23/03/2026
“তাসাওউফ (তাসাউফ) এটা নয় যে মানুষ কারামত দেখাবে; বরং এটা হলো তার আখলাক (চরিত্র) পরিবর্তন হয়ে যাবে।”
তাসাওউফ কী?
খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (খাজা গরীব নবাজ, সুলতানুল হিন্দ) রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর এই বাণী
“তাসাওউফ এটা নয় যে মানুষ কারামত দেখাবে; বরং এটা হলো তার আখলাক বদলে যাবে”
আসলে পুরো তাসাওউফের মূল সারসংক্ষেপ।
আজকের যুগে যখন তাসাওউফকে অনেক সময় অদ্ভুত ঘটনা, কাশফ-কারামত বা অলৌকিক বিষয়ের সাথে যুক্ত করা হয়, তখন খাজা আজমেরী (রহ.)-এর এই শিক্ষা আমাদের আসল পথ দেখায়
তাসাওউফ দেখানোর বিষয় নয়, বরং চরিত্র গঠনের বিষয়।
তাসাওউফ মূলত মানুষের অন্তরের সংশোধনের নাম। এটা হলো
হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার ও ঘৃণা থেকে হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করা এবং তাকে ভালোবাসা, নম্রতা, ধৈর্য ও খিদমতে খালকের মাধ্যমে সাজানো।
যদি কারও ইবাদত বেশি হয়, কিন্তু তার আখলাক কঠোর, কথা কড়া এবং আচরণ অহংকারপূর্ণ হয়—তাহলে সুফিয়াদের দৃষ্টিতে সে এখনও তাসাওউফের আসল রূহ বুঝতে পারেনি।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আগমনের একটি মৌলিক উদ্দেশ্য হিসেবে উত্তম চরিত্রকে উল্লেখ করেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“ওয়া ইন্নাকা লা'আলা খুলুকিন আজীম” (সূরা কলম: ৪)
অর্থাৎ, “নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।”
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও ইরশাদ করেছেন:
“আমি উত্তম আখলাক পূর্ণ করার জন্য প্রেরিত হয়েছি।”
(মুওয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদিস: ১৬১৪)
এই ভিত্তির উপরেই আওলিয়ায়ে কিরাম তাসাওউফের ইমারত দাঁড় করিয়েছেন।
খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ.) তার মুরিদদের কারামত শেখাননি, বরং মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলতেন আল্লাহর কাছে সেই বড় ওলী, যার মাধ্যমে মানুষের শান্তি আসে।
তাসাওউফের ইতিহাসে দেখা যায়, প্রকৃত সুফি সবসময় মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন।
খাজা গরীব নবাজ (রহ.) আজমীরে ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণি নির্বিশেষে মানবতার সেবা করেছেন। ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, দুঃখীদের সান্ত্বনা দেওয়া, দুর্বলদের সহায়তা করা এগুলোই ছিল তার খানকাহর নিয়ম। এজন্যই তিনি “গরীব নবাজ” নামে পরিচিত।
আলী হুজভিরী (দাতা গঞ্জ বখ্শ রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ কশফুল মাহজুব-এ লিখেছেন
তাসাওউফের আসল উদ্দেশ্য হলো নফসের সংশোধন ও আখলাকের উন্নতি, মানুষের উপর নিজের আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা নয়।
এছাড়াও জুনাইদ বাগদাদী (রহ.) বলেছেন
“তাসাওউফ হলো, আল্লাহ তোমাকে তোমার নিজের থেকে বের করে নেন এবং নিজের সাথে জীবিত করে দেন।”
অর্থাৎ, মানুষ নিজের অহংকার ও খেয়াল-খুশি থেকে মুক্ত হয়ে যায়।
দুঃখজনকভাবে আজ অনেক সময় রূহানিয়তকে খ্যাতি, মুরিদ বাড়ানো ও বাহ্যিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম বানানো হয়েছে।
কিন্তু সত্যিকারের সুফির পরিচয় এটা নয় যে মানুষ তার হাত চুমবে, বরং এটা তার আখলাক দেখে মানুষের হৃদয় পরিবর্তিত হয়ে যাবে।
যদি নামাজ মানুষকে নম্রতা না শেখায়, রোজা ধৈর্য সৃষ্টি না করে, জিকির হৃদয়কে কোমল না করে এবং ইলম মানুষকে সহনশীল না করে তাহলে তাসাওউফ শুধু শব্দই থেকে যায়, বাস্তবতা হয় না।
খাজা গরীব নবাজ (রহ.)-এর শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়
সবচেয়ে বড় কারামত হলো
রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা, প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা করা, ঘৃণার জবাবে ভালোবাসা দেওয়া এবং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নম্রতা অবলম্বন করা।
আসল সুফি সেই ব্যক্তি
যার উপস্থিতিতে মানুষের অন্তরে শান্তি আসে, যার মুখ থেকে কল্যাণের কথা বের হয় এবং যার হাত থেকে কেউ কষ্ট পায় না।
এটাই সেই নৈতিক বিপ্লব, যা তাসাওউফ সৃষ্টি করে।
আজ আমাদের দরকার কারামত খোঁজা নয়, বরং নিজের আখলাকের হিসাব নেওয়া।
যদি আমরা সত্য বলা, অঙ্গীকার রক্ষা করা, অন্যদের সম্মান করা এবং আল্লাহর বান্দাদের ভালোবাসা শিখে যাই তাহলেই খাজা গরীব নবাজ (রহ.)-এর তাসাওউফের বাস্তব অনুসরণ হবে।
তাসাওউফ কোনো পোশাক, উপাধি বা দাবির নাম নয়
বরং এটা একটি অবিরাম সংগ্রাম নিজের নফসের বিরুদ্ধে, অহংকারের বিরুদ্ধে এবং আত্মশুদ্ধির জন্য।
➡️ খানকাহে গালিবিয়া জৌনপুরী দরবার শরীফের পক্ষ থেকে