17/04/2026
“সুকান্ত, কখনো শুনেছো বিচ্ছেদের আগ মুহূর্তেও কাউকে ভালোবাসি বলতে?”
“না বোধহয়। এমনও হয়!”
“হয় বোধহয়। হয় বলেই তো আমি বলেছিলাম। আমি স্বীকার করেছিলাম। বিচ্ছেদের আগ মুহূর্তে শেষ কথাটি আমি কী বলেছিলাম জানো?”
“কী বলেছিলে?”
সুকান্তের কৌতূহল, উদ্রেক ভরা চাহুনি দেখে সুকন্যার হাসি পায়। হাতের চুড়িগুলো সে নাড়ায় রুনুঝুনু করে। মৃদু স্বরে বলে,
“বলেছিলাম, আমি তোমায় ভালোবাসি। ঠিক প্রথম দিনের মতোই। ভীষণ ভালোবাসি।”
“বিচ্ছেদের সময় কেউ এমন করে বলে!”
“আমি বলেছিলাম। বলবো না-ই বা কেন? ভালোবাসাতো আমার ছিলো সবসময়, সুকান্ত। বিচ্ছেদ কি সবসময় ঘৃণার বেলাতেই হয়? কখনো কখনো প্রচণ্ড ভালোবাসার পরেও ছাড়তে হয়। ললাটের লিখন, না যায় খণ্ডন।”
“এমন মায়া করে বলেছো, তারপরেও সে তোমাকে যেতে দিলো? একটু ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেনি? একটুও না?”
“উহুম, একটুও না। একফোঁটাও না। জানো সুকান্ত, দুঃখটাই যে আমার এখানে। এতদিন একসঙ্গে এত স্মৃতি জমালাম, এত এত ভালোবাসার কথা বললাম অথচ তার ভেতর একটু মায়া জমাতে পারলাম না আমার জন্য? এক বিন্দু মায়া না-হয় করতো। করুণা করেও না-হয় ডাকত পিছুডাক! ডাকেনি। সে বড্ড পাষণ্ড মানুষ কি-না। নিজেকে সামলে নিতে পারে ভীষণ। কিন্তু সে-তো জানত, আমি সামলাতে পারি না নিজেকে। আমি যে বোকা, বড়ো বোকা।”
শেষ কথাটি বলতে বলতে কণ্ঠ ভার হয় সুকন্যার। সেই ভারি কণ্ঠ গিয়ে সোজা বিঁধে সুকান্তর বুকে। তার ইচ্ছে হয় সুকন্যার মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার, ইচ্ছে হয় কাছ ঘেঁষে বসার। কিন্তু তার অধিকার যে নেই এমন আহ্লাদ দেওয়ার। সে যে দূরের মানুষ।
“এমন পাষাণ মানুষকে শেষমেশ ভালোবাসলে, সুকন্যা! শত্রুকেও তো এমন করে বললে শত্রু বুকে জড়িয়ে নিবে শত্রুতা ভুলে। সে তো কাছের মানুষই ছিলো!”
সুকন্যা কথার ফাঁকে বেশ কায়দা করেই গলা অব্দি আসা কান্নাটাকে গিলে নেয়। গিলে নিয়ে খিলখিল করে হাসে। ভাব এমন ধরে যেন সুকান্ত বুঝতে না পারে তার বুকের ভাঙন কতটা।
সুকন্যার সেই পাগলামি হাসি দেখে সুকান্ত হতাশ হয়। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,
“তার প্রত্যাখ্যান অব্দি অপেক্ষা করতে। তার দিক থেকেই না-হয় শেষ হতে দিতে সবটা। তুমি আগে আগে শেষ না করতে। তাহলেতো অন্তত আর কয়েকটা বেলা তাকে বেশি পেতে!”
সুকন্যা তাকায় সুকান্তর পানে। সুকন্যার চোখগুলো কেঁদে কেঁদে বর্ষার ভরা নদী হয়ে আছে। কাজল লেপ্টে গিয়েছে সেই কখন! বিষণ্ণ পৃথিবীটা জুড়েই যেন কেবল সুকন্যার অস্তিত্ব। সেই ভরা বর্ষার জলের মতো চোখগুলো দিয়ে সে আকাশ দেখতে দেখতে ধীরে বলল,
“সে আমাকে প্রত্যাখ্যান করলে আমি সহ্য করতে পারতাম না বোধহয়, সুকান্ত। যাকে ভালোবেসেছি সে যদি আমাকে মুখ ফুটে বলতো— তোমায় আর ভালো লাগছে না। তোমাকে আর সহ্য করতে পারছি না… তাহলে কি তা আমি মেনে নিতে পারতাম? যে মুখে শুনেছিলাম আমিই সব, সেই মুখে যদি শুনতাম আমি কেবলই বিরক্তির তবে আমার মন ভেঙে যেতো না? দুঃখ হতো না? সেই দুঃখে আমি মরেও যেতাম হয়ত! ঘৃণায় আয়নায় নিজের মুখ দেখতে পারতাম না। ভালোবাসার মানুষের প্রত্যাখ্যান আমাকে বাঁচতে দিতো না যে, সুকান্ত। বাঁচতে দিতো না।”
সুকন্যার আবারও গলা ভার হয়ে আসে। দু-চোখ নদী হয়ে যায়। সুকান্ত সেই নদীর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আফসোস করে। তার জন্য যদি কারো দুচোখ এমন নদী হতো, তাহলে সে বোধহয় সেই মানুষটির জন্য পুরো পৃথিবী ছাড়তে পারতো! অথচ এমন নদীও কেউ অবহেলা করেছে! পিছু ফেলে গিয়েছে!
আচ্ছা, একসময় অনেক ভালোবাসতে পারা মানুষগুলো হুট করে এমন সমস্ত ভালোবাসা ছেড়ে দেয় কেমন করে? তাদের কষ্ট হয় না? তাদের মনে হয় না, মন ভাঙার শোক সারাজীবন আরেকটি মানুষ বয়ে বেড়াবে?
ুকরো_সুকান্ত_সুকন্যা—৩
কলমে: মম সাহা