18/05/2018
চুপ করে দরজার অন্য চাবি দিয়ে ঘরে
ঢুকে পড়ল আদনান। আজ খুশবুকে
সারপ্রাইজ দিবে। চুপেচুপে এদিক
সেদিক খুজে দেখল। অবশেষে
বারান্দায় পেল। পেছন থেকে খুশবুর
চোখ ধরল। সারপ্রাইজ উল্টো পেল
আদনান। কারণ আদনান যখন খুশবুর চোখ
চেপে ধরেছিলো খুশবুর চোখের
পানি আদনানের হাতে লেগে যায়।
খুশবু কাদছে। কারণটা আদনানের
জানা আছে। জানালা দিয়ে কিছু
বাচ্চা ছেলেদের খেলা দেখছে
খুশবু আর তা দেখেই কাদছে।
- আচ্ছা তুমি এই অযথা কান্নাকাটি
কেন কর? আল্লাহ যেমন রেখেছে
আমরা তেমনই খুশি আছি।
খুশবু আদনানকে জড়িয়ে ধরে কাদতে
লাগল।
- প্লিজ কেদো না। তাইলে কিন্তু
আমিও কেদে দিব। ভাত পানি কিছুই
খাব না।
খুশবু চেপে চেপে কাদতে লাগল।
> যাও ফ্রেশ হয়ে আস। আমি ডিনার
দিচ্ছি। (বহু কষ্টে কান্না চেপে বলল)
- ওকে লক্ষিটা। তবে প্লিজ কেদো
না।
আদনান ও খুশবু। আজ তাদের বিয়ের
প্রায় ৫ বছর। এরেঞ্জ ম্যারেজ। তবে
দুজনের মধ্যে ভালবাসার কোনো
কমতি নেই। এতক্ষণ খুশবু কাদছিল কারণ
তাদের কোনো সন্তান নেই।
ডাক্তার বলেছে খুশবু কখনো মা হতে
পারবে না।
খবরটি জানার পর আদনানের পরিবার
আদনাকে দ্বিতীয় বিয়ে করানোর
জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। কিন্তু
আদনান রাজি হয়নি। আদনানের
পরিবারের অনেকেই এর জন্য খুশবুকে
নানা রকম মানসিক অত্যাচার করত।
তাই আদনান আলাদা ঘর নিয়েছে।
আদনান ছাড়া খুশবুর এই দুনিয়ায় আর
কেউই নেই।
বিয়ের কিছু মাস পর খুশবুর বাবা
মারা যান। মা তো সেই ছোট
বেলাতেই মারা গিয়েছিলেন।
খুশবুর দুনিয়া বলতে আদনানই।
বিয়ের পর প্রত্যেক মেয়ের একটিই
আশা থাকে আর তা হল মাতৃত্বের সুখ।
সন্তানের মুখ থেকে "মা" ডাক কত মধুর
তা একজন মা-ই জানে।
পক্ষান্তরে "বন্ধ্যা"। এই শব্দটা একটি
মেয়ের জন্য তীব্র আর্তনাদায়ক।
আদানের মা প্রায় সময়ই খুশবুকে বন্ধ্যা
বলে ডাকে। খুশবু নীরবে সব সহ্য করে
যায়।
ডাইনিং টেবিলে
> কই তুমি এতক্ষণ লাগে ফ্রেশ হতে?
- এইতো ম্যাডাম, চলে এসেছি।
> হুম। এখন তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও।
- তুমি খাইয়ে দাও না!
> ইস! সখ কত! নিজে খাও।
- যাও আমি খাব না।
বলে উঠে যাচ্ছিল। খুশবু হাত ধরে বলল
চুপচাপ বস।
- না তুমি খাইয়ে দিলে বসব।
> আচ্ছা দিব। এক শর্তে
- কি!
> তুমি আমাকে খাইয়ে দিবা।
- ওকে। জানটুস।
এভাবেই চলছে তাদের জীবন।
একদিন
আদনানের মা খুশবুকে ব্যাপক অপমান
করল।
~ আমার বংশ শেষ। এই বন্ধ্যা মেয়ের
জন্য আমার বংশটা শেষ। তুই মেয়ে না
অজগর একটা বংশ খেয়ে ফেললি।
জন্মের পর মা, বিয়ের পর বাবা আর
এখন আমার বংশ খেয়ে ফেললি! কবে
যেন আমার ছেলেকেও খেয়ে
ফেলিস। ওরে ও কাল নাগিনী আমার
ছেলেঢারে মুক্তি দে।
কথাগুলো শুনে খুশবু নীরবে কাদতে
লাগল আর ভাবতে লাগল আসলেই সে
কুলক্ষি। যে ঘরে যায় সে ঘরকে শেষ
করে দেয়।
সেই রাতে ঘুমানোর সময় খুব
কান্নাকাটি করে। আদনান হঠাৎ
উঠে দেখে খুশবু পাশে নেই।
বারান্দায় যেয়ে দেখে খুশবু
কাদছে। আদনান পেছন থেকে
জড়িয়ে ধরল।
- আচ্ছা তুমি যদি শক্ত না থাক তবে
আমার কি হবে?
খুশবু কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল
> তুমি আরেকটা বিয়ে কর।
আদনান অবাক হল।
- কি যা তা বলছ হ্যা!
> সত্যি বলছি। তুমি আরেকটা বিয়ে
কর। আমি কোনো বাধা দিব না। শুধু
এই ঘরে ঠাই দিও। আমি এই ঘরের
এককোণায় পড়ে থাকব।
- ও বুঝেছি। আজ মা এসেছিল তাই
না?
> দেখ যা সত্য তাই বলছি। আমি
বন্ধ্যা……
আদনান খুশবুর চুপ চেপে ধরল।
- চুপ একদম চুপ। চল ঘুমাবে।
সকালে আদনান নাস্তা করে
অফিসে চলে গেল। হঠাৎ ঘর থেকে
ফোন এল
= হ্যালো আদনান সাহেব আমি
আপনাদের বাড়ির দারোয়ান বলছি।
আপনি তাড়াতাড়ি ন্যাশনাল
হাসপাতালে চলে আসুন। আপামনি
আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে।
আদনান দ্রুত হাসপাতালে চলে
এলো।
ডাক্তারঃ স্যরি আদনান সাহেব।
আপনার ওয়াইফকে বাচাতে পারলাম
না।
কথাটি শুনে আদনানের দুনিয়াটা
অন্ধকার হয়ে গেল। আদনান বসে পড়ল।
দারোয়ান একটি চিঠি দিয়ে বলল
= এটা আপামনির হাতে ছিল।
আদনান খুলল চিঠিটা।
জানের টুকরা
ক্ষমা করিও। জীবন যুদ্ধে হেরে
গেলাম। আসলে কিছু কষ্ট নিয়ে
বেচে থাকা সম্ভব নয়। আমি কখনোই
মা হতে পারব না। এই কথাটি যতটা
আমাকে কাদায় ততটাই তোমাকে
কষ্ট দেয়। ততটাই কষ্ট দেয়
পরিবারকেও। আমি তোমাকে কখনো
বাবা ডাক শুনাতে পারব না। আমার
জন্য তোমাদের বংশ কেন থেমে
যাবে! বিয়ের পর থেকে তুমি
আমাকে অনেক ভালবাসা দিয়েছ।
যার ঋণ আমি কখনো শোধ করতে পারব
না। পরিবারবিহীন এই মেয়েটিকে
কখনো দুঃখ কি তা বুঝতে দাওনি।
বিনিময়ে আমি দিয়েছি শুধু কষ্ট আর
কষ্ট। তুমি আরেকটি বিয়ে করে নিও।
যদি পার তোমাদের প্রথম সন্তানের
নাম ফয়সাল / মৌ রাখিও। আমার
দোয়া ও শুভকামনা রইলো তোমার
প্রতি। ভাল থেকো। ক্ষমা করিও।
ইতি তোমার অপরাধী
আজ খুশবু ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী। আদনান
ঘরের কোণে বারান্দায় দাড়িয়ে
আছে। ঘরের ভেতরে যেয়ে বলল
- কি গো তুমি এখনো ঘুমাচ্ছ! উঠবে
না। তাড়াতাড়ি উঠ। জানই তো
আজকের দিনটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
- এখনো উঠছে না। দাড়াও আমিই
তুলছি।
বিছানায় যেয়ে বড় কোল
বালিশটাকে টেনে তুলল।
- এই যে মহারানী এখন উঠুন। ফ্রেশ হয়ে
আসুন। ফয়সালের জন্য নাস্তা
বানাতে হবে তো। ... ফয়সাল উঠ
বাবা
বলে ছোট কোল বালিশটাকেও
টেনে তুলল।
সে দিনের পর থেকে আদনান তার
মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।
সে এখনো ভাবে তার খুশবু তার
কাছেই আছে। সে সবসময় বালিশের
সাথেই কথা বলে। বালিশের
সাথেই খেলা করে। বালিশের
সাথেই রাগ করে। এখন এই বালিশ
দুটোই তার জীবন।
আদনান বালিশ দুটোকে বারান্দায়
নিয়ে গেল। তারপর তাদের সাথে
কথা বলতে লাগল।
আড়াল থেকে এসব দেখে কাদছে
আদনানের মা বাবা ও অন্যরা।
আজ আদনানের এই পরিস্থির জন্য দোষ
কার? খুশবুর অপমৃত্যুর জন্য দোষ কার?
তাই সবার কাছে একটাই অনুরোধ....
সন্তানহীন কাউকে কষ্ট দিবেন না।
তাদের জীবন এমনিই নরক,
আর কষ্ট দিয়ে তাদের বাঁচার ইচ্ছাটাকে
মেরে ফেলবেন না।