাহুল মধ্যেবিত্ত পরিবারের ছেলে।দেখতে বেশ সুদর্শন ছিলো।সে প্রায় প্রিয়ার জন্য রাস্তায় দাড়িয়ে থাকতো।বলা যায় প্রিয়ার জন্য রাহুল একদম পাগল ছিলো।এমনকি রাতের বেলা প্রিয়ার বাড়ির সামনে রাহুল এসে দাড়িয়ে থাকতো।তাই প্রিয়া রাহুলকে ফিরিয়ে দিতে পারেনি।
রাহুলের বাড়ি ছিলো গ্রামে।সে লেখাপড়ার জন্য শহরে মেসে থাকতো।রাহুলের পরিবারের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো ছিলো না তাই প্রিয়া মাঝেমধ্যে ওকে টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্যে করেছে।
রাহুলের ব্যাপারে জানার পর প্রিয়া বাবা ওকে মেনে নিতে চায়নি।কারন রাহুলকে ওর বাবার সু্বিধার মনে হতো না।কিন্তু প্রিয়ার জেদের কাছে ওর বাবাকে হার মানতে হয়েছিলো।প্রিয়ার বাবা বলতো,
->মা দুনিয়াতে এখনো অনেক ভালো ছেলে আছে।এই রাহুল ছেলেটা ভালো না।সে শুধু তোকে ব্যবহার করছে।সুযোগ বুঝে সে দৌড় মারবে।তাই মা এমন কিছু করিস না যাতে আমাদের মান-সম্মান নষ্ট হয়।
->নিশ্চিন্তে থাকো বাবা আমি এমন কিছু করবো না।
->জানি কিছু করবি না তারপরও ভয় হয় রে মা।
প্রিয়া আর কিছু বলে না।
যেদিন প্রিয়া রাহুলের চাকরি পাওয়ার কথা শুনেছিলো সেদিন সে অনেক খুশি হয়েছিলো।কারন রাহুলের চাকরি পাওয়া মানেই দুইজনের ভালোবাসার পূর্ণতা পাওয়া।রাহুলের চাকরি হয় অনেকটা দুরে।যেতে ৬-৭ ঘন্টা সময় লাগে।
রাহুল চাকরি পাওয়ার পর থেকে কেমন যেন বদলাতে শুরু করে।প্রিয়ার সাথে তেমন একটা কথা বলেনা।প্রিয়া ফোন করলে নানারকম অজুহাত দেখিয়ে কল কেটে দেয়।আবার বেশির ভাগ সময় ফোন বিজি থাকে।এসব দেখে প্রিয়ার সন্দেহ হয়।মনে মনে ভাবে,রাহুলের ফোন এত বিজি থাকে কেন?তবে কি অন্য কেউ ওর জীবনে এলো?
এসব ভেবে প্রিয়ার বেশ ভয় হয়।তাই সে রাহুলের সাথে দেখা করার জন্য ও যেখানে চাকরি করে সেখানে চলে আসে।আর দেখা হওয়া মাত্রই রাহুল প্রিয়াকে উপরোক্ত কথাগুলো বলে।
প্রিয়ার পার্কের এক বেঞ্চে বসে পড়ে।বুক ফেটে কান্না আসছে ওর।এতদিনের ভালোবাসার দাম এভাবে দিবে সে ভাবতে পারছে না।সত্যি সে রাহুলকে ভালোবেসে,বিশ্বাস করে খুব বড় ভুল করেছে।যার শাস্তি আজ ওকে পেতে হলো।
সন্ধ্যা বেলা,,,,।
প্রিয়া স্টেশনে বসে আছে।একটু পর ট্রেন আসবে।সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি তাই শরীর বেশ দূর্বল লাগছে।বাড়ি থেকে প্রিয়ার বাবা-মা অনেক ফোন করেছে।প্রিয়া ওর বাবা-মাকে বলেনি যে সে রাহুলের সাথে দেখা করতে এসেছে।কারন রাহুলের কথা বললে ওকে কখনোই আসতে দিতে না।তাই তো সে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে এখানে চলে এসেছে।প্রিয়া ট্রেনে উঠে পড়লো।কিছুক্ষণ বাদেই ট্রেন ছেড়ে দিবে।প্রিয়ার সিট পুরোটাই ফাঁকা।সামনের ছিটে একজন লোক বসে থেকে পেপার পড়ছে।এমন ভাবে পেপার পড়ছে যে ওর চেহারা ঠিক মতো দেখা যাচ্ছে না।তখন প্রিয়ার পাশে একজন লোক এসে বসলো।বয়স পঞ্চাশের বেশি হবে।
একটু বাদেই ট্রেন ছেড়ে দিলো।সারাদিন প্রিয়ার খাওয়া-দাওয়া না করায় মাথা ব্যথা করছে।তাই সে ট্রেনের জানালার সাথে মাথা রেখে বাইরে দৃশ্য উপভোগ করতে শুরু করলো।বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার।মাঝেমধ্যে দূর-দূরান্তে হালকা আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে।কখনো বা মাঝেমধ্যে ছোটখাটো বন্দরের দেখা মিলছে।অনেকক্ষণ যাবৎ কান্না করায় চোখ জ্বালা করছে।এমন সময় হঠাৎ প্রিয়ার পাশে বসে থাকা লোকটি হঠাৎ প্রিয়ার গায়ের সাথে ধাক্কা খেলো।তখন প্রিয়া ভ্রু কুচকে লোকটির দিকে তাকাতেই সে বলে উঠলো,
->কিছু মনে করো না মা ট্রেনের ঝাকুনিতে ধাক্কা লেগে গেছে।
->ট্রেনে ঝাকুনি লাগে?আজই প্রথম শুনলাম।
->কেন তুমি টের পাওনি?
প্রিয়ার বুঝতে বাকি রইলো না যে লোকটি এটি ইচ্ছা করে করেছে।
লোকটির কথা প্রিয়ার সামনে বসে থাকা লোকটি শুনছিলো আর মুচকি হাসছিলো।তারপর সে মুখের সামনে থেকে পেপার সরিয়ে ওর পাশে রাখলো।প্রিয়া প্রথমবারের মতো ওর সামনে বসা লোকটিকে দেখলো।ওর বয়স ২৬-২৭ এর মতো হবে।প্রিয়ার কেন জানি ছেলেটাকে চেনা চেনা লাগছে।মনে হচ্ছে তাকে আগে কোথাও দেখেছে।কিন্তু কোথায় দেখেছে তা মনে করতে পারছে না।
প্রিয়া তাকে নিয়ে বেশি ভাবলো না।সে আবার বাইরে দিকে তাকালো।কিন্তু সে লক্ষ্য করলো ওর পাশে বসে থাকা লোকটি সুযোগ পেলেই কোনো না কোনো ভাবে প্রিয়ার গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করছে।এতে প্রিয়ার বেশ অস্বস্তি হচ্ছে।মনে মনে ভাবছে,এর চেয়ে বাসে যাওয়া অনেক ভালো ছিলো।শুধু বমি হয় বলে ট্রেনে উঠতে বাধ্য হয়েছে।
এমন সময় প্রিয়ার সামনে বসা ছেলেটি ওর সিটের মাঝখানে অর্থাৎ প্রিয়ার পাশে বসা লোকটির মুখোমুখি বসলো।তারপর ছেলেটি পানি খেতে গিয়ে হঠাৎ লোকটির গায়ে কুলি করে দিলো।এটা দেখে সেই লোকটি রে"গে গিয়ে বলল,
->এই বেয়াদব ছেলে আমার গায়ে কুলি করে দিলেন কেন?
->সরি সরি কাকু।আসলে ট্রেনে ঝাঁকুনি লাগছিলো তো তাই মুখ থেকে পানি বের হয়ে গেছে।
প্রিয়া:-আপনারা কি শুরু করেছেন বলুন তো?
তখন ছেলেটি বলল,
->রাগ করবেন না ম্যাডাম ঝাঁকুনি না লাগলে এমন কখনো হতো না।
এবার বয়স্ক লোকটি ছেলেটির ওপর রে"গে গিয়ে বলল,
->অসভ্য ছেলে ট্রেনে কখনো ঝাঁকুনি লাগে?
->সেকি কাকু,! যখন আপনি ম্যাডামের সাথে ধাক্কা খেলেন তখন নিজেই তো বললেন ট্রেনের ঝাকুনিতে ধাক্কা খেয়েছেন।আপনি খেলে আমি খাবো না কেন বলেন?
লোকটির অবস্থা চোর ধরা পড়ার মতো হয়ে গেলো।প্রিয়ার বুঝতে বাকি রইলো না যে ছেলেটি এই কাজের শা"স্তি স্বরুপ ইচ্ছাকৃত ভাবে এটা করেছে।ব্যাপারটা প্রিয়ার বেশ ভালো লাগলো।কিন্তু ছেলেটিকে বেশ চেনা লাগছে ওর।অন্ধকারে ঠিক মতো চেহারা দেখা যাচ্ছে না।আবছা আলোয় যতটুকু দেখেছে ততটুকু দেখে এমনটা মনে হচ্ছে ওর।
ছেলেটি আবার বলে উঠলো,
->জানেন কাকু গাড়িতে করে যখন কোথাও যাই তখন সারা রাস্তা ভালো থাকে আর যেই মাত্র আমি পানি খেতে শুরু করি আর তখনই গাড়ি দেয় ঝাঁকুনি।আর তখনই আমার পাশে যে থাকে তার অবস্থা একদম আপনার মতো।তবে এতটা খারাপ হয় না।আপনি আমার সামনে বসে আছেন তো তাই এমন হওয়া স্বাভাবিক।আর আজ কেন জানি খালি পানি খেতে ইচ্ছা করছে।
এই বলে ছেলেটি পানি মুখে দিলো তারপর আবার লোকটির গায়ে কুলি করে দিলো।এটা দেখে প্রিয়া মুখ চেপে হাসতে লাগলো।লোকটি কিছু বলার আগেই ছেলেটি বলে উঠলো,
->দেখলেন কাকু আবার ঝাকুনি খেলাম।সারা রাস্তা এমনই হবে।
->অসভ্য ছেলে কোথাকার।মা-বাবা শিক্ষা দিতে পারেনি।
->সেম টু ইউ কাকু।
লোকটি রাগ দেখিয়ে চলে গেলো।আর অন্য একটা সিটে বসলো।প্রিয়া ছেলেটিকে বলল,
->থ্যাংকস লোকটিকে এভাবে শিক্ষা দেওয়ার জন্য।
ছেলেটি মুচকি হাসলো।তারপর বলল,
->কেমন আছেন ম্যাডাম?
->আছি তো ভালো।আপনি কি আমায় চিনেন?
->হুম ম্যাডাম।
->আপনি বার বার আমায় ম্যাডাম বলছেন কেন?
->আমি তো আপনাকে এটা বলে ডাকতাম।ভুলে গেলেন?
->তুমি তৌসিব?
->জ্বী ম্যাডাম।
প্রিয়া হেসে উঠলো।তারপর বলল,
->আসলে আমি চিনতে পারিনি।অনেক বদলে গেছো তুমি।
->না ম্যাডাম আমি এখনো আগের মতোই আছে।শুধু আপনিই আমার চেহারা ভুলে গেছেন।শুধু যে নামটা মনে রাখছেন এটাই অনেক।
->সত্যিই ভাবিনি তোমার সাথে আমার কখনো সামনাসামনি এমন আকস্মিক ভাবে দেখা হবে।
->আমার বিশ্বাস ছিলো একদিন আপনার সাথে কোনো এক অচেনা শহরে আকস্মিক ভাবে দেখা হবেই।
->সত্যিই তুমি আগের মতোই আছো।সবসময় বাস্তবতার চেয়ে কল্পনাগুলো বেশি প্রাধান্য দাও।আর এজন্য হয়তো তোমার কল্পনা বাস্তবতার রুপ নেয়।আর আমার অতিরিক্ত বাস্তবিক ভাব আমার কল্পনাগুলোকে মে"রে ফেলে।
->হুম।
প্রিয়া আবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো।পুরোনো কিছু কথা ভেবে চোখের কোণে আবার পানি চলে এলো।
প্রিয়ার জীবনে তৌসিব আর রাহুল দুইজনের আগমন ঘটেছিলো প্রায় এক সাথে।তবে প্রথম আগমন তৌসিবেরই হয়েছিলো।চার বছর আগে ফেসবুকের মাধ্যমে দুইজনের পরিচয় হয়।প্রথম একটু কথা বলা তারপর দুইজনের বন্ধুত্ব।প্রথমবারের মতো যখন তৌসিব প্রিয়ার ছবি দেখে তখনই প্রিয়াকে ভালো লেগে যায়।সে ওর মনের কথা প্রিয়াকে জানিয়ে দেয়।কিন্তু প্রিয়া রাজি হয় না।কারন প্রিয়ার মতে ফেসবুকের সম্পর্কগুলো বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই।যেখানে ডাটা অফ করলে কেউ কাউকে চিনে না।সেখানে ভালোবাসার সম্পর্কগুলো মূল্যহীন।তাই প্রিয়া তৌসিবের সাথে বন্ধু হিসেবে থাকতে চায়।কিন্তু তৌসিব আগের মতোই প্রিয়াকে ভালোবেসে যায়।এরপর প্রিয়ার রাহুলের সাথে সম্পর্ক হয়।তখন প্রিয়া তৌসিবকে ব্লক করে দেয়।ব্লক করার আগে তৌসিব প্রিয়াকে বলেছিলো,"আমি জানি একদিন তুমি ফিরে আসবে,আমি সেইদিনের অপেক্ষায় রইলাম"।তখন প্রিয়া বলে,
->নিজের কল্পনা থেকে বেরিয়ে এসো।এসব কখনো সত্যি হয় না।
->আমার কল্পনাগুলো একদিন বাস্তবতার রুপ নেয়।এটাও নিবে।
->হুম দেখা যাক।ভালো থেকো।
এই বলে প্রিয়া ব্লক করে দেয়।
চলবে,,,,,,।
অজানা_গন্তব্য।
পর্ব :-এক।
লেখা:-আকাশ আহমেদ
(পরবর্তী পর্ব খুব শীঘ্রই দেওয়া হবে)