16/05/2022
হোস্টেল। মেস। বোর্ডিং। তার বৈচিত্র্য সমাজ-পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী।
প্রত্যেকটি মেস-হোস্টেলের নিজের নিজের গল্প আছে। একটি চিরন্তন গল্প বোধহয় এই—বাড়ি থেকে প্রথম প্রথম হোস্টেলে বা মেসে এসে বাড়ির জন্য মন খারাপ আর সারা জীবন সেই হোস্টেল বা মেসের জন্য মনখারাপ। মেস বা হোস্টেল তো এক রকমের নয়—তার মধ্যে অস্তিত্বের কত ধরনের যে কারুকাজ, স্বার্থ ও পরার্থের কত বোঝাপড়া, জীবন ও জৈবিকতার কত যে বিভিন্নতা এবং সমবায়িক বি-সৌসাদৃশ্য থাকে—তাকে এককথায় অন্তহীন বলা যায়।
শিবনাথ শাস্ত্রী থেকে বিপিনচন্দ্র পালের মেসবাড়ি বৃত্তান্ত, সেকাল একালের শান্তিনিকেতনের ছাত্রাবাস, অগ্নিগর্ভ সময়ে ঢাকার মেয়েদের হোস্টেল, কিংবা কলকাতার হ্যারিসন রোড থেকে গড়বেতায় গৌর উকিলের মেস। স্মৃতিকথায় এ বই ছুঁয়েছে উনিশ শতক থেকে একবিংশ শতক পর্যন্ত ভৌগোলিক ভাবে সমগ্র বাংলাকেই।
মেস-হোস্টেলের বিশ্বস্ত দলিল নির্মাণ করতে গিয়ে এসেছে সেকালের কলকাতার মেস, ঢাকার মেস-হোস্টেল ছুঁয়ে বহরমপুর শহরের মেস-হোস্টেল-বোর্ডিং। আলোচিত হয়েছে সাহিত্যে মেস, সাহিত্যিকদের মেস। সেখানে শিবরাম, শরৎচন্দ্র, জীবনানন্দ, তারাশঙ্কর থেকে ব্যোমকেশ-শরদিন্দু হয়ে ঘনাদা।
এমনকী বাংলা চলচ্চিত্রে মেসবাড়ি প্রসঙ্গ-ও। বই শেষ হয়েছে যৌথযাপনে মেসেরও অধিক কমিউনের ইতিকথা দিয়ে। আসলে এই বই দেখতে চেয়েছে মেস হোস্টেলকে কেন্দ্র করে একটা বিরাট সময়ের বাঙালি সমাজ-জীবনকে।
কেমন ছিল ষাটের দশকে পূর্ববঙ্গের বরিশালে, চাখার কলেজে মেয়েদের প্রথম হোস্টেল? লিখেছেন চাখার কলেজের প্রথম মহিলা ছাত্রী সন্ধ্যা রায় সেনগুপ্ত। সেই লেখার একটু অংশ রইলো -- .................................................
সালটা ১৯৬২। সময়টা পুজোর পর। সম্ভবত অক্টোবরের শেষ কিংবা নভেম্বরের শুরু। আমি তখন দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী। পুজোর ছুটির আগে পর্যন্ত আমরা, অর্থাৎ আমি ও আমার ছোড়দি অঞ্জলি আমাদের কলেজের কাছে এক আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে ক্লাস করেছি। কিন্তু তা একেবারেই অনিয়মিত। এই অনিয়মিত ক্লাস আমাদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে খুবই অসুবিধা করছিল। এই অনিয়মিত ক্লাসের কারণ নানাবিধ। কলেজ থেকে আমাদের বাড়ির দূরত্ব বারো থেকে চোদ্দ মাইল। আমাদের বাড়ি এবং আমাদের কলেজ গ্রামেই অবস্থিত। যাতায়াত ব্যবস্থা জলপথে নৌকার সাহায্যে, নয়তো পায়ে হেঁটে। হাঁটা পথ মানে হলো ফসলের জমির আলপথ কিংবা নদীপাড়ের পথ। বর্ষাকালে কেবলমাত্র নৌকার সাহায্যেই যাতায়াত করা যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য আমাদের বাড়ি ও তদনীস্তন পূর্ব পাকিস্তানের বরিশাল জেলার দক্ষিণ অংশে ঝালকাঠি থানার অন্তর্গত রুনসী গ্রামে। আর কলেজটি অবস্থিত বরিশাল জেলার বানারীপাড়া থানার চাখারে। বরিশাল সম্বন্ধে একটা কহাবৎ আছে ধান-নদী-খাল—এই তিন নিয়ে বরিশাল।
আমাদের কলেজে সহশিক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। সহ-শিক্ষা চালু হয় ১৯৬১ সালে। প্রথম ছাত্রী আমি। আমার সঙ্গেই আমার দিদিও ভর্তি হয়। আর ভর্তি হয় দুজন মুসলিম ছাত্রী আহমেদী সুলতানা এবং পারভিন ফেরদৌসী। আহমেদী চাখারেরই মেয়ে। কিন্তু পারভিনের বাড়ি স্বরূপকাঠি থানায়, যা কলেজ থেকে বেশ দূরে। আহমেদী স্থানীয় মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও ক্লাস করা হতো না একা বলে। এভাবেই বাড়িতে পড়ে আমাদের একাদশ শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছিলাম। রেজাল্ট হয়েছিল মোটামুটি।
পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬২-তে একাদশ শ্রেণীতে বেশ কিছু সংখ্যক ছাত্রী আমাদেরই মতো বাড়িতে বসে পড়ে পরীক্ষা দেবে—এমত ভাবনা নিয়ে কলেজে ভর্তি হলো। এই সময় কলেজের অধ্যক্ষ মোহামদম এনায়েত করিম সাহেব ছাত্রীরা যাতে নিয়মিত ক্লাস করে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে সচেষ্ট হন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তৈরি হয় হিন্দু ছাত্রীদের জন্য হিন্দু হোস্টেল চাখার সংলগ্ন খলিসাকোটায় এবং মুসলিম ছাত্রীদের জন্য মুসলিম হোস্টেল চাখারে। এই হিন্দু হোস্টেলের প্রথম ছাত্রী আমি এবং আমার দিদি অঞ্জলি। ছাত্রদের জন্য হিন্দু হোস্টেল এবং মুসলিম হোস্টেল আগে থেকেই ছিল। যেহেতু সহ-শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল না, তাই ছাত্রীদের জন্য কোনো হোস্টেলই ছিল না। দ্বাদশ শ্রেণীর একেবারে শেষের দিকে আমরা হোস্টেলে থাকতে শুরু করলাম। হোস্টেলটি একটি সম্পন্ন হিন্দু পরিবারের পরিত্যক্ত বাড়িতে তৈরি হলো। স্থানীয় লোকেরা এই বাড়িটিকে বলত 'পূর্বের বাড়ি'। সম্ভবত দেশভাগের সময় এই পরিবারের লোকেরা তাঁদের বাড়ি-ঘর কলেজ কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে গিয়েছিলেন। এ-বিষয়ে এর থেকে বেশি তথ্য আমার জানা নেই। বাড়িটি বেশ বড়ো। বাড়ির পশ্চিম অংশে আমাদের হোস্টেল। সামনে উঁচু পাঁচিল। পাঁচিলের দরজা বেশ প্রশস্ত এবং মজবুত তিনটি তালার অনুশাসনে আবদ্ধ। সম্ভবত মেয়েদের হোস্টেল বলে এরকম ব্যবস্থা। প্রধান দরজা পেরিয়ে একটি বড়ো উঠান। না, উঠান না বলে ফুলের বাগান বলাই সঙ্গত। তারপর লম্বা টানা সিঁড়ি। সিঁড়ি পেরিয়ে একটি লম্বা টানা ঘর। উত্তর দক্ষিণে টানা। ছ-খানা খাট। প্রত্যেকটা খাটের সঙ্গে একটা করে ডেস্ক। আবার খাটের মাথার দিকে দু-সারি রড লাগানো। বুঝতে পারছিলাম এই রডগুলিতে আমাদের জামাকাপড় রাখতে পারব। টানা ঘরটা পেরিয়ে গেলে দরজা দিয়ে ঢুকলে পরে তিনটি বড়ো বড়ো ঘর। প্রত্যেকটি ঘরে চারখানা করে খাট-ডেস্ক ইত্যাদি। খাটের মাথার দিকে তেমনি রড লাগানো। তারপর আবার একটা বারান্দা। বারান্দায় তিনটি দরজা তালা লাগানো। সেই বারান্দা পেরিয়ে আবার একটা বাগান। সবজি বাগান। লাউ, কুমড়ো, বেগুন ইত্যাদি। এই বাগানের পূর্ব উত্তর এবং দক্ষিণ দিকে তিনজন অধ্যাপক থাকেন সপরিবারে। আমরা আমাদের যে-কোনো প্রয়োজনে তাঁদের কাছে যেতে পারি এ মতোই নির্দেশ ছিল আমাদের। আমাদের হোস্টেল কম্পাউন্ডে ঢুকে সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডানদিকে বেশ খানিকটা জায়গা বাঁধানো। তারই দক্ষিণ পাশে খাবার ঘর এবং সংলগ্ন রান্নাঘর। রান্নাঘরের পূর্বদিকে বেশ খানিকটা জায়গা টিন দিয়ে ঘেরা। বেশ উঁচু করে টিন দেওয়া। ভেতর দিকে ঢুকেই একটা টিউবয়েল। তারপর আরও খানিকটা ঢুকে স্নানের ঘর পায়খানা ইত্যাদি। তবে মেয়েদের হোস্টেল সংলগ্ন পুরো জায়গাটা উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। অর্থাৎ নিশ্চিন্ত নিরাপত্তার কোনো খামতি নেই। কম্পাউন্ডে ঢুকে যে উঠোনটা ফুলে ফুলে সাজানো থাকত সেই উঠোনের ঠিক ডান দিকে একটা জলাশয়। ঠিক পুকুরও নয় আবার নালাও নয়। বেশ প্রশস্ত এটা লম্বাটে জলাশয়। সেখানে কোনো ঘাট বা এমন কিছু নেই।
হোস্টেল কম্পাউন্ড থেকে বেরিয়ে একটা রাস্তা গিয়ে পশ্চিমে বড়ো রাস্তায় মিশেছে। বড়ো রাস্তাটা উত্তর ও দক্ষিণ দিক বরাবর। দুটো দিকই খলিসাকোটা গ্রামের মধ্যেই। হোস্টেলের রাস্তাটা যেখানে বড়ো রাস্তার সঙ্গে মিশেছে তার পশ্চিমদিকে ছিল দীঘির মতো বড়ো পুকুর। সেই পুকুরের রাস্তা সংলগ্ন কোণের দিকে বেশ খানিকটা অংশ উঁচু টিনের পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। ভিতরে একটি প্রশস্ত বাঁধানো ঘাট। খাটের সিঁড়ি অনেকটা পুকুরের মধ্যে নেমে গেছে। বেশ ক'জন একসঙ্গে স্থান করা যায়। আমাদের নির্দেশ ছিল একসঙ্গে চার পাঁচজন না হলে আমরা স্নান করতে যেতে পারব না। তাহলে ভিতরে টিউবয়েলের জলে স্নান করতে হবে।
আমরা আবাসিক যারা ছিলাম পুকুরে স্নান করতেই অভ্যস্ত এবং স্বচ্ছন্দ ছিলাম। আমরা তো সবাই গ্রামে বড়ো হয়েছি, আমাদের অভ্যাসগুলোও তেমনি গ্রামীণ পরিবেশেই স্বাভাবিক থাকত।
হোস্টেলের রাস্তাঘাট দুপাশে বড়ো বড়ো গাছ। বকুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া প্রভৃতি। গ্রীষ্মকালে বকুল ফুলের আস্তরণে রাস্তাটা ঢাকা থাকত। আর বসন্তকালে কৃষ্ণচূড়া যেন পুরো এলাকাটা রাঙিয়ে দিত।
আবাসিক জীবনের দুই পর্ব
(চাখার ও ঢাকা)
মেস হোস্টেল ঘটিত এ বাঙালি জীবন
সম্পাদনা: সন্ধ্যা রায় সেনগুপ্ত
আটাত্তর সালের ওলট-পালট করা বন্যার স্বাদ আমার হোস্টেলে বসেই নেওয়া। আমার জীবনেও অনেকটা ওলট-পালট সেই ঘটনার সূত্র ধরে। যতদূর মনে পড়ে, তার আগে পাঁচ-ছ'দিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টি পড়েছিল। বাইরে বেরোনো বন্ধ। কলেজের ক্লাস বন্ধ হয়ে গেছে। পুরোনো যে সব বিল্ডিং আছে, তাদের নিচের তলার অর্ধেক জলের তলায়। আমাদের হোস্টেলের বাইরে হাঁটু সমান জল জমে গেছে। কিছুটা এগিয়ে রাস্তায় গেলে কোমর সমান। ততদিনে বাংলা ভাসানো বিখ্যাত আটাত্তরের বন্যা গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি নদীয়া জেলায়। যদিও কেউই নিরাপদ নেই। খোদ কলকাতায় জনজীবন স্তব্ধ। রেডিও আর কিছু কিছু লোকমুখে জানতে পারছি মানুষের অসহায় অবস্থার কথা। সে সময়ে ফ্লাড রিলিফে যাওয়াটা ছিল দস্তুর। আমাদের হোস্টেল আর কলেজ থেকেও কয়েকটা টিম গেল। নিজে না গেলেও তাদের রিলিফের জিনিস জোগাড় ও নিয়ে যাবার বন্দোবস্তে অংশ নিয়েছিলাম। মনে আছে এরকম দুটো টিমে সঙ্গী হয়েছিলেন কবি সৃজন সেন আর চলচ্চিত্র পরিচালক উৎপলেন্দু চক্রবর্তী। সেই টিমের ছেলেরা ফিরে এসে বন্যার যে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছিল আমাদের সামনে তাতে ক্ষোভ বাড়ছিল সকলের। নবীন সরকারের পক্ষে যতটা করা সম্ভব, তারা হয়ত তার বেশিই করছিল, তবু প্রয়োজনের তুলনায় তার অপ্রতুলতায় অভিযোগের পাহাড় জমছিল। সেই সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তাটুকু বেশি করে অনুভব করেছিলাম আমরা। আর সেই সূত্রে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের যাপন আর সমস্যার চেহারাটা স্পষ্ট হচ্ছিল আমাদের কাছে। বন্যার পরেও নানা প্রসঙ্গে তা জানার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে যাই। আর সেখানে অনেক সমমনোভাবাপন্ন ছাত্রদের সঙ্গে সখ্য বাড়ে, বিনিময় বাড়ে। এরপরেই রাজনীতির পাঠে হাতেখড়ি হয় আমার। হোস্টেলে রাজনীতির গভীর চর্চা আর অনুশীলনের একটা পরম্পরা ছিলই। রীতিমত ক্লাসের মতো করে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পড়া, বিভিন্ন রাজনৈতিক মতবাদের সঙ্গে পরিচয় করা ইত্যাদি ছিল সেসব ক্লাসের অঙ্গ। যে সময়ের কথা বলছি, সে সময়ে দিনবদলের বিপ্লবের আগুন স্তিমিত, আঁচটুকু কিন্তু যথেষ্ট উত্তাপ ছড়াচ্ছে। বন্দিমুক্তি আন্দোলন দেখেছি। গণসংগীত, নাটক, ফিল্মে আলো ছড়াচ্ছে এই ধারার সুর। সেই সময় থেকে ছাত্রজীবন, ইন্টার্ন ও হাউস-স্টাফ থাকার শেষদিন অবধি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কর্মসূচী, তা মেডিকেল ক্যাম্প, রক্তদান শিবিরের মতো কিছু হোক, বা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার সংগ্রামের কর্মসূচী হোক, তাতে যোগ দিতে দুবার ভাবিনি। সেই শিক্ষা সারা জীবনের মতো কটি কথা শিখিয়ে দিয়েছিল। আজ এই পরিসরে তার নির্যাসটি সকলকে জানাতে চাই।
১. 'রাজনীতি' শব্দটি ঘৃণা করার মতো শব্দ নয়। সামাজিক ও ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের প্রতিটি কাজের ফলাফল নির্ধারণ করা শক্তিটির নাম রাজনীতি। তাই সামাজিক বৈষম্য দূর করার ন্যূনতম প্রচেষ্টার মধ্যে থাকতে গেলেও রাজনীতি বিষয়ে স্পষ্ট মতামত তৈরি ও ব্যক্ত করার ইচ্ছে থাকা চাই। আজ যখন দেখি, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে টেলিভিশনের পর্দায় একজন রাজনীতিক অন্য একজনকে বলছেন, দয়া করে রাজনীতি করবেন না, তখন আমার করুণা হয় এদের জন্য। ভাবি যে, রাজনৈতিক চরিত্ররাই যদি রাজনীতি কথাটিকে ঘেন্না করতে শেখান, তবে ঘটনার পেছনের রাজনীতিটা মানুষ তো বুঝতেই চাইবে না। অবশ্য আজকের রাজনীতিকদের তো তাতেই লাভ। সত্যি উন্মোচিত হলে তাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্ষতি।
২. বৈষম্যই ইতিহাসের চালিকাশক্তি। নতি ছাড়া চাকা গড়াবে না। তেমনি ইতিহাসের ঘটনা সংঘটনের জন্যও নতির প্রয়োজন আছে। ক্ষমতার তারতম্য সেই নতির রূপ। কখনও তা বলবান থেকে দুর্বলের দিকে, আবার কখনও তা বিপরীতমুখী। তাই একান্ত বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় বাস্তবতা নেই। কিন্তু চাকার গতিপথের অভিমুখ বৃহত্তর কল্যাণের দিকে চালিত থাকা উচিত, যা এই অভিমুখে সমাজের গতিকে নির্দিষ্ট করবে।
৩. বৃহত্তর কল্যাণের অভিমুখে চালিত ব্যবস্থায় নিজের যদি ন্যূনতম ভূমিকা রাখতে হয়, তবে পক্ষগ্রহণ জরুরি। কারণ 'নিরপেক্ষ' এমন এক আপাত-নিরীহ শব্দ, যার মতো বিপজ্জনক শব্দ আর হয় না।
আজ জীবনের প্রদোষকালে এসে হোস্টেলবাসের দিনগুলো মনে করতে গিয়ে মনে হয়, আমার আজকের জীবনের ইমারতটা যে স্তম্ভগুলো দাঁড় করিয়ে রেখেছে, তাদের ভিত্তির নির্মাণ হয়েছিল ওই দিনগুলোতেই। স্মৃতিবাহী জলবিন্দুরা মনে করিয়ে দেয়, রোদ ঝলমলে দিনের পাশে পাশে অনেক বজ্রবিদ্যুতের ফলায় ফালাফালা হয়ে যাওয়া মর্মন্তুদ রাতের সমাবেশও ছিল সে-জীবনে। তেমনই সফলতার আলোকিত দিগন্তের দিকে হাঁটতে গিয়ে মাঝরাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়া অনেক মানুষের ব্যর্থতার আর্তনাদের পাশাপাশি তাদের শবদেহের ওপর দিয়ে ইতিহাসের রথের চাকার গড়িয়ে যাবার উল্লাসও ছিল। ভালো-মন্দ দুই-কেই মহামানব সুলভ নিস্পৃহতার সঙ্গে এক পঙক্তিতে বসাতে না পারি, তাতে উদ্বেল না হয়ে জীবনের সামগানে আজও যে গলা মিলিয়ে চলতে পারি, সে ওই দিনগুলোর দান।
আমার ডাক্তারি পড়ার হোস্টেল-জীবন
ভাস্কর দাস
মেস-হোস্টেল ঘটিত এ বাঙালি জীবন
সম্পাদনাঃ সুজন বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রচ্ছদ ও অলংকরণঃ মেখলা ভট্টাচার্য
মুদ্রিত মূল্যঃ ৫৬০ টাকা
পেয়ে যাবেন -৪৪৮
রইলো সম্পূর্ণ সূচিপত্র।
সংগ্রহ করতে যোগাযোগ করুন আমাদের সাথে
WhatsApp or call-+91 91238 79491