17/12/2022
সুরা হজ্জ্ব
********
৩. এবং (ওয়া) হইতে (মিন) মানুষদের (লোকদের) (নাসি) যে (মান) তর্ক (বিতর্ক, বাদানুবাদ, সংশয়, অনুমান) করে (ইউজাদিলু) মধ্যে (ফি) আল্লাহর (আল্লাহি) না জানিয়া (বিগাইরি) কোনো এলেম (জ্ঞান) (ইমিউ এবং (ওয়া) অনুসরণ করে (ইয়াততাবিউ) প্রত্যেক (কুললা) শয়তানকে (শাইতোয়ানিম্) গর্বিত (উদ্ধত, অবিনীত, ধৃষ্ট, স্পর্ধিত, দুর্দান্ত, গোয়ার) (মারিদ)।
→ এবং মানুষদের (মধ্য) হইতে যে তর্ক করে আল্লাহর ( সম্বন্ধে) মধ্যে কোনো জ্ঞান না জানিয়া এবং অনুসরণ করে প্রত্যেক গর্বিত শয়তানকে ।
→ ব্যাখ্যা :
এই আয়াতটি ছোট মনে হলেও ইহার গভীরতা খুবই ব্যাপক। অনেক মানুষই আছে যাদের আল্লাহ্ সম্বন্ধে খুব একটা ভালো ধারণা নাই, অথচ না জেনে না শুনে এবং নিছক জ্ঞানের অভাবে তর্কবিতর্কের ঝড় তুলে দেয়। আল্লাহ্ বিষয়টি এতই ব্যাপক যে কয়েকটি কথার বাক্য গঠন করে বোঝানো মোটেই সম্ভবপর নয়। তবে মোটামুটিভাবে একটি ধারণা দেওয়া যায়।
কোরান বলছে, যেদিকেই তাকাও না কেন, আল্লাহ্ ছাড়া কিছুই দেখতে পাবে না, অর্থাৎ আল্লাহর সৃষ্টিজগতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহ্ হতে নির্গত হচ্ছে। সুতরাং আল্লাহর সৃষ্টির রূপ ধারণ করে যাহা অবিরাম নির্গত হয়ে চলছে উহা আল্লাহর সিফাত তথা গুণাবলি, কিন্তু জাত নয়। জাত এবং সিফাতের অখণ্ডতার নামই হলো আল্লাহ্। তবে সিফাত তথা গুণাবলিকে আল্লাহ্ না বলে আল্লাহর সিফাত বলতে হবে।
কারণ, আল্লাহর অসংখ্য সিফাতগুলো জাত আল্লাহ্ হতে আগমন করছে। আল্লাহ্ জাতরূপে মাত্র তিনটি স্থানে অবস্থান করেন : একটি সমগ্র সৃষ্টিরাজ্যের শেষ যেখানে সেই লা-মোকামে এবং অপর দুইটি স্থান হলো, - জিন ও অপরটি ইনসান তথা মানুষ। তাই মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। কারণ মানুষের সঙ্গে বা সাথে আল্লাহ্ 'আমরা' রূপটি ধারণ করে জীবন-রগের তথা শাহারগের নিকটেই অবস্থান করেন (নাহনু আকরাবু ইলাইহে মিন্ হারলিল ওয়ারিদ তথা 'আমরা (আল্লাহ্) তোমাদের জীবন-রগের নিকটেই আছি)।
যিনি বা যারা ধ্যানসাধনার মাধ্যমে বিরাট ধৈর্যধারণ করেছেন এবং আল্লাহর ইচ্ছার রহমতে যাঁর নফসের মধ্যে আল্লাহর উদ্ভাসিত রূপটি প্রকাশিত হয়েছে, কেবলমাত্র তিনি বা তাঁরা আল্লাহর জ্ঞানে জ্ঞানী, অন্যথায় 'বিগাইরি ইলিম' তথা আল্লাহ্ বিষয়টি পুথির বিদ্যা দিয়ে জানাটা মোটেই সম্ভবপর নয়। পুথির বিদ্যার বড় বড় সার্টিফিকেট অর্জন করা যায়, কিন্তু আল্লাহ্ সম্বন্ধে গূঢ় রহস্যের জ্ঞানটি অর্জন করা যায় না।
আল্লাহর গূঢ় রহস্যময় জ্ঞানটি যাদের জানবার প্রবল আকাঙ্ক্ষা তারা মাত্র একটি বছর ধ্যানসাধনার মোরাকাবা মোশাহেদাটি নির্জনে একাকী বিরাট ধৈর্যধারণ করে অর্জন করার চেষ্টা করলে আল্লাহর রহমতে কিছু না কিছু বুঝতে পারবেই। এই বোঝাতেও আল্লাহ-বিষয়ে তর্ক করা মোটেই ঠিক নয়। কমপক্ষে দশ বার বছর মোরাকাবার ধ্যানসাধনাটি যাঁরা করতে পেরেছেন, তাঁরাই আল্লাহ্ সম্বন্ধে কিছু বলার অধিকার রাখেন বলে মনে করি। কিন্তু এই রকম সাধকেরা আল্লাহ্ বিষয়ে কিছু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করলেও বোঝা যায় না।
সোজা কথায় পুথির বিদ্যা দিয়ে ইহা মোটেই সম্ভবপর নয়, বরং হেরাগুহার মতো নির্জন স্থানে একাকী মোরাকাবার ধ্যানসাধনার মাধ্যমে কিছুটা হলেও বোঝা যায়। বাহ্যিক জগতের দৃশ্যাবলি এবং অলৌকিক জগতের রহস্যময় দৃশ্যাবলি মোটেই এক বিষয় নয়। অলৌকিক জগতের রহস্যাবলির সামান্য কিছু প্রত্যেকেই জানতে পারবে তবে একটি বিষয়ের জন্য কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়, সেই বিষয়টি হলো একটি ঘটনা। সেই ঘটনাটির নাম হলো মৃত্যু-ঘটনা। মৃত্যু মোটেই ধ্বংস নয়, বরং পরিবর্তন। তাই যারা মোরাকাবার ধ্যানসাধনায় বিরাট ধৈর্যধারণ করে উঠে-পড়ে লেগে আছে তারাই মৃত্যু-নামক ঘটনার আগেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিয়েছে। সুতরাং আল্লাহকে জানার আগ্রহ যাদের আছে তাদেরকে সেই সাধকদের অনুসরণ ব্যতীত জানা সম্ভবপর নয়। মুতু কাবলা আনতা মুত তথা মরার আগে মরে যাও ।
শয়তান-বিষয়টিরও একটা মোটামুটি ধারণা না থাকলে বিভ্রান্তির বেড়াজালে জড়িয়ে পড়তে হয়। প্রথমেই জেনে নিতে হবে যে, শয়তান কোথায় কোথায় অবস্থান করে এবং অবস্থান করার অনুমতি আল্লাহ্ কর্তৃক পেয়েছে।
শয়তান আল্লাহর সমগ্র সৃষ্টিরাজ্যের মধ্যে মাত্র দুইটি স্থানে অবস্থান করার অনুমতি পেয়েছে তথা থাকতে পারবে। এই দুইটি আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত স্থান ব্যতীত শয়তানের পক্ষে এক পা-ও বাড়াবার ক্ষমতা দেওয়া হয় নি। কেবলমাত্র এই দুইটি স্থানই শয়তানের যত আকাম কুকামের নির্দিষ্ট স্থান। সেই দুইটি নির্দিষ্ট স্থানের নাম হলো : জিনের অন্তর এবং মানুষের অন্তর।
এই দুইটি অন্তর বিহনে শয়তানকে থাকার আর কোনো অনুমতি দেওয়া হয় নি। বড়ই দুঃখ করে বলতে হয় যে, শয়তানের এই দুইটি স্থানে অবস্থান করা ছাড়া আর যে কোথাও থাকার অনুমতি দেওয়া হয় নি সেটাও বড় বড় ইসলাম-গবেষকদের অনেকেই জানেন না।
সুতরাং বিভ্রান্তির খিচুড়ি ছাড়া এদের কাছে আর কীইবা আশা করা যায়? অথচ এই শ্রদ্ধেয় গবেষকদের কাছে আল্লাহর বিষয়টি এবং শয়তানের বিষয়টি জানতে চাইলে একটি মুচকি হাসি দিয়ে সব কিছু জানার ভান করে মানুষগুলোকে দিশেহারা করে তোলে।
একটি মানুষের অন্তর ছাড়া শরীরের আর কোনো অঙ্গে শয়তানকে থাকার অনুমতি দেওয়া হয় নি। তাই বলা হয়ে থাকে, একটি মানুষের হাত-পা-অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সবই মুসলমান, কেবলমাত্র অন্তরটি ছাড়া। শয়তানের যত প্রকার আকাম-কুকামের কারখানাটি হলো একমাত্র অন্তরটি।
এই শয়তানটিকে কেমন করে তাড়িয়ে দিতে হবে, কেমন করে এই শয়তানটিকে মুসলমান বানিয়ে ফেলতে হবে ইত্যাদি বহু উপদেশের মাঝে মাত্র একটি সার কথাই হলো শয়তানের কুমন্ত্রণা হতে আশ্রয় গ্রহণ করা। তাই এই আয়াতে বলা হয়েছে উদ্ধত অহংকারী শয়তানটিকে অনুসরণ না করতে।
অনেক গবেষক শয়তানের অনুবাদ করতে গিয়ে সমগ্র জিনজাতিকেই টেনে এনে মনের অজান্তে অপমান করে ছাড়ে। ইহা মোটেও ঠিক নয়। কারণ, মানুষের মাঝে যেমন ভালোমন্দ আছে, তেমনি জিনজাতির মাঝেও ভালোমন্দের অবস্থানটি আমরা জানতে পারি। নিঃসন্দেহে শয়তানের আগমন জিনজাতি হতে, কিন্তু তাই বলে পাইকারিভাবে সমগ্র জিনজাতিকে গালি দেওয়া মোটেও ঠিক নয়। অন্তরের মাঝে শয়তানটিকে রেখেই যখন মানুষ মুক্তচিন্তার নাম ধারণ করে স্বাধীনতাটি ভোগ করতে চায় তখনই মনের অজান্তে শয়তানের খপ্পরে পড়ে যায়।
অথচ মানুষ বুঝতেই পারে না যে সে শয়তানের খপ্পরে পড়ে গেছে। তাই বলা হয়ে থাকে, মানুষের ভেতর একটি গোপন গোশতের টুকরা আছে, সেই গোশতের টুকরাটির নাম হলো অন্তর। সেই অন্তরটি যখন কলুষিত হয়ে যায় তখন সমস্ত মনপ্রাণই কলুষিত হয়ে পড়ে, আবার পরক্ষণে সেই অন্তরটি যখন পবিত্র হয়ে যায় তখন সমস্ত দেহমনটি পবিত্র হয়ে যায়।
প্রতিটি মানুষ একেকটি নফস তথা ‘আমি।' এই 'আমি' -টি পবিত্র, কিন্তু এই 'আমি'-র সঙ্গে তথা এই নফসের সঙ্গে যখন শয়তানটি অবস্থান করে তখনই নফসটি কলুষিত হয়ে পড়ে। এই কলুষিত নফসের অভ্যন্তরেই শয়তান উদ্ধত অহংকারীর অদৃশ্য রূপটি ধারণ করে। তাই এই আয়াতের শেষে বলা হয়েছে, উদ্ধত অহংকারী শয়তানের অনুসরণ করছে।
সুতরাং এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, শয়তান মোটেও বাহিরে থাকে না, বরং প্রতিটি নফসের তথা প্রতিটি মানুষের অন্তরেই অবস্থান করে। নফস যোগ শয়তান সমান সমান 'আমিত্ব', নফ্স বিয়োগ শয়তান সমান সমান 'আমি'। সুতরাং নসটি তথা 'আমি'-টি মোটেও অপবিত্র নয়, কলুষিত নয় এবং এই নফসই যখন মোরাকাবার ধ্যানসাধনার মাধ্যমে 'এতমেনান' অর্জন করে 'মোমায়েল্লা' হয়ে যায় তখনই জান্নাতের সুসংবাদটি আল্লাহ্ কর্তৃক দেওয়া হয়।
বইটি পেতে হলে যোগাযোগ নাম্বারঃ০১৮২৭৩৫৪২০৯( WhatsApp, imo)