14/05/2023
"এই চল চল! সবাই একটা গ্রুপ সেলফি তুলি!"
বলেই কলেজ পড়ুয়া মেয়েগুলোর মধ্যে একজন নিজের মুঠোফোনটা সামনে মেলে ধরে। বাকিরাও চলে আসে ফ্রেমের মধ্যে। সেলফি টা ক্লিক করে মেয়েটি নাক কুঁচকে বলে ওঠে,"এই আরশি, তুই কি কোনোদিন একটু স্মার্ট হবিনা রে?"
"হু?", এতক্ষন নিজের মুঠোফোনের মধ্যে ডুবে থাকা আরশি মুখ তুলে তাকায়। মেয়েটি আবারও বলে ওঠে,"তুই কি চিরকাল রমন গাঁইয়া, আনস্মার্টই থেকে যাবি?"
বলেই হেসে ওঠে। তার হাসিতে যোগ দেয় বাকি মেয়েগুলো। আরশির কেমন অস্বস্তি হয়। পরনে সুতির চুড়িদার, মাথার তেল দেওয়া চুলগুলো সিঁথি করে পিঠে বিনুনি করে ফেলে রাখা, চোখে হাই পাওয়ারের চশমা চোখে, শ্যামলা বর্ণের আরশির নিজেকে এই জিন্স-টপ পরিহিত সহপাঠীদের মাঝে সত্যিই কেমন বেমানান লাগছে।
প্রথম মেয়েটির কথার সুর টেনে অন্য আরেকটি মেয়ে বলে ওঠে,"স্নেহার সাথে তো সবসময় থাকিস। ও কতো স্মার্ট একটা মেয়ে!"
"মেয়ে?", ব্যঙ্গ করে বলে ওঠে পাশ থেকে একটি মেয়ে,"স্নেহাকে মেয়ে বলিসনা ভাই! দেখ না... ইউনিয়ন রুমে ছেলেদের সঙ্গে বসে আছে।"
আরশি আর এক মুহূর্ত সবার মাঝে থাকতে ইচ্ছে করলোনা। এতক্ষন ওকে নিয়ে হাজার কথা তবু মুখ বুজে সহ্য করে নিচ্ছিলো, তবে স্নেহার ব্যাপারে একটা কথাও সহ্য করতে পারেনা ও। বলে ওঠে, "দেখ! এতক্ষন আমাকে নিয়ে বলেছিস ঠিক আছে। একদম স্নেহাকে নিয়ে কিছু বলবিনা।"
"কেন রে? তুইও কি স্নেহার মতো....", বলেই হো হো করে হেসে ওঠে সবাই। একজন হাসতে হাসতে বলে,"গ্রামের মেয়ে গ্রামের কলেজেই ভর্তি হতে পারতিস। এতো বড়ো কলেজে তুই বড্ডো বেমানান রে।"
আরশি আর সহ্য করতে পারেনা। ওর চোখেদুটো জলে ভোরে আসে। জোরে পা চালিয়ে একটু দূরে চলে যায় আরশি। একটা গাছের তলায় বসে পরে। হাতের মুঠোফোন ডায়াল করে একটা চেনা নম্বর, "স্নেহা।"
ফোনটা রিং হয়ে হয়ে কেটে যায়। আরশি ফোনটা পাশে ফেলে রেখে হাঁটুতে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে থাকে!
.
"এই স্নেহা, একটা খবর আছে..."
বলতে বলতেই স্নেহার পাশের চেয়ারে বসে কিংশুক। ইউনিয়ন রুমের টেবিলের উপর বসে লিফলেট গুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকা স্নেহা মুখ তুলে তাকায়। ছেলেদের মতো ছোট ছোট করে কাটা চুলের স্নেহার পরনে জিন্স আর শার্ট। হাতে ঘড়ি। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে ওঠে, "কী হয়েছে?"
"আরশি কে ওর ক্লাসমেটরা সবাই কিছু বলেছে। হাসাহাসি করছিলো। আরশি দেখলাম কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলো।", কিংশুকের কথায় স্নেহা টেবিল থেকে নেমে দাঁড়ায়। জিন্সের পকেট থেকে বের করে নিজের মুঠোফোনটা। এতক্ষন সাইলেন্ট করে ফেলে রাখা স্নেহার ফোনের আরশির বেশ কয়েকটা মিসড কল। স্নেহা আর অপেক্ষা না করেই ইউনিয়ন রুম ছেড়ে বেরিয়ে যায়।
..
"আরশি?"
আরশি এতক্ষন একা একাই কাঁদছিলো। কিছুক্ষন আগের অপমানগুলো কে ভুলতে পারছেনা এখনও। চোখের জল মুছে ও পিছনে তাকিয়ে দেখে স্নেহা এসে দাঁড়িয়েছে। ও উঠে দাঁড়িয়ে বলে, "বল।"
"কাঁদছিস কেন তুই? ওরা আবার কিছু বলেছে? প্রতিবাদ করতে পারলিনা তুই?", স্নেহার কণ্ঠে রাগটা স্পষ্ট টের পায় আরশি। মাথা নীচু করে ধীর স্বরে বলে ওঠে,"ওরা তো ভুল কিছু বলেনি। সত্যি তো। আমি বেমানান। এই স্মার্ট যুগে আমি বড্ডো সেকেলে।"
"কে বলেছে তুই সেকেলে?", আরশির হাত চেপে ধরে স্নেহা,"তুই আসলে বড্ডো সহজ সরল। আর স্মার্টনেস বাইরের চাকচিক্য তে প্রকাশ পায়না, আরশি। তুই পড়াশোনায় কতো ভালো। আর তুই একদমই বেমানান নোস! একটা ভালো কলেজ তো সবসময় একজন ভালো স্টুডেন্ট চায় যেটা তুই। তোর মতো মিষ্টি, বুঝদার মেয়ে আর কটা আছে বল তো? তাই তো এতো ভালোবাসি তোকে..."
বলেই হঠাৎ চুপ করে যায় স্নেহা। আরশি চমকে মাথা তুলে তাকায়। স্নেহা দুপা পিছিয়ে যায়। কাঁপা কণ্ঠে বলে ওঠে, "I'm সরি, আরশি। আসলে..."
"সত্যিই ভালোবাসিস আমাকে?", আরশির কথায় চমকে ওঠে স্নেহা। বলে, "হ্যাঁ। বাসি।"
"সমাজ মেনে না নিলেও শুধু এই ভালোবাসায় বিশ্বাস রেখে আমাকে স্বীকৃতি দিতে পারবি?"
"আমি তোকে ভালোবাসি, আরশি। সব পরিস্থিতিতে শুধু তোকেই ভালোবাসবো।"
আরশির চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পরে, "আমিও যে তোকে ভালোবাসি, স্নেহা। ভীষণ ভালোবাসি।"
বলেই জড়িয়ে ধরে স্নেহাকে। স্নেহা নিজের ঠোঁট যুগল মিশিয়ে দেয় আরশীর ঠোঁটের ভাঁজে। সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে দুটো ভালোবাসার মানুষ আজ একত্র হলো! সমাজ হাজার অভিযোগ তুলবে বটে। তবে সত্যিই কি ওরা বেমানান?