31/05/2025
সকল রোগের নিরাময়!
প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসা প্যাপিরাসে (Ebers Papyrus, 1550 BCE) কালোজিরার ঔষধি গুণাগুণ নিয়ে উল্লেখ রয়েছে। এই প্যাপিরাসে কালোজিরাকে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাচীন মিশরীয়রা কালোজিরাকে "স্বর্গের ভেষজ" হিসেবে গণ্য করত। মিশরীয় সভ্যতায় কালোজিরা ও কালোজিরার তেল ফারাও এবং উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যরক্ষা ও সৌন্দর্যচর্চায় ব্যবহৃত হত। (Padhye, Subhash et al. “From here to eternity - the secret of Pharaohs: Therapeutic potential of black cumin seeds and beyond.” Cancer therapy vol. 6b (2008): 495-510.)
কালোজিরা প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত। হিপোক্রেটিস, গ্যালেন এবং ডিওস্কোরাইডসের মতো বিখ্যাত গ্রিক চিকিৎসকরা তাদের রচনায় কালোজিরার ব্যবহার সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন। কালোজিরা মাথাব্যথা, নাক বন্ধ, দাঁতের ব্যথা, অন্ত্রের কৃমির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হত এবং নারীর মাসিক চক্র নিয়মিত করতে ও দুধ উৎপাদন বাড়াতে ব্যবহৃত হত। কালোজিরা ক্যাটারহ (সর্দি বা শ্লেষ্মাজনিত সমস্যা) এর বিরুদ্ধে কার্যকর বলে বিবেচিত হত।
হিপোক্রেটিস কালোজিরাকে লিভার এবং পাচনতন্ত্রের সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহার করতেন।
গ্যালেন বর্ণনা করেছেন যে, কালোজিরাকে লিনেন কাপড়ে মুড়ে গরম করে নাকে টানা হত, যা বর্তমান সময়ের ইনহেলেশন থেরাপির মতোই কাজ করত।
ডিওস্কোরাইডস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "ডি মেটেরিয়া মেডিকা"-তে কালোজিরাকে মাথাব্যথা, বিভিন্ন শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা এবং ব্যথার চিকিৎসায় ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
আধুনিক চিকিৎসার জনক ইবনে সিনা তাঁর বিশ্ববিখ্যাত বই আল-কানুন ফিত তিব্ব (The Canon of Medicine)-এ কালোজিরার বিভিন্ন উপকারী বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। ইবনে সিনা লিখেছেন কালোজিরা শরীরের শক্তি বৃদ্ধি করে, শরীরের ক্লান্তি এবং শক্তির অভাব কাটাতে সাহায্য করে। কালোজিরা হাঁপানি, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্ট কমাতে সাহায্য করে। ইবনে সিনা লিখেছেন, কালোজিরা নিয়মিত সেবন করলে শরীরের ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী হয়। তিনি কালোজিরা ব্যবহারের প্রশংসা করেছেন এবং এটিকে সংক্রমণ ও প্রদাহ প্রতিরোধে কার্যকরী মলম হিসাবে ব্যবহারের সম্ভাবনা উল্লেখ করেছেন।
ইসলামি ঐতিহ্যে, কালোজিরাকে "হাব্বাতুল বারাকাহ" (আশীর্বাদপূর্ণ বীজ) বলা হয়।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমরা কালোজিরা ব্যবহার করো, কারণ এতে মৃত্যু ছাড়া প্রতিটি রোগের নিরাময় রয়েছে।" (সহীহ বুখারি, ৫৬৮৮; সহীহ মুসলিম, ২২১৫)
হযরত খালিদ ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "আমরা এক সফরে বের হয়েছিলাম এবং আমাদের সাথে ছিলেন গালিব ইবনে আবজার। পথে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমরা মদিনায় পৌঁছলে তিনি তখনও অসুস্থ ছিলেন। ইবন আবি আতীক তার দেখতে এলেন এবং আমাদের বললেন, 'তাকে কালোজিরা দিয়ে চিকিৎসা করো। পাঁচ বা সাতটি কালোজিরা নিয়ে গুঁড়ো করো, তারপর তেলের সাথে মিশিয়ে তার নাকে ডান ও বাম দিকে কয়েক ফোঁটা দাও। কারণ আয়েশা (রা.) আমাকে বলেছেন যে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন: 'এই কালোজিরায় আস-সাম (মৃত্যু) ছাড়া প্রতিটি রোগের জন্য নিরাময় রয়েছে।' আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আস-সাম কী? তিনি বললেন, মৃত্যু।" (সহিহ বুখারি, ৫৬৮৭)
কালোজিরা সেবনের বহু উপায় রয়েছে। একে অন্যান্য উপাদানের সাথে মিশিয়ে অথবা একাই সেবন করা যায়। কালোজিরা মধুর সাথে মিশিয়ে খেতে পারেন। কালোজিরা পানিতে সিদ্ধ করে চা বানিয়ে পান করা যায়। কালোজিরা গুঁড়ো করে বা চিবিয়ে পানির সাথে গিলে খেতে পারেন। কালোজিরা বিভিন্ন ফর্মে ব্যবহার করা যায়, যেমন বীজ, তেল, ক্যাপসুল, পাউডার ইত্যাদি।
পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসক ডা. মাইকেল গ্রেগর তাঁর বই "How Not to Die"-এ কালোজিরা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, কালোজিরার নিয়মিত সেবন বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানে (ওজন কমানো, শরীরের চর্বি কমানো, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো) সাহায্য করে। ডা. মাইকেল গ্রেগর পরামর্শ দিয়েছেন কালোজিরার উপকারিতা পেতে এটি নিয়মিত সেবন করা উচিত। এটি একটি প্রাকৃতিক উপাদান, তাই এর প্রভাব ধীরে ধীরে দেখা যায়। যদি ওজন কমানো, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মতো নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে, তাহলে কমপক্ষে ৩ মাস ধরে নিয়মিত সেবন করা উচিত।
কিছু বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দেন, কালোজিরা বীজ বা গুঁড়ো প্রতিদিন ১ থেকে ৩ গ্রাম সরাসরি বা পানির সাথে মিশিয়ে বা অন্যান্য খাবারের সাথে মিশিয়ে সেবন করা যেতে পারে। কালোজিরার তেলও ব্যবহার করা যায়। তবে তেলের ক্ষেত্রে পরিমাণ কম হবে, কারণ তেল বেশি ঘনীভূত হয়। কালোজিরা তেল প্রতিদিন ১ থেকে ২ চা চামচ (৫ থেকে ১০ মিলি) সেবন করা যেতে পারে।
হাদিসে উল্লিখিত পদ্ধতি অনুসারে কালোজিরা ব্যবহারের একটি উপায় হলো– ১. পাঁচ বা সাতটি কালোজিরা নিয়ে গুঁড়ো করুন। ২. এই গুঁড়োটি তেলের সাথে মিশিয়ে নিন। ৩. এই মিশ্রণটি রোগীর নাকে ডান ও বাম দিকে কয়েক ফোঁটা দিন। এই পদ্ধতিটি বিশেষত ঠান্ডা, সর্দি-কাশি এবং শ্বাসযন্ত্রের সমস্যার জন্য উপকারী।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "যাদুল মাআদ" এবং ইবন হাজার আল-আসকালানি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "ফাতহুল বারি"-তে উনারা কালোজিরার ঔষধি গুণাবলী এবং ব্যবহার সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। কালোজিরা ঠান্ডাজনিত রোগ প্রতিরোধে বিশেষভাবে উপকারী। কালোজিরা গুঁড়ো করে কাপড়ে রেখে নাকে টানলে এর সুগন্ধ সর্দি-কাশি এবং শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা উপশম করতে সাহায্য করে। এটি ঠান্ডা লাগা এবং নাক বন্ধের সমস্যায় বিশেষভাবে কার্যকর। কালোজিরা তেল নাকে প্রয়োগ করলে শ্বাসনালী পরিষ্কার হয় এবং সাইনাসের সমস্যা দূর হয়। কালোজিরা ভিনেগারের সাথে সিদ্ধ করে মাউথওয়াশ হিসেবে ব্যবহার করলে দাঁতের ব্যথা, মাড়ির প্রদাহ এবং মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়। কালোজিরার গুঁড়ো বা তেল খেলে তা শরীরের শক্তি বৃদ্ধি, হজমশক্তি উন্নত করা এবং ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। কালোজিরা তেল ত্বকে প্রলেপ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এটি ত্বকের সমস্যা, ক্ষত এবং প্রদাহের চিকিৎসায় কার্যকর। কালোজিরা মধু, যয়তুন তেল, ভিনেগার ইত্যাদির মতো প্রাকৃতিক উপাদানের সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে।
কালোজিরার উপর এ পর্যন্ত হাজার হাজার গবেষণা রয়েছে। PubMed, ScienceDirect, Springer এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক ডাটাবেস অনুসন্ধান করলে কালোজিরার উপর অসংখ্য রিসার্চ পেপার পাওয়া যায়। শুধুমাত্র PubMed-এ কালোজিরার উপর ২,০০০ এরও বেশি গবেষণাপত্র রয়েছে। ইরান, সৌদি আরব, মিশর, তুরস্ক, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশে কালোজিরার উপর অসংখ্য গবেষণা পরিচালিত হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালও রয়েছে যেখান থেকে কালোজিরা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঔষধ হিসেবে স্বীকৃত হয়।
পুরুষদের প্রজনন স্বাস্থ্য টেস্টোস্টেরন লেভেল, শুক্রাণুর সংখ্যা এবং বীর্যের গুণমান দ্বারা নির্ধারিত হয়। বিভিন্ন প্রি-ক্লিনিক্যাল এবং ক্লিনিক্যাল গবেষণায় রিপোর্ট করা হয়েছে যে কালোজিরা বীজ, বিশেষ করে এর তেল এই প্রজনন স্বাস্থ্যের সূচক এবং প্রজনন ক্ষমতা উন্নত করে। ২০১৪-২০১৭ সালের মধ্যে প্রকাশিত ২৪টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে পুরুষ ও নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর কালোজিরার প্রভাব নিয়ে একটি Systematic Review করা হয়েছে। এই সিস্টেমেটিক রিভিউ থেকে পুরুষ ও মহিলাদের প্রজনন স্বাস্থ্যের উপর কালোজিরার কার্যকারিতা সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, কালোজিরা পুরুষ ও নারীদের প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধিতে কার্যকর। পুরুষদের উপর একটি হিউম্যান ট্রায়ালে ৭৮ জন বন্ধ্যাত্বগ্রস্ত পুরুষ, যাদের শুক্রাণুর সংখ্যা কম বা গুণগত মান দুর্বল ছিল তাদের ২ মাস ধরে প্রতিদিন ২.৫ মি.লি. কালোজিরার তেল খেতে দেওয়া হয়। কালোজিরা তেল খাওয়ার পরে অংশগ্রহণকারীদের টেস্টোস্টেরনের লেভেল ও শুক্রাণুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, শুক্রাণুর সঠিকভাবে চলাফেরার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং শুক্রাণুর আকৃতি ও গঠন স্বাভাবিক হয়, যা সফল নিষেকের জন্য গুরুত্ত্বপূর্ণ। কালোজিরা প্রাকৃতিকভাবে যৌনক্ষমতা বৃদ্ধি ও শুক্রাণুর উৎপাদনে সাহায্য করে। কালোজিরা শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমিয়ে শুক্রাণুর ক্ষতি রোধ করে। এই ট্রায়ালে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া উল্লেখ করা হয়নি তাই কালোজিরা যৌনস্বাস্থ্য রক্ষায় একটি নিরাপদ প্রাকৃতিক উপাদান বলে বিবেচিত হয়েছে। (Darand, M., Hajizadeh, M., Mirmiran, P., & Mokari-Yamchi, A. (2019). The effect of Nigella sativa on infertility in men and women: a systematic review. Progress in Nutrition, 21(2), 12-20.)
ইমিউন সিস্টেমের উপর কালোজিরার প্রভাব নিয়ে একটি ক্লিনিকাল ট্রায়াল পরিচালিত হয়। গবেষকরা দেখতে চেয়েছিলেন যে কালোজিরা সাপ্লিমেন্টেশন ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করতে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে পারে কিনা। গবেষণায় তরুণ, সুস্থ স্বেচ্ছাসেবকদের নেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীদের নির্দিষ্ট ডোজে কালোজিরা সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হয়েছিল। এখানে গবেষকরা তাদের ইমিউনোলজিক্যাল মার্কার (CD4+ T-সেল, CD8+ T-সেল এবং সাইটোকাইনস) এবং সাধারণ স্বাস্থ্য সূচক (শারীরিক সুস্থতা, ক্লান্তি এবং জীবনযাত্রার মান) এই প্যারামিটারগুলি পরিমাপ করেছিলেন। দেখা যায়, CD4+ T-সেল এবং CD8+ T-সেল এর সংখ্যা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে কালোজিরা ইমিউন সিস্টেমকে উদ্দীপিত করতে পারে, যা সংক্রমণ এবং রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহায্য করে। কালোজিরা গ্রহণকারীদের শারীরিক সুস্থতা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। তাদের ক্লান্তি এবং দুর্বলতার মাত্রা হ্রাস পেয়েছে। কালোজিরা সাপ্লিমেন্টেশনের কোনো উল্লেখযোগ্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। এই গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে কালোজিরা একটি প্রাকৃতিক এবং নিরাপদ উপাদান হিসেবে ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করতে পারে, যা সংক্রমণ এবং রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহায্য করে। (Effect of Nigella sativa on general health and immune system in young healthy volunteers; a randomized, placebo-controlled, double-blinded clinical trial, 2021 Nov 25. [Version 2] doi: 10.12688/f1000research.73524.2)
কালোজিরা ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে। একটি গবেষণায় কালোজিরাকে মেটফর্মিন (একটি ডায়াবেটিস ওষুধ) এর সাথে তুলনা করা হয়েছে। দেখা গেছে যে প্রিডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য কালোজিরা মেটফর্মিনের মতোই কার্যকর। (Nigella sativa as a promising intervention for metabolic and inflammatory disorders in obese prediabetic subjects: A comparative study of Nigella sativa versus both lifestyle modification and metformin 2021 Jul;35(7):107947.)
২০০২ সালে Research in Veterinary Science জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে কালোজিরা তেলের ইনসুলিনোট্রপিক প্রপার্টিজ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা উপস্থাপিত হয়। এটি প্রমাণ করে যে কালোজিরা তেল রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং ইনসুলিন উৎপাদনকে উদ্দীপিত করে। (Fararh, K. M., Atoji, Y., Shimizu, Y., & Takewaki, T. (2002). Insulinotropic properties of Nigella sativa oil in Streptozotocin plus Nicotinamide diabetic hamsters. Research in Veterinary Science, 73(3), 279-282.)
কালোজিরা স্মৃতি, মনোযোগ এবং জ্ঞানীয় কার্যকারিতা (Cognitive function) উন্নত করতে পারে বলে প্রমাণিত। একটি গবেষণায় সুস্থ মানুষের স্মৃতি, মনোযোগ এবং জ্ঞানীয় কার্যকারিতার উপর কালোজিরার বীজের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে কালোজিরা সেবন স্মৃতি, মনোযোগ এবং জ্ঞানীয় কার্যকারিতা উন্নত করতে পারে। এই গবেষণাটি প্রমাণ করে কালোজিরা একটি সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক উপাদান যা স্মৃতি এবং মনোযোগের সমস্যায় সাহায্য করতে পারে। (Bin Sayeed, M. S., Asaduzzaman, M., Morshed, H., Hossain, M. M., Kadir, M. F., & Rahman, M. R. (2013). The effect of Nigella sativa Linn. seed on memory, attention and cognition in healthy human volunteers. Journal of Ethnopharmacology, 148(3), 780-786.)
হাঁপানির ওপর কালোজিরার থেরাপিউটিক প্রভাব নিয়ে ৯টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের একটি সিস্টেম্যাটিক রিভিউয়ে কিভাবে কালোজিরা হাঁপানির উপর কাজ করে তা স্পষ্ট হয়। হাঁপানি একটি প্রদাহজনিত রোগ, যা শ্বাসনালী সংকুচিত করে ও শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা তৈরি করে। কালোজিরা শ্বাসনালী প্রশস্ত করতে ও প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। ৯টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মোট অংশগ্রহণকারী ছিল ৪৩৪ জন হাঁপানি রোগী। তাদের বিভিন্ন ফর্মে কালোজিরা খেতে দেওয়া হয়, যার মধ্যে ছিল বয়েলড এক্সট্র্যাক্ট, তেল, গুঁড়া এবং ক্যাপসুল। প্রতিদিন ১-২ গ্রাম পর্যন্ত কালোজিরা দেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কালোজিরা Asthma Control Test-ACT স্কোর (হাঁপানি কতটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে) বৃদ্ধি করেছে, হাঁপানির উপসর্গ কাশি ও শ্বাসকষ্টের তীব্রতা হ্রাস করেছে এবং ফুসফুসের কার্যকারিতা (PFTs) বৃদ্ধি করেছে। গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে, কালোজিরা শ্বাসনালীর সংকোচন কমিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাসকে স্বাভাবিক করে। এটি সাধারণ ব্রঙ্কোডাইলেটর ওষুধের মতোই কাজ করে, কিন্তু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঘটায় না। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, কালোজিরা ইনহেলার ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কমাতে পারে। যা ইঙ্গিত দেয় কালোজিরা হাঁপানির চিকিৎসায় সহায়ক হতে পারে, তবে এটি একটি সম্পূরক চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া উচিত, প্রাথমিক চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে নয়। (Khazdair, M. R., & Amirabadizadeh, A. (2022). Therapeutic effects of Nigella sativa on asthma: a systematic review of clinical trial. Physiology and Pharmacology, 26(3), 123-134.)
কালোজিরা এবং এর তেল বিভিন্ন কেমিক্যাল, ওষুধ, ভারী ধাতু এবং কীটনাশক দ্বারা ঘটিত নেফ্রোটক্সিসিটি (কিডনির বিষাক্ততা) থেকে সুরক্ষা প্রদানে কার্যকর বলে বিভিন্ন প্রি-ক্লিনিক্যাল (প্রাণী মডেল) গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। কালোজিরা কেমোথেরাপিউটিক এজেন্ট (যেমন সিসপ্ল্যাটিন, মেথোট্রেক্সেট), অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি এজেন্ট (যেমন অ্যাসপিরিন,প্যারাসিটামল), অ্যান্টিসাইকোটিক ড্রাগ (যেমন হ্যালোপেরিডল), কীটনাশক এবং ফাঙ্গিসাইড (যেমন পেনকোনাজোল) এসবের ক্ষতি থেকে কিডনির টিস্যুকে সুরক্ষা প্রদান করে। কালোজিরা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এনজাইম (যেমন সুপারঅক্সাইড ডিসমিউটেজ, গ্লুটাথায়ন পারঅক্সিডেজ এবং ক্যাটালেজ) এর কার্যকলাপ বৃদ্ধি করে। কালোজিরা বৃক্কের কোষগুলির অ্যাপোপটোসিস (কোষ মৃত্যু) কমিয়ে টিস্যুর ক্ষতি রোধ করে। তবে, মানবদেহে এর কার্যকারিতা এবং সুরক্ষার ব্যাপার নিশ্চিত করার জন্য আরও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন। (Hannan, M. A., Zahan, M. S., Sarker, P. P., Moni, A., Ha, H., & Uddin, M. J. (2021). Protective effects of black cumin (Nigella sativa) and its bioactive constituent, thymoquinone, against kidney injury: An aspect on pharmacological insights. International Journal of Molecular Sciences, 22(16), 9078.)
শিল্পায়ন এবং আধুনিক জীবনযাত্রার বর্তমান যুগে, বিশেষ করে পারদ, আর্সেনিক, সীসা, ক্রোমিয়াম, ম্যালাথিয়ন এবং ক্যাডমিয়ামের মতো বিষাক্ত ভারী ধাতুগুলি পরিবেশ থেকে শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরে ঢুকে যায়। বিষাক্ত ধাতুগুলি বিভিন্ন অঙ্গের টিস্যুতে জমা হয়, যা নিউরোটক্সিসিটি, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, কার্ডিওভাসকুলার রোগ, বন্ধ্যাত্ব এবং রেনাল ড্যামেজের মতো বিভিন্ন রোগের কারণ হয়। এই বিষক্রিয়া সমাধানে কালোজিরা একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক অ্যান্টিডোট হতে পারে।। বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, কালোজিরা বিভিন্ন অঙ্গ, যেমন মস্তিষ্ক, কিডনি, ফুসফুস, লিভার, হার্ট, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ট্র্যাক্ট এবং প্রজনন সিস্টেমে রাসায়নিক বিষাক্ততা থেকে সুরক্ষা প্রদানে অ্যান্টিডোট হিসাবে কাজ করতে পারে। শক্তিশালী কেলেটিং ক্ষমতার কারণে, কালোজিরা খাদ্যের দূষিত বা ভেজালযুক্ত বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ দূর করতে পারে। কালোজিরা ক্যান্সার এবং অন্যান্য রোগের জন্য ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্রশমিত করতে পারে। কালোজিরার বিষনাশক (detoxification) গুণ রয়েছে। কালোজিরা ভারী ধাতু ও রাসায়নিক বিষক্রিয়া প্রতিরোধ করতে পারে, সোডিয়াম নাইট্রাইট (খাদ্যে ব্যবহৃত প্রিজারভেটিভ) বিষক্রিয়া কমাতে পারে, টলুইন (শিল্পে ব্যবহৃত ক্ষতিকর রাসায়নিক) বিষক্রিয়া প্রতিরোধ করতে পারে এবং লিভারকে প্যারাসিটামলের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে। কালোজিরার সক্রিয় উপাদান থাইমোকুইনোন এবং থাইমোহাইড্রোকুইনোন ভারী ধাতুর সাথে বন্ধন তৈরি করে এবং শরীরে তাদের শোষণ রোধ করে। প্রি-ক্লিনিকাল গবেষণাগুলো আশাব্যঞ্জক ফলাফল দেখিয়েছে, তবে কালোজিরার কার্যকারিতা ভালোভাবে নির্ধারণের জন্য আরও ক্লিনিকাল ট্রায়াল প্রয়োজন। (Tavakkoli, A., Mahdian, V., Razavi, B. M., & Hosseinzadeh, H. (2017). Black seed (Nigella sativa) and its constituent thymoquinone as an antidote or a protective agent against natural or chemical toxicities. Iranian Journal of Basic Medical Sciences, 20(10), 1101-1111.)
Medical Science Monitor জার্নালে প্রকাশিত হয় শিশুদের ইন্ট্র্যাক্টেবল পেডিয়াট্রিক সিজার (Intractable Pediatric Seizures) এর চিকিৎসায় কালোজিরার প্রভাব নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা। এই গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের ইন্ট্র্যাক্টেবল পেডিয়াট্রিক সিজার (যে সিজার ওষুধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না) এর চিকিৎসায় কালোজিরা বীজের নির্যাসের প্রভাব মূল্যায়ন করা। গবেষণায় ইন্ট্র্যাক্টেবল পেডিয়াট্রিক সিজারে আক্রান্ত শিশুদের নেওয়া হয়েছিল। এই শিশুদের সিজার ওষুধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না। শিশুদের কালোজিরা বীজের নির্যাস দেওয়া হয়েছিল নির্দিষ্ট ডোজে এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। ফলাফল দেখা যায় কালোজিরা নির্যাস গ্রহণকারী শিশুদের সিজারের ফ্রিকোয়েন্সি কমে গিয়েছিল। কালোজিরা নির্যাস গ্রহণকারী শিশুদের সিজারের তীব্রতাও কমে গিয়েছিল। গবেষণায় কালোজিরা নির্যাসের কোনো উল্লেখযোগ্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি, যা কালোজিরাকে একটি প্রাকৃতিক এবং নিরাপদ উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, বিশেষ করে যেখানে প্রচলিত ওষুধগুলি কার্যকর হয় না। এই গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে কালোজিরা বীজের নির্যাস ইন্ট্র্যাক্টেবল পেডিয়াট্রিক সিজারের চিকিৎসায় কার্যকর হতে পারে। কালোজিরা বীজের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি বৈশিষ্ট্য মস্তিষ্কের কোষগুলিকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং প্রদাহ থেকে রক্ষা করে, যা সিজারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। (Akhondian, J., Parsa, A., & Rakhshandeh, H. (2007). The effect of Nigella sativa L. (black cumin seed) on intractable pediatric seizures. Medical Science Monitor, 13(12), CR555-CR559.)
Muhammad Rahat