01/08/2024
খোয়াবনামার একটি ট্যাগলাইন আছে- প্রান্তজনের কথা। কিন্তু এই প্রান্তজন কে বা করা? কাদের প্রান্তজন মনে করে খোয়াবনামা? তার কিছুটা হদিশ হয়ত খোয়াবনামার কাজকর্মে মেলে।
যেমন এই সিরিজের প্রথম বই ছিল বিষ্ণুপ্রিয়া ডাকুয়ার পোস্টোমাস্টারনির কথা। যাঁরা এই বইটি সংগ্রহ করেছেন তাঁরা জানেন প্রান্তজন বলতে আমরা কী বোঝাতে চাই। যাঁরা বইটি সংগ্রহ করেন নি তাঁদের জন্য একলাইনেল বলি- বিষ্ণুপ্রিয়া ডাকুয়া হলেন পশ্চিমবঙ্গের একটি অখ্যাত গাঁয়ের পোস্টমাষ্টার। সদ্য অবসরপ্রাপ্ত এই পোস্টমাস্টার প্রায় ৩৫ বছর এই পদে আসীন ছিলেন। তিনি সেই সময়ের পোস্টমাস্টার যে সময় মানুষ স্মার্ট হয়নি। আশাকরি পাঠক বোঝনে আজ থেকেও বছর ২০ আগেও পোস্টআপিসের কী অপরিসীম ভূমিকা ছিল। নাঃ কেবল চিঠি-পত্র আদান প্রদান নয়। গ্রামী বাংলার এক বিরাট অংশের বিশেষ করে মহিলাদের এক সঞ্চয়ে এক বিরাট ভূমিকা পালন করত এই পোস্টঅফিস। যেখানে রোজ ১০ টাকা জমা দিতে আসতেন মানুষরা, বিশেষ করে মহিলা। হলদিয়ার কুঁকড়াহাঁটি এবং তাঁর আশ-পাশ গাঁ-গঞ্জে নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন বিষ্ণুপ্রিয়া ডাকুয়া। কেবল প্রতিষ্ঠান নয়, মানুষ যে প্রতিষ্ঠানের মুখ হয়ে ওঠে সেটা প্রমাণ করেছেন তিনি।
ঠিক সেই রকম এক মানুষ Prasenjit Sarkar।
কে এই প্রসেনজিৎ সরকার?
পশ্চিমবঙ্গের আর এক প্রত্যন্ত গ্রাম পূর্ব বর্ধমান জেলার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মীনাপুর। যেখানে একটি বাস সকালে যায় আবর সেই বাসটি ফেরে। সরকারীভাবে যাতায়াতের মাধ্যম এখনো এটি। সেই গ্রামের একবারে শেষপ্রান্তে একটি নিম্মবুনিয়াদী স্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রসেনজিৎ বাবু। যদিও তিনি বা তাঁর সহকর্মীরা এটিকে স্কুল বলেন না বলেন বাগান। প্রসেনজিৎ বাবুর অফিসের ঘরের বাইরে প্রধান শিক্ষক বলে কোনও বোর্ড টানানো নেই। বোর্ড আছে তবে তাতে লেখা প্রধান মালি। সহকারী শিক্ষকদের ঘরের মাথায় লেখা সহকারী মালী।
তাঁর স্কুলে কোনও ক্লাস ঘর নেই যা আছে তা এইরূপ-
নতুন কুঁড়ি (প্রাক-প্রাথমিক, বিদ্যালয়ে যে সদ্য ভর্তি হল)
প্রস্ফুটিত কুঁড়ি — প্রথম শ্রেণী
ফুল ফোটার পালা — দ্বিতীয় শ্রেণী
ফুল পূর্ণতার আগে — তৃতীয় শ্রেণী
ঈপ্সিত ফুল — চতুর্থ শ্রেণী
ফুল এবার গন্ধ ছড়াও — পঞ্চম শ্রেণী (প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে যে উচ্চতর শিক্ষার জন্য বৃহত্তর অঙ্গনে পা রাখল)
প্রতিটি ক্লাসের মাথায় বোর্ড লাগানো আছে এই নামে। তিনি বিশ্বাস করেন শিশুরা সবাই ফুল। তাঁদের ফুলের মত বাড়তে না দিলে সমাজের ঘোর সংকট। আমারও একথা বিশ্বাস করি। কিন্তু আমাদের আর প্রসেনজিৎ বাবুর মধ্যে পার্থক্য, আমরা কেবল বিশ্বাস করি। আর তিনি এটি বিশ্বাস করেন, অভ্যাস করেন এবং জীবনে প্রয়োগ করেন।
যে এলাকায় বাল্য বিবাহ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা সেই এলাকায় তিনি স্কুলেরই প্রাক্তন ছাত্রীদের নিয়ে তৈরি করলেন বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ কমিটি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে বোঝানো ছিল সেই কমিটির কাজ। আজ ঐ এলাকায় বাল্য বিবাহ মুছে গেছে।
একটি নিম্মবুনিয়াদী স্কুলে বসানো হয়েছে ন্যাপনিকন ভেন্ডিং মেশিন। কারণ পিছিয়ে পড়া মহিলারা এখনো পিরিয়ড হলে সহজে তাঁর ব্যবস্থা নিতে কুণ্ঠিত ছিলেন। এখন মহিলারা স্কুলে শিক্ষকের কাছে এসে ন্যাপকিন চেয়ে নিয়ে যান।
এরকম আরও আছে। বললে পোস্ট বড় হতে থাকবে।
প্রসেনজিৎ বাবুরা চান আপনি তাঁদের স্কুলে আসুন, পরিদর্শন করুন এবং পরামর্শ দিন আরও কী ভাবে ছাত্র-ছাত্রী এবং এলাকার উন্নতি করা যায়।
কিন্তু এ জিনিষ তো একদিনে তৈরি হয় না। একদিনে তৈরি হয়ও নি। অজস্র বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে এ জিনিষ তৈরি হয়েছে।
তারই কিছু অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর লেখা বই 'এ ঘোর সংকটে' প্রকাশিত হচ্ছে খোয়াবনামা প্রান্তজনের কথা সিরিজে।
জানি না একটি অখ্যাত গ্রামের একটি অখ্যাত স্কুলের এক শিক্ষকের কথা মানুষ পড়বেন কিনা? তবে খোয়বানামা, প্রান্তজনের কথা সিরিজের প্রথম বই ছিল এমনই এক অখ্যাত গ্রামের এক অখ্যাত পোস্টমাস্টারিনির। যে বইয়ের নাম ছিল পোস্টোমাস্টারনির কথা। পাঠক তা আপন করে নিয়েছেন। সেই আশায় এই বই প্রকাশ।
এ ঘোর সংকটে
প্রসেনজিৎ সরকার
মূল্য- ১৫০
প্রচ্ছদঃ Subrata Roy
বইটি কলেজস্ট্রিটে পাওয়া যাবে আগামী শনিবার ৩-রা আগস্ট বিকেল থেকে।
বাংলাদেশের বন্ধুরা বাতিঘর বা তক্ষশীলার মাধ্যমে অর্ডার করতে পারেন।
বিদ্রঃ কমেন্ট বেশ কিছু ছবি দিলাম, যেগুলি এই বইতে ব্যবহার করা হয়েছে। তাতে হয়ত খানিক বোঝা যাবে প্রসেনজিৎ বাবু এবং তাঁর সহকারীদের কর্মকাণ্ড।