06/10/2026
বিশ্বাস করেন, আমার সামনে দেওয়া রিকশা চালকের অভিশাপের পর পরেই লোকটি মারা যায়।
ঘটনাটা আজও মনে পড়লে শরীরটা কেমন যেন শিউরে ওঠে। কারণ পুরো ঘটনাটা আমি একদম সামনে থেকে দেখেছিলাম।
সেদিন অফিস থেকে ফিরছিলাম। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, রাস্তায় মাগরিবের আজান হচ্ছিল। একটা রিকশা নিয়ে বাসার দিকে যাচ্ছিলাম।
রিকশাওয়ালার বয়স পঞ্চান্ন-ষাটের কাছাকাছি হবে। মাথায় সাদা টুপি, মুখে সাদা দাড়ি, গায়ে পাঞ্জাবি। কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ রিকশাটা রাস্তার পাশে থামিয়ে বললেন, বাবা, পাঁচ মিনিট দাঁড়াবেন? নামাজটা পড়ে নিই।
আমি বললাম, জি চাচা, পড়েন।
উনি পাশের মসজিদে ঢুকে গেলেন। আমিও রিকশা থেকে নেমে ওনার সঙ্গে নামাজ পড়ে নিলাম।
নামাজ শেষে আবার রিকশায় উঠলাম।
উনি রিকশা চালাতে চালাতে বললেন, বাবা, রিকশা চালাই বলে নামাজটা তো আর বাদ দিতে পারি না।
আমি বললাম, জ্বী, সবাইকে তৌফিক দান করুন।
উনি হেসে শুধু বললেন, আল্লাহ ভরসা।
এরপর আর তেমন কোনো কথা হয়নি।
কিছুক্ষণ পর একটা মোড়ে গিয়ে হঠাৎ সামনে থাকা একটা প্রাইভেট কার ব্রেক করল।
রিকশাওয়ালাও সঙ্গে সঙ্গে ব্রেক করলেন। তারপরও রিকশার সামনের অংশটা গাড়ির পেছনে হালকা করে লেগে গেল।
বড় কোনো ক্ষতি হয়নি।
কিন্তু গাড়ি থেকে একজন যুবক নেমে এসে চিৎকার শুরু করল।
তুই গাড়ি চালাস কীভাবে? চোখে দেখিস না?
বৃদ্ধ লোকটা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, বাবা, ভুল হয়ে গেছে। হঠাৎ ব্রেক করলেন তো, তাই একটু লেগে গেছে।
ছেলেটা আরও রেগে গিয়ে বলল, তুই আমাকে বাবা ডাকবি না। গাড়ির কী অবস্থা করছিস দেখছিস?
লোকটা তখনও শান্তভাবে বললেন, বাবা, বেশি কিছু হয় নাই। আপনার যদি কোনো ক্ষতি হয়ে থাকে, আমি...
কথাটা শেষ করার আগেই ছেলেটা সজোরে একটা চড় মারল।
চড়ের শব্দটা শুনে আমি নিজেই রিকশা থেকে নেমে গেলাম।
লোকটার মাথার সাদা টুপিটা রাস্তায় পড়ে গেছে।
আমি সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটাকে বললাম, ভাই, মারলেন কেন? ভুল হয়েছে, উনি তো আপনাকে বলছেনই যে ভুল হয়েছে। এভাবে একজন বয়স্ক মানুষকে মারার কী আছে?
ছেলেটা আমার দিকেও তাকিয়ে রেগে বলল, আপনি চুপ করেন। আপনার সমস্যা কী?
আমি বললাম, সমস্যা হলো আপনি একজন বয়স্ক মানুষকে মারছেন। কথা বলে মিটিয়ে নেন, গায়ে হাত তোলার কী আছে?
সে আরও দু-একটা বাজে কথা বলল। বৃদ্ধ লোকটা তখন শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
আমি তার টুপিটা তুলে হাতে দিলাম।
উনি টুপিটা নিয়ে মাথায় দিলেন।
তারপর খুব আস্তে করে বললেন, বাবা, থাক। তুমি কিছু কইয়ো না। ঝামেলা বাড়াইও না।
আমি অবাক হয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
যে মানুষটা একটু আগেই তাকে সবার সামনে চড় মারল, সেই মানুষটার জন্যও তিনি আমাকে ঝামেলা না করতে বলছেন।
ছেলেটা তখনও গালাগালি করতে করতে গাড়ির দিকে যাচ্ছিল।
বৃদ্ধ লোকটা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন।
আমি দেখলাম, তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।
কিছুক্ষণ পর তিনি দুই হাত দিয়ে চোখ মুছে ধীরে ধীরে আকাশের দিকে তাকালেন।
এক হাত দিয়ে নিজের গালটা চেপে ধরলেন। ঠোঁট কাঁপছিল।
আমি একদম পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
কাঁপা কণ্ঠে বললেন, আল্লাহ... আপনি তো দেখছেন।
তারপর কিছুক্ষণ চুপ।
গলার স্বর আরও ভেঙে গেল।
বললেন, আমি গরিব মানুষ। আমার ভুল হইছে, আমি মাফও চাইছি। আমি তো ওর কোনো ক্ষতি করি নাই। তারপরও আমারে মাইরছে...
কথাটা বলতে গিয়ে তিনি কেঁদে ফেললেন।
তারপর দুই হাত একটু ওপরে তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
আল্লাহ, আমার হাতে কিছু নাই আপনার কাছে বিচার দিলাম । আপনি বিচার কইরেন। আল্লাহ, আপনি শুধু বিচার টা কইরেন।
ঠিক সেই সময় দেখি, ছেলেটা আবার গালাগালি করতে করতে নিজের গাড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
গালাগালি করতে করতে গাড়ির দরজা খুলল।
গাড়িতে ওঠার জন্য শরীরটা একটু ঘোরাল।
আর দরজা দিয়ে ওঠার ঠিক সেই মুহূর্তে
ধপাস!
ছেলেটা মাটিতে পড়ে গেল।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে কয়েক সেকেন্ড আমি নিজেই নড়তে পারিনি।
তারপর দৌড়ে গেলাম।
আশপাশের মানুষজনও ছুটে এলো।
কেউ বলল, পানি দেন।
কেউ বলল, অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করেন।
কেউ তাকে ধরে ওঠানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু মুহূর্তেই তার হাত পা ঠান্ডা হয়ে বরফের মত হয়ে গেছে! বুঝতে আর বাকি রইল না মানুষটা মারা গেছে।
আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলাম।
আর আমার মাথার মধ্যে তখন শুধু কয়েক সেকেন্ড আগের কথাগুলো ঘুরছিল
আল্লাহ... আপনি তো দেখছেন।
আপনি শুধু বিচার করেন।
পুলিশ এলো। লোকজন জড়ো হলো। রাস্তার একপাশে পড়ে রইল তার গাড়ির খোলা দরজা।
আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে সেই বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা।
তিনি তখনও চুপ।
শুধু চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল।
আমি সেদিন অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারিনি।
আজও জানি না, ওই লোকটার ঠিক কী হয়েছিল। কী কারণে এত হঠাৎ করে সে মাটিতে পড়ে গেল, সেটাও আমি জানি না।
আমি শুধু জানি, ঘটনাটা আমার চোখের সামনে ঘটেছিল।
আর তার কয়েক মুহূর্ত আগেই একজন অসহায়, বৃদ্ধ মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলেছিল
আল্লাহ, আপনি বিচার করেন।
পরিশেষে একটা কথাই বলব
কাউকে দুর্বল ভেবে তার ওপর অন্যায় করিয়েন না।
কারো সাথে জুলুম করিয়েন না।
মাজলুম মানুষকে আঘাত করিয়েন না।
কারণ মাজলুমের মুখ থেকে বের হওয়া দোয়া খুব দ্রুতই আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়।
হয়তো সেদিন সেই রিকশাওয়ালা চাচার দোয়াটাও সাথে সাথেই আল্লাহর দরবারে পৌঁছে গিয়েছিল।
02-09-2026
লিখেছেন ভাই মোহাম্মদ রতন
#ফাইযোরা_মার্ট